Image description

ভোটের আর মাত্র বাকি ৪ দিন। প্রার্থীরা শেষ সময়ের প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। নির্বাচনী আমেজের পাশাপাশি সবার মধ্যে তৈরি হয়েছে সংশয়। এরই মধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচনে যেকোনো বিশৃঙ্খলা এড়াতে সতর্ক অবস্থানে মাঠে থাকবে সেনাবাহিনী। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও দুষ্কৃতকারীদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে যৌথ বাহিনী।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করতে চলমান রয়েছে যৌথ বাহিনীর টহল, গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তা ও তল্লাশি কার্যক্রম। নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যায়ক্রমে এই টহল বাড়তে থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এলাকাসমূহে বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি, ড্রোন নজরদারি, নিয়মিত টহলের মাধ্যমে উৎসবমুখর ভোটের পরিবেশ তৈরিতে অব্যাহত থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টা।

সূত্র মতে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ সদস্য মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে ১ লাখ সেনাসদস্য, ৫ হাজার নৌসদস্য, ৩ হাজার ৭৩০ জন বিমান বাহিনীর সদস্য, ১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩ জন পুলিশ সদস্য, ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪ জন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্য, ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন বিজিবি সদস্য, ৩ হাজার ৫৮৫ জন কোস্ট গার্ড সদস্য, ৭ হাজার ৭০০ জন র‌্যাব সদস্য এবং সাপোর্ট সার্ভিস হিসেবে ১৩ হাজার ৩৯০ জন ফায়ার সার্ভিসের সদস্য মোতায়েন করা হবে। এ ছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবার ভোটের মাঠে বিপুল পরিমাণ ড্রোন ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে।

বিশেষ করে দুর্গম এলাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বিস্ফোরক ও মাদকদ্রব্য শনাক্তে ভোটের মাঠে বড় পরিসরে ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করা হবে। বিজিবি তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সীমান্ত এলাকায় ডগ স্কোয়াড ব্যবহার করবে। এ ছাড়া র‌্যাব ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এবং ডিএমপি ও সিএমপি পৃথকভাবে ডগ স্কোয়াড নিয়োজিত রাখবে। দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের পৌঁছাতে বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে।

গতকাল দেখা যায় রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় যৌথ বাহিনীর টহল কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন সে জন্য ভোটারদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এদিকে শুক্রবার ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর শনিবার সকাল থেকেই ঢাকার শাহবাগ, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ আশপাশের এলাকায় বাড়ানো হয়েছে পুলিশি নিরাপত্তা। সরজমিন দেখা গেছে, এসব এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সাজিয়ে রাখা হয়েছে জলকামান। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান, ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইতিমধ্যে নেয়া হয়েছে নানা পরিকল্পনা।

সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, এবার যদি কোথাও কেন্দ্র দখল হয় কেউ ছাড় পাবে না। সেজন্য এবার সিসিটিভি ক্যামেরা কেন্দ্রে লাগানো হচ্ছে, ড্রোন ব্যবহার করছি। তিনি বলেন, নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোট ৭ দিন মাঠে থাকবে। ভোটের আগে ৪ দিন, ভোটের দিন এবং ভোটের পর ২ দিন। এবারের নির্বাচনে নিরাপত্তায় অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ সংখ্যক বাহিনী ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

সেনাসদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গত ১০ই জানুয়ারি আমাদের যে মোতায়েন সংখ্যা ছিল সেটা ৩৫ হাজার  থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজারে উন্নীত করেছি। পরবর্তীতে ২০শে জানুয়ারি ১ লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি নৌবাহিনী ৫ হাজার এবং বিমান বাহিনী ৩ হাজার ৭৩০ জন সেনা মোতায়েন করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের সারা দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬২টি  জেলায় ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে সর্বমোট ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে নিয়মিত টহল যৌথ অভিযান এবং আমরা চেকপোস্ট স্থাপনের মাধ্যমে নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রেখেছি।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেন, নির্বাচনী দায়িত্ব সিআইডিসহ সমগ্র বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যদের জন্য একটি পবিত্র আমানত। এ দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা, সততা ও পেশাদারিত্ব অক্ষুণ্ন রাখা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া সিআইডি’র সব পুলিশ সদস্যকে বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ইতিমধ্যে করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে নির্বাচনী প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। 

বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার এডমিরাল মো. জিয়াউল হক বলেছেন, নির্বাচন উপলক্ষে গত ১৮ই জানুয়ারি থেকে আগামী ১৪ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ২৮ দিনব্যাপী বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের প্রায় ৩ হাজার ৫০০ সদস্যের ১০০টি প্লাটুন উপকূলীয় ও নদী তীরবর্তী দুর্গম এবং গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকাসমূহে মোতায়েন থাকবে। এসব প্লাটুন স্থলভাগ ও জলভাগে বিভক্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, খুলনা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, কক্সবাজার, বরিশাল, পটুয়াখালীসহ নদী বেষ্টিত ভোলা জেলার দুর্গম প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহের ৬৯টি ইউনিয়নের ৩৩২টি ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবে। ভোলা জেলার চরাঞ্চল ও নদী বিচ্ছিন্ন এলাকায় অবস্থিত ভোটকেন্দ্রসমূহে কোস্ট গার্ড সদস্যরা বিশেষ গোয়েন্দা ও ড্রোন নজরদারি, নিয়মিত টহল এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ টহল পরিচালনা করছে। একইসঙ্গে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান এবং দুষ্কৃতকারী আটকের মাধ্যমে একটি উৎসবমুখর ও নিরাপদ ভোটের পরিবেশ সৃষ্টিতে কোস্ট গার্ড সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, কোস্ট গার্ড নির্বাচনকালীন যেকোনো ধরনের সহিংসতা, নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে সর্বদা সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র জানায়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিজিবি দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী মোতায়েন রয়েছে। দেশের ৪৯৫টি উপজেলার মধ্যে ৪৮৯টি উপজেলায় বিজিবি নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী ৬১টি উপজেলায় বিজিবি এককভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে। ঝুঁকি বিবেচনায় সারা দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনেই বিজিবি মোবাইল ও স্ট্যাটিক ফোর্স হিসেবে দায়িত্বে থাকবে। উপজেলা  ভেদে ২ থেকে ৪ প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন থাকার কথা রয়েছে। নির্বাচনকালীন যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি’র র‍্যাপিড অ্যাকশন টিম এবং হেলিকপ্টারসহ কুইক রেস্পন্স ফোর্স প্রস্তুত থাকবে বলে সূত্র জানায়, যারা প্রয়োজন হলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করতে বিশেষায়িত ক-৯ ডগ স্কোয়াড ইউনিটও মোতায়েন থাকবে। 

বিজিবি’র ঢাকা সেক্টর কমান্ডার কর্নেল এস এম আবুল এহসান বলেন, ঢাকা সেক্টরের অধীনস্থ ঢাকা ব্যাটালিয়ন (৫ ও ২৬ বিজিবি), নারায়ণগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৬২ বিজিবি) এবং গাজীপুর ব্যাটালিয়ন (৬৩ বিজিবি)-এর দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় ৯টি জেলা ও ৪টি সিটি করপোরেশনের মোট ৫১টি আসনে ৪২টি অস্থায়ী বেইজ ক্যাম্প স্থাপন করে সর্বমোট ১৩৪ প্লাটুন বিজিবি সদস্য নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবে। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। নির্বাচনে বিজিবি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বডি ওর্ন ক্যামেরা, নাইট ভিশন ডিভাইস, মেটাল ডিটেক্টর, এপিসি, আধুনিক সিগন্যাল ও যোগাযোগ সরঞ্জামাদি ব্যবহার করবে, যার মাধ্যমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনী পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যাটালিয়ন এবং সেক্টর সদর দপ্তরে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের দিন বিজিবি মোবাইল ও স্ট্যাটিক ফোর্স হিসেবে টহল পরিচালনা, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট স্থাপন, যানবাহন ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করবে, যাতে কোনো মহল নাশকতা বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে। দেশের জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিজিবি সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে অর্পিত দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে।

নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে ভোটকেন্দ্রে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করার আহ্বান জানান বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জাল ভোট কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করতে হবে।