আর মাত্র তিনদিন বাকি। প্রচার চলবে আজ ও আগামীকাল। অর্থাৎ ১০ই ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটার আগেই শেষ করতে হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা। তাই শেষ মুহূর্তে বিরামহীন প্রচারণায় প্রার্থীরা। দিন-রাত একাকার করে ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। চষে বেড়াচ্ছেন মাঠ-ঘাট। আসন্ন নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও মোটা দাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে বিএনপি জোট ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে।
অন্যদিকে কিছু আসনে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থীও আছেন আলোচনায়। প্রচারের শেষ সময়ে নানা কৌশলে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন প্রার্থীরা। মাঠের প্রচারের সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায়ও চালানো হচ্ছে সরব প্রচারণা। প্রার্থীদের পাশাপাশি দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতারাও ছুটছেন সকাল-সন্ধ্যা। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দিনভর প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন এলাকায়। জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানও ছুটছেন এক জেলা থেকে আরেক জেলায়। দল দু’টির কেন্দ্রীয় নেতারাও যাচ্ছেন এক আসন থেকে আরেক আসনে। একইসঙ্গে কর্মী সমর্থকরাও শেষ সময়ে ভোটারদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে ব্যস্ত। বড় দুই জোটের বাইরের অন্যান্য দলের প্রার্থীরাও আছেন প্রচারণায়। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভোটের মাঠে জোর তৎপরতা শুরু করেছে। মহড়া দেয়া হচ্ছে। টহল দল ঘুরে বেড়াচ্ছে নির্বাচনী এলাকায়। কোথাও কোথাও চেকপোস্টের মাধ্যমে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এমন অবস্থায় আজ এবং আগামীকাল প্রার্থীরা শেষ মুহূর্তের প্রচার চালাবেন। দলগুলোর কেন্দ্রীয় নেতারাও এই দুইদিন ব্যস্ত সময় পার করবেন। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে জাতির উদ্দেশ্যেও ভাষণ দেবেন দলগুলোর প্রধান।
প্রচারণার অংশ হিসেবে নানির বাড়ির এলাকা দিনাজপুরের বিরামপুরে নির্বাচনী জনসভায় অংশ নেন বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঞ্চে উঠেই বলেন, কেমন আছেন আপনারা। আমি কিন্তু খুব ভালো আছি, বহু বছর পর নানির বাড়ি আসছি। এখন নাতি এলো, কিছু খাওয়ালেন না- এটা কি ভালো কথা হলো। নাতি যে আসছে, তাহলে একটা জিনিস দিতে হবে নাতিকে। কী দেবেন নানি বাড়ির লোক। ভোট দেবেন। কিসে ভোট দেবেন, ধানের শীষে। তারেক রহমানের আবদারে জনসভায় উপস্থিত জনতা হাত নেড়ে তার প্রতি সম্মতি জানান। শনিবার বিকাল পৌনে চারটায় বিরামপুর সরকারি কলেজ মাঠে ধানের শীষে বিএনপি’র এই নির্বাচনী জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন তারেক রহমান। এদিন তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের নির্বাচনী সমাবেশেও বক্তব্য রাখেন।
ওদিকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী আসন-ঢাকা-১৭ এলাকায় তার পক্ষে জোর প্রচার চালাচ্ছেন দলের নেতাকর্মীরা। গতকাল দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে তারেক রহমান কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও প্রচারণা চালান।
গতকাল নির্বাচনী প্রচারণায় বিরামহীন ছিলেন জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান। দিনভর ছিলেন সিলেট বিভাগের তিনটি জেলায়। হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সবশেষ সিলেটে বক্তব্য রাখেন। সভায় জামায়াতের আমীর বলেন, গত ৫৪ বছরে দেশের টাকা লুটপাট হয়েছে, সব সরকারের আমলে হয়েছে। কেউ করেছে কম, কেউ বেশি। শুধু ফ্যাসিবাদী সরকার সাড়ে ১৫ বছরে সাড়ে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি নতুন ইতিহাস রচিত হবে। ১৩ তারিখ যে সূর্য উদয় হবে, তার আলো নতুন বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। তবে আমি শুধু জামায়াতের বিজয় চাই না। ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। ১৮ কোটি মানুষের বিজয়ই হবে আমাদের বিজয়।
জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষে তার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা ১৫-তে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। তার সমর্থনে গতকাল মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় দলের নারী সদস্যদের সমাবেশ ও মিছিল হয়েছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নির্বাচনী সভায় অংশ নেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ওই সভায় ভোটারদের উদ্দেশ্যে ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে বাঁচাতে গোটা দেশ তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে। কঠিন সময়ে তারেক রহমান নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাকে শতভাগ সমর্থন দিতে হবে। ধানের শীষের কোনো বিকল্প নাই মন্তব্য করে মহাসচিব বলেন, ধানের শীষের জয়ের মাধ্যমে দেশকে বাঁচাবেন তারেক রহমান।
ওদিকে ঢাকা-৩ আসনে প্রচারণায় ছিলেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। শনিবার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার শুভাঢ্যা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ নুরু মিয়া ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য রাখেন। গয়েশ্বর চন্দ্র বলেন, কার পক্ষে ভোট দেবেন, তা প্রত্যেক ভোটারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তবে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে সবাইকে ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে। যাকে ইচ্ছে ভোট দিন, কিন্তু ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বিরত থাকা উচিত নয়।
ঢাকা-১১ আসনে নিজের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন এনসিপি প্রার্থী নাহিদ ইসলাম। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে তিনি পরিবর্তনের পক্ষে ভোট চান। একইসঙ্গে গণভোটের পক্ষে সমর্থন দিতে ভোটারদের আহ্বান জানান।
ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা রাজধানীর মানিকনগর বিশ্বরোড, বাসাবোসহ বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ করেন। এ সময় তিনি বলেন, ঢাকা-৯ আসনের মানুষের কাছে আহ্বান থাকবে, গণভোটে “হ্যাঁ” ভোটের পাশাপাশি ফুটবলের পক্ষে নতুন রাজনীতির পক্ষে রায় দেবেন।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরাও বিভিন্ন এলাকায় জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন। রাজধানীসহ বিভিন্ন নির্বাচনী আসনে দলের প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকরা শেষ মুহূর্তে বিরামহীন প্রচার চালাচ্ছেন।
ভোটের মাঠে লড়ছেন প্রায় দুই হাজার প্রার্থী: নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের তথ্যমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেছেন ৩ হাজার ৪১৭ জন সম্ভাব্য প্রার্থী। তাদের মধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ২ হাজার ৫৮০ জন। এরপরে শুরু হয় দাবি-আপত্তি, যাচাই-বাছাই। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে মোট ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়ে। এরপর গত ১০ই জানুয়ারি থেকে টানা নয় দিনে আপিল-শুনানি শেষে ৪৩৬ জন প্রার্থিতা ফিরে পায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন দল থেকে ৩০৫ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। ফলে সবশেষ হিসাব অনুযায়ী বিভিন্ন দলের ও স্বতন্ত্রভাবে ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী রয়েছেন ভোটের মাঠের লড়াইয়ে।
নির্বাচনী প্রচারণার সময়সীমা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২২শে জানুয়ারি থেকে ভোটারদের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে ভোট চাওয়ার সুযোগ পান প্রার্থীরা। ইসির ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১০ই ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারবেন প্রার্থীরা। অর্থাৎ ভোট শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগেই থামবে প্রার্থীদের ভোটের প্রচারণার গাড়ি। নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে যা যা করতে পারবেন তাও নির্ধারণ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, প্রথমবারের মতো নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করা হয়েছে পোস্টার।