নির্বাচনের আর বাকি ৫ দিন। সরগরম মাঠ-ঘাট, হাট-বন্দর। ভোটের আমেজ সর্বত্র। দেশ জুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে নিতে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা। অপরাধ প্রবণ এলাকাগুলোতে বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নির্বাচনে দলীয় কোন্দল ও সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রার্থী, প্রতিদ্বন্দ্বী, নেতা-সমর্থকদের মধ্যে হামলা ও সহিংসতা বা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে তা মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছেন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া শীর্ষ অপরাধীদের পুনরায় সক্রিয় হওয়ায় ঝুঁকি বাড়ছে। এ ছাড়া নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটেছে। নির্বাচনকেন্দ্রিক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তি টার্গেট কিলিংয়ের শিকারও হয়েছে। অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)’র তথ্য মতে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৭ মাসে মোট ৬০০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১৫৮ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৮২ জন। এসব সহিংসতার মধ্যে ৫৫০টিতে (৯১.৭ শতাংশ) বিএনপি সম্পৃক্ত। ১২৪টিতে (২০.৭ শতাংশ) ঘটনায় আওয়ামী লীগ, ৪৬টিতে (৭.৭ শতাংশ) ঘটনায় জামায়াতে ইসলামী এবং ৭টিতে (১.২ শতাংশ) ঘটনায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সম্পৃক্ততা রয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরবর্তী ৩৬ দিনের মধ্যেই দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং নতুন করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়ায় সহিংসতার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী মোট জনবলের মাত্র ৯ থেকে ১০ শতাংশ পুলিশ সদস্য হওয়ায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় ঘাটতি রয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর কাওরান বাজারে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ৭ই জানুয়ারি রাত ৮টা ২০ মিনিটের দিকে স্টার কাবাবের পাশের গলি থেকে যাওয়ার সময় তাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ সময় কাওরান বাজার ভ্যান সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। রাজধানীর পল্টনে গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি।
এদিকে গত ৩রা জানুয়ারি রাতে যশোর শহরের শংকরপুর এলাকায় চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে আলমগীর নামে এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর দু’দিন পর ৫ই জানুয়ারি যশোর মণিরামপুরে সাংবাদিক ও বরফকল ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীকে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একই দিন চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় জানে আলম সিকদার (৩৪) নামের যুবদলের এক সাবেক নেতাকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ওই দিন রাত ৯টার দিকে পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের নিজ বাসার সামনে এ ঘটনা ঘটে। মোটরসাইকেলে করে আসা তিন যুবক তাকে লক্ষ্য করে গুলি করলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এর আগে গত ১৮ই ডিসেম্বর খুলনা মহানগরীতে ইমদাদুল হক মিলন (৪৫) নামে এক সাংবাদিককে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এদিকে ২৮শে জানুয়ারি শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে সংঘর্ষে জামায়াত ইসলামীর এক নেতা মারা গেছেন। নিহত মাওলানা রেজাউল করিম শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ছিলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে রাতে তার মৃত্যু হয়। নিহত রেজাউল করিমকে ইট দিয়ে থেঁতলে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন জেলা জামায়াতের আমীর হাফিজুর রহমান। এমন একের পর এক হত্যার ঘটনা ঘটেই চলেছে।
সম্প্রতি পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়ানোর ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছি আমরা। প্রচারণা চালাকালে পুলিশের ব্যস্ততা স্বাভাবিকভাবে বাড়বে। সংঘাত ও সংঘর্ষ যাতে না ঘটে সে ব্যাপারে এখন থেকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। নজরদারি ও পুলিশের কার্যক্রম আরও বেশি দৃশ্যমান করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, কর্মী-সমর্থকের মধ্যে নানা কেন্দ্রিক পক্ষ থেকে চাপ বেশি থাকে, সে কারণে সংঘাত-সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া নানা ধরনের অপরাধীদের সক্রিয়তাও আমরা লক্ষ্য করছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ভোটকেন্দ্রে যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। থানা এলাকা থেকে দূরবর্তী কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি রাখতে হবে। থানা এলাকায় পুলিশি টহল আরও জোরদার করতে হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি মুহাম্মদ তালেবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য আমরা কাজ করছি। ঢাকা মহানগরে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে টহল কার্যক্রম ও চেকপোস্ট।