জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশ নিয়ে তুঙ্গে উঠেছিল প্রত্যাশার পারদ। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সেগুলোর বাস্তব প্রতিফলন নিয়ে তরুণ ভোটারদের বিশেষ করে জেনারেশন জেড বা জেনজি ভোটারদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলছেন, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান তাদের হতাশ করেছে। আবার কেউ নির্বাচনী পরিবেশে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছেন।
রংপুরের পীরগাছা উপজেলায় বাস করেন হাসিবুল হাসান। তিনি বলেন, নির্বাচনকেদ্রিক প্রচার-প্রচারণার ক্ষেত্রে বেশকিছু সংস্কার দৃশ্যমান হয়েছে। পোস্টারের কারণে ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন স্থাপনার সৌন্দর্যহানি হতো। অনেক প্রার্থীই বনকাগজের নির্বাচনী লিফলেট বিলি করার মতো চমৎকার পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। সামগ্রিকভাবে একটা সমপ্রীতিমূলক নির্বাচনী পরিবেশ দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রত্যাশা ছিল নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও স্বচ্ছতা ধরে রেখে কাজ করবে। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানবিরোধী ও চিহ্নিত ঋণখেলাপী প্রার্থীদের প্রার্থিতা বহালের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশন নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একজন জেনজি হিসেবে নির্বাচিত সরকারের প্রতি সর্বপ্রথম প্রত্যাশা থাকবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পাস হলে তারা যেন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করে। বিচারকার্য দ্রুত সম্পন্ন করাসহ বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে গুম, খুন, জুডিশিয়াল কিলিংয়ে জড়িত প্রশাসনের প্রতিটি কর্মচারী ও কর্মকর্তাসহ আয়নাঘরের কুশীলবদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যাশা থাকবে স্বাধীন ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ ও বর্ডার কিলিং বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া।
শিক্ষার্থী জান্নাতুল বুশরা বলেন, নির্বাচন আসছে আসছে বলতে বলতে; নির্বাচন চলেই এসেছে। সত্যি বলতে এবারের প্রচারণাগুলো গতানুগতিক হলেও সহাবস্থান দেখে ভালো লাগছে। কয়েক মাস আগেও যে ধরনের ভয় পেতাম বর্তমানে তা খুব কম চোখে পড়ছে। এবার অনলাইনের প্রচারণা একটু ভিন্নতা পাচ্ছে যা আগে দেখা যায়নি। জীবনের প্রথম ভোট হিসেবে ভোট যেন ভয়, আতঙ্ক ছাড়া দিতে পারি- সেই প্রত্যাশাই করি।
তিনি আরও বলেন, যারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হবেন তারা যেন মানবাধিকারের বুলি না দিয়ে সত্যিকারের মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও ইনসাফের এমন এক নিদর্শন দেখাতে পারেন। যাতে কেউ এটি না বলেন- আমার ভোটটা বৃথা গেল।
সাবিহা ইয়াসমিন বলেন, বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই মানুষের মধ্যে একধরনের আশা, আগ্রহ এবং একই সঙ্গে শঙ্কা কাজ করে। কারণ নির্বাচন শুধু ক্ষমতা বদলের প্রক্রিয়া নয়, এটা গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতার বড় পরীক্ষা। প্রচার-প্রচারণা গত কয়েক বছর থেকে একটু আলাদা মনে হচ্ছে, একেক নির্বাচনী দল একেক ভাবে প্রচারণা চালাচ্ছে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে প্রত্যাশা এটাই যে, সুস্থ সুন্দর একটা নির্বাচন যেন হয়। ভোটার যেন ভয় ছাড়া ভোট দিতে পারেন।
জেনজিদের একটি ব্যক্তিগত ফেসবুক গ্রুপে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। গ্রুপটিতে সদস্য সংখ্যা ১১২ জন। এরমধ্যে ১৮ জন রেসপন্স করেন। যাদের মধ্যে ৭ জন নারী। দীর্ঘ আলোচনা কয়েকটি বিষয় উঠে আসে। এনসিপি তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের বিভিন্ন নেতাকর্মীদের দুর্নীতির সংবাদ তাদের মনোকষ্টের কারণ হয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের নানা কর্মকাণ্ডেরও সমালোচনা করেছেন তারা। এক নারী শিক্ষার্থী সৃজা আহমেদ বলেন, বিএনপি’র গায়ে পূর্বের দুর্নীতির যে ট্যাগ, অভ্যুত্থান পরবর্তী যে চাঁদাবাজির কথা উঠছে তারা সেটাকে শক্তভাবে এড্রেস করতে পারছে না। করলেও শক্তভাবে করছেন না। এই কথার প্রেক্ষিতে মাইনুল ইসলাম বলেন, বিএনপি হঠাৎ বিষোদ্গারের রাজনীতি বেছে নিলো। যা অপ্রত্যাশিত। সেইসঙ্গে তারা অতি আত্মবিশ্বাসী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে হারার পরও।
জামায়াত নিয়ে চারজন নারী শিক্ষার্থী উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সানজিদা ইসলাম বলেন- আমরা চিন্তিত তারা ক্ষমতায় এলে আমাদের অবস্থান কী হবে? আমরা প্রত্যেকেই আগামী পাঁচবছরে কর্মক্ষেত্রে যাবো। আমরা কী স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারবো? কর্মজীবী নারীদের নিয়ে তারা যা বলছেন তা কনসার্ন। তাদের সুসংগঠিত দলে নারীদের ঘোষণা দিয়ে পিছিয়ে রাখা হচ্ছে। বিষয়টি ভাবায়।
তবে আলেয়া ইসলাম এর জবাবে বলেন, তেমন কিছুই হয়তো হবে না। কারণ তাই যদি হতো তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টের পাওয়া যেতো। তার মতে- নারীরা স্বাধীনভাবেই চলাফেরা করতে পারবেন।