মার্কিন বাজারে হঠাৎ ঝুঁকিতে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি। কারণ, ভারতের পণ্যের ওপর মার্কিন পাল্টা শুল্ক কমে ১৮ শতাংশে নেমেছে, অথচ বাংলাদেশের পণ্যের ওপর সেই শুল্ক এখনো ২০ শতাংশে আটকে আছে। এই সামান্য পার্থক্যই দুই দেশের মধ্যে মূল্যগত প্রতিযোগিতায় বড় ফাঁক তৈরি করেছে।
রপ্তানিকারকেরা বলছেন, ভারতের তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের ওপর ২ শতাংশ বেশি শুল্কের কারণে বেসিক টি-শার্ট, নিটওয়্যার ও ক্যাজুয়াল পোশাকের অর্ডার ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
তবে আশার খবরও আছে। বাংলাদেশের ওপর বর্তমান ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্কও কমে আসার আভাস মিলেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি কমে ১৮ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত নামতে পারে।
বাণিজ্যসচিব মো. মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হবে। সেই চুক্তি স্বাক্ষর আলোচনাতেই বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের সঙ্গে তুলনামূলক কম দামে প্রতিযোগিতা করতে পারছেন না। তাতে অর্ডারের ঝুঁকি বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, শুল্কের বৈষম্য অব্যাহত থাকলে রপ্তানি খাত মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়বে। একই সময়ে ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো বৈশ্বিক বাণিজ্য সুবিধা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাবে।
দেশের তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, মাত্র ১-২ শতাংশ শুল্ক পার্থক্যও রপ্তানি অর্ডারের সিদ্ধান্তে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। ভারতের শুল্ক কমানোর ফলে তারা তুলনামূলক কম দামে পণ্য দিতে পারছে, কাঁচামালের সুবিধা পাচ্ছে এবং দ্রুত সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা দামের খেলায় পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছেন, যা উৎপাদন খরচ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকট এবং ঋণের চাপের মধ্যে থাকা কারখানার জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল আজকের পত্রিকাকে বলেন, ভারতের সাফল্য হঠাৎ নয়। ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশটি ৯টি বড় বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যা তাদের রপ্তানি খাতকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছে। এর বিপরীতে বাংলাদেশের কার্যকর বাণিজ্য চুক্তি মাত্র একটি—ভুটানের সঙ্গে; জাপানের সঙ্গে আরেকটি চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। রুবেল মনে করিয়ে দেন, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, পূর্ণাঙ্গ টেক্সটাইল ইকোসিস্টেমের অবকাঠামো ও দক্ষতা উন্নয়ন, উচ্চ মূল্য সংযোজন এবং ফরোয়ার্ড-ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজের ফলেই এই অবস্থান।
অবশ্য মহিউদ্দিন রুবেল পরামর্শ দিয়েছেন, বাংলাদেশের উচিত নিজের আক্ষেপে আটকে না থেকে বিশ্লেষণ করা—কোথায় পিছিয়ে পড়েছে এবং কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব। লক্ষ্যভিত্তিক এফটিএ/সিইপিএ কৌশল, উচ্চ মূল্য সংযোজন, লজিস্টিকস ও বন্দর দক্ষতা, নীতি-স্থিতিশীলতা এবং মানবসম্পদে বিনিয়োগ—এসবই দেশের রপ্তানি খাত পুনরুজ্জীবিত করতে পারে।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে ইহসান শামীম জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে পাল্টা শুল্ক এখন ১৮ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের শুল্ক ২০ শতাংশ। এই পার্থক্যের ফলে রপ্তানিকারকদের ওপর শুল্কের মোট বোঝা বেড়ে ৩৫ শতাংশে দাঁড়াচ্ছে। শামীম আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এই পরিস্থিতি দেশের উদ্যোক্তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাস করছে এবং ক্রেতাদের দামের চাপ তৈরি করছে। তিনি সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন, দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারের প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত এই বিরূপ পরিস্থিতিতেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে।