Image description

জাতীয় সংসদ নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। সারা দেশে চলছে প্রচার-প্রচারণা, সঙ্গে বাড়ছে উত্তেজনা। নির্বাচনি প্রচারে ক্রমশ সহিংস হয়ে উঠছে। এটাই এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় শঙ্কা। এদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরেই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত।

গত তিনটি নির্বাচনে ভোটাররা ভোট দিতে পারেনি। এবারের নির্বাচনে তারা ভোট দিতে উন্মুখ। কিন্তু ভোটারদের মধ্যে যেমন আগ্রহ আছে, তেমনি আছে উ কণ্ঠা আর ভীতি। ভোটের সময় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণ এখনো শঙ্কিত। এই শঙ্কার যৌক্তিক কারণও আছে। নির্বাচনি প্রচারণার পর থেকে সারা দেশে সহিংসতার ঘটনা বেড়েই চলেছে। নির্বাচনের সময় যতই এগিয়ে আসছে ততই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজনৈতিক পরিবেশ। বিভিন্ন জায়গায় প্রার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা এবং অসহিষ্ণু আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভোটের দিন যদি পরিবেশ স্বাভাবিক না হয় তাহলে ভয়ে সাধারণ ভোটাররা ভোট দিতে যাবেন না। এটা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সব উন্নয়ন সহযোগীরা বলেছে তারা বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায়। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যাখ্যাও দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ একাধিক দাতা দেশ। তাদের মতে, নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতিই হলো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাপকাঠি। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আশ্বস্ত করেছেন যে, নির্বাচনে ৫৫ শতাংশের বেশি মানুষ ভোট দেবেন। কিন্তু সেটা তখনই সম্ভব হবে যখন ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে যাবেন। দলের অনুগত নন, এমন সাধারণ নাগরিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভোট কেন্দ্রে যাবেন না। নির্বাচনের আগে এটাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে চলতি নির্বাচনি সময়সীমায় ৫৩ দিনে ২৭৪টি সহিংসতা ঘটেছে।

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, গত ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাত ৯টা পর্যন্ত এসব ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সহিংসতার মধ্যে রয়েছে-ভীতি প্রদর্শন বা আক্রমণাত্মক আচরণ ১৬টি, প্রার্থীর ওপর হামলা ১৫টি, হত্যাকাণ্ড ৫টি, এবং প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ৮৯টি।

এ ছাড়া অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার ৩টি, হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ৯টি। প্রচার কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এসেছে ২৯টি, নির্বাচন সংক্রান্ত অফিস বা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ২০টি, অবরোধ ও বিক্ষোভ ১৭টি এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা একটি।

অন্যান্য ধরনের সহিংসতা ৭০টি। প্রেস উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৩-১৪) ৫৩০টি সহিংসতায় ১১৫ জন নিহত ও ৩১৫ জন আহত হন। একাদশ সংসদ নির্বাচন (২০১৮-১৯) চলাকালীন ৪১৪টি সহিংসতায় ২২ জন নিহত ও ৭৮০ জন আহত হন।

এ ছাড়া দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন (২০২৩-২৪) চলাকালীন ৫৩৪টি সহিংসতায় ছয়জন নিহত ও ৪৬০ জন আহত হয়।

এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, প্রতি নির্বাচনে সহিংসতার প্রকোপের মাত্রা ভিন্ন হলেও প্রতিবারই প্রচুর সংঘাত এবং আহতের ঘটনা ঘটছে।

নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনীতির মাঠ ও নির্বাচনি পরিবেশ ততই সহিংস হয়ে উঠছে বলে উল্লেখ করেছে মানবাধিকার ও আইনগত সহায়তা সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। সংস্থাটি বলছে, গত ডিসেম্বর মাসের তুলনায় জানুয়ারি মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা, নিহতের সংখ্যা এবং আহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আসক বলছে, গত ডিসেম্বরে দেশে মোট ১৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। এসব ঘটনায় চারজন নিহত এবং ২৬৮ জন আহত হন। তবে গত জানুয়ারিতে পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। এই এক মাসে মোট ৭৫টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ এবং আহত হয়েছেন ৬১৬ জন। জানুয়ারি মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে আসক জানিয়েছে, মাসজুড়েই সহিংসতার মাত্রা ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ১ থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত ১০ দিনে ৮টি সহিংস ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং ২৬ জন আহত হন। ১১ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ১০ দিনে ১৮টি ঘটনায় দুজন নিহত এবং ১৭৬ জন আহত হন। ২১ থেকে ৩১ জানুয়ারি ১১ দিনে নির্বাচনি প্রচার শুরু হওয়ার (২২ জানুয়ারি) পর এই সময়ে সহিংসতা সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। মাত্র ১১ দিনে ৪৯টি সহিংসতার ঘটনা ঘটে, যাতে চারজন নিহত এবং ৪১৪ জন আহত হন।

নির্বাচনের আগেও পুলিশ বাহিনী পুরোপুরি সক্রিয় হতে পারেনি। এখনো ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে পুলিশ প্রশাসন জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারেনি। নির্বাচনের ঠিক আগে র‌্যাবের নাম পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট উপদেষ্টা র‌্যাবের নাম পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। কালো পোশাকের র‌্যাবকে আর দেখা যাবে না। পুলিশের বিশেষায়িত এই ইউনিটকে ডাকাও হবে নতুন নামে। কারণ, র‌্যাবের নাম ও পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন অন্তর্র্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) নাম বদলে হচ্ছে স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স (এসআইএফ)। নাম ও পোশাকের পাশাপাশি এই বাহিনীর কার্যক্রমেও সংস্কার আনা হবে।

প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে এই ধরনের ঘোষণা কি আদৌ দরকার ছিল? বিশ্লেষকরা মনে করেন, এর ফলে এই এলিট বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের আরও গুটিয়ে নেবে। এটা নির্বাচনকালীন সময়ে নিরাপত্তাকে আরও দুর্বল করবে।

নির্বাচনে তাই জনগণের প্রধান ভরসা সেনাবাহিনী। গত ৩ ফেব্রুয়ারি সেনাপ্রধান নির্বাচন নিয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করেন। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেছেন, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সরকার, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ ও সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ সবাই আগ্রহী। সেখানে নির্বাচন না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিন বাহিনীর প্রধানদের গাজীপুর জেলা পরিদর্শন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, নির্বাচনের দিন যারা র‌্যাগিং এবং ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দেবে তাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী অ্যাকশন নেবে। অপরাধ করলে যতটুকু আইনে রয়েছে ততটুকু শাস্তি পাবে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তাদের মনে রাখতে হবে, নির্বাচন বিতর্কিত হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে তাদেরই। তাই, নির্বাচনি প্রচারণার শেষ কটা দিন তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো, জনগণকে আশ্বস্ত করা। ভোটাররা যেন ভোট কেন্দ্রে যায় এবং স্বাধীনভাবে তাদের মতামত দিতে পারে তা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেকোনো প্রকারে জয়ী হয়ে ক্ষমতা দখলের মানসিকতা পরিহার করতে হবে। একটি উ সবমুখর নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় যার পক্ষেই যাক না কেন সেটা হবে জনগণের বিজয়, গণতন্ত্রের বিজয়। সব রাজনৈতিক দলই তাতে লাভবান হবে। কিন্তু ভোটারবিহীন একটি সহিংস নির্বাচন দেশকে অস্থিতিশীল করবে। গণতন্ত্রের উত্তরণ বাধাগ্রস্ত হবে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর।