Image description

এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা চালুর পর ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন ছাড়া প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

তবে সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না দলটি। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে দলীয় প্রতীক নৌকাও বাতিল করা হয়েছে।

অথচ সর্বশেষ প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচন ২০০৮ সালেও দলটি ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জুলাই আন্দোলনের পক্ষের দলগুলোর চাপেই মূলত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলেও দলটির নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক যেদিকে যাবে, তা যেকোনও প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে নিয়ামক ভূমিকা রাখতে পারে।

যদিও ভারতে অবস্থানরত দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা সম্প্রতি এক ভার্চুয়াল বৈঠকে নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করেছেন।

অন্যদিকে, ভোটে নৌকা প্রতীক না থাকলেও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের পক্ষে টানতে প্রতিটি দলই নানা কৌশল অবলম্বন করছে। বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখানো হচ্ছে, কেউ কেউ সহানুভূতিও প্রকাশ করছেন। ফলে নৌকাবিহীন এবারের নির্বাচনে দলটির ভোট কোনদিকে যেতে পারে এবং ভোটে এর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে— তা নিয়ে নানা আলোচনা চলছে।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন কেমন হবে বা তাদের ভোট কোন দিকে যাবে, তা বলা মুশকিল। তবে আমার ধারণা, দলটির কিছু নেতাকর্মী ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। আর যারা যাবেন, তাদের ভোট দুই ভাগ হতে পারে। যে যার সুবিধামতো যেখানে নিজেকে নিরাপদ মনে করবেন, সেখানেই যাবেন। এর মধ্যে কেউ বিএনপি, কেউ কেউ জামায়াতকেও বেছে নিতে পারেন।”

তবে সম্প্রতি এক জরিপে উঠে এসেছে আগে যারা আওয়ামী লীগকে (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ভোট দিতেন, তাদের ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ এবার বিএনপিকে ভোট দিতে চান। সেইসঙ্গে, ২০০৮ সালের পর এই প্রথম ভোট দিতে যাওয়া নতুন ভোটারদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন বলেও জরিপের ফলাফলে জানানো হয়।

জরিপটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের না থাকার প্রেক্ষাপট

জুলাই আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার পরও কয়েক মাস রাজনৈতিক দল হিসেবে বৈধ ছিল আওয়ামী লীগ। যদিও তখনও তারা মাঠে নামেনি। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একপর্যায়ে তারা যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে।

পর্যায়ক্রমে জামায়াতে ইসলামি, ইসলামী আন্দোলন ও হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরাও এতে যুক্ত হন। গণঅধিকার পরিষদসহ সমমনা অন্যান্য দলও পৃথকভাবে এই আন্দোলনে ভূমিকা রাখে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনও নেতাকর্মী সরাসরি এতে সম্পৃক্ত হননি, তারা মৌখিকভাবে সমর্থন জানিয়েছেন।

এই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১২ মে আওয়ামী লীগের সাময়িক কার্যক্রম স্থগিত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই দিন দলটির নিবন্ধন বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে যায়।

প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অবস্থান

দেশে গণতান্ত্রিক ধারা চালুর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রতিটি নির্বাচনে হয় সরকার গঠন করেছে, না হয় প্রধান বিরোধী দলের আসনে ছিল আওয়ামী লীগ। তবে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন বর্জন করে দলটি।

১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০ দশমিক ০১ শতাংশ ভোট ও ৮৮টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হয়।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি ৩৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ ভোট ও ১৪৬টি আসন লাভ করে এবং জাতীয় পার্টির সমর্থনে সরকার গঠন করে।

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করলেও আওয়ামী লীগ ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোট ও ৬২টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হয়।

সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৪৯ শতাংশ ভোট ও ২৩০টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে।

পরবর্তী সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও সরকার গঠন করে দলটি।

হঠাৎ আওয়ামী লীগ সমর্থকদের প্রতি সহানুভূতি, নেপথ্যে কী

নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপিসহ জুলাইয়ের পক্ষের দলগুলো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রতি সহানুভূতি দেখাচ্ছে। অনেক নেতা প্রকাশ্যে বলছেন, তারা নির্দোষ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা দেবেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত ভোটের সমীকরণ থেকেই করা হচ্ছে।

গত ২৮ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে প্রচারণায় গিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “এবার তো নৌকা নেই। নৌকা পালিয়েছে। মাঝখানে তাদের যেসব সমর্থক আছেন, তাদের বিপদে ফেলে গেছে। আমরা সেই বিপদে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি।”

একই দিন বিএনপির নেতা আ ন ম এহসানুল হক মিলন চাঁদপুরের কচুয়ায় বলেন, “আওয়ামী লীগের সমর্থকরা আমাকে ভোট দিন, আমি আপনাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবো।”

জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঘোষণা দিয়েছেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হবে না।

গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর তার নির্বাচনি এলকায় বলেছেন, “আওয়ামী লীগের দায়িত্ব আমি নিলাম। আপনাদের একজনেরও বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না।”

এ বিষয়ে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ডা. মিজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “এতদিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলা হয়েছে। এখন মূলত ভোটের হিসাবেই তাদের বাগে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”

জরিপ যা বলছে

কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) ও বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক অপিনিয়ন স্টাডিজ পরিচালিত‘আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: ফাইন্ডিংস ফ্রম আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক মতামত জরিপে বলা হয়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) পছন্দ করছেন।

জরিপের ফল অনুযায়ী, ২০০৮ সালের পর প্রথম ভোট দেবেন—এমন নতুন ভোটারদের ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা এবার জামায়াতকে ভোট দেবেন। ২৭ শতাংশ বিএনপি, ১৭ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। আর ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানিয়েছেন।

সংস্থা দুটি দেশের ৬৪ জেলার ১৮০টি সংসদীয় আসনে ভোটারদের ওপর এই মতামত জরিপ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। মতামত জরিপে অংশ নিয়েছেন ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটার। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই ধাপে জরিপটি করা হয়।

ভোট নেই, ব্যালট নেই প্রচারণার নির্দেশ শেখ হাসিনার

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একাধিক ভার্চুয়াল বৈঠকে যুক্ত হয়েছেন ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনেও আমরা ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়েছি। অথচ মিথ্যা মামলা দিয়ে সেই আওয়ামী লীগকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। কারণ তারা জানে— এত অপপ্রচার সত্ত্বেও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগই জয়লাভ করবে।

তিনি নৌকা প্রতীক না থাকায় ভোটকেন্দ্রে যেতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিরুৎসাহিত করেন। একই সঙ্গে ভোটারদের কাছে গিয়ে ‘ব্যালট নেই, ভোট নেই’— এমন প্রচারণা চালাতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন করতে চাই, বিএনপির মতো বর্জন করতে চাই না।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, জনগণকে বুঝতে হবে— যেখানে নৌকা প্রতীক নেই, সেখানে ভোট দিতে যাওয়া মানে জুলুম করা।

আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট যাবে কোন দিকে

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, আওয়ামী লীগের ২৫-৩০ শতাংশ ভোট আছে। তলার দিকের কিছু ভোটার বিএনপি ও জামায়াতের দিকে ঝুঁকতে পারে। আবার কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রার্থীদের বেছে নিতে পারে।

নৌকা না থাকায় ভোটে প্রভাব পড়বে?

বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় ভোটে কোনও প্রভাব পড়বে কি না— এ নিয়ে রাজনীতিবিদদের মধ্যে দুই ধরনের বিশ্লেষণ রয়েছে। অনেকে মনে করেন, নৌকা প্রতীক না থাকায় ভোটে তেমন কোনও প্রভাব পড়বে না। যেহেতু আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব দেশে নেই, তাই নির্বাচন স্বাভাবিকভাবেই অনুষ্ঠিত হবে এবং ভোটার উপস্থিতিও থাকবে স্বাভাবিক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে বরং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও ভোটকেন্দ্রে যাবেন।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সহ-সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ভোটের সময় নিশ্চয়ই কোনও না কোনোভাবে নির্দেশিত হবেন। তাদের কারণে ভোটে ব্যত্যয় ঘটবে বলে মনে হয় না। আমি মনে করি, যেসব কেন্দ্রে ভীতি থাকবে না, সেখানে নিশ্চয়ই তারা ভোট দিতে যাবেন।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, আওয়ামী লীগ না থাকায় নির্বাচনে কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তাদের সাধারণ সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে যাবেন।