২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনটি রাতের ভোট বলে পরিচিত। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি ছিল ডামি ভোট নামে আখ্যায়িত। ২০১৮ সালে রাতেই জালভোট দিয়ে ব্যালট বাক্স ভরা হয়েছিল। আর পাঁচ বছর পর দিনদুপুরেই জালভোট দিয়ে বাক্স ভরানোর দৃশ্য চোখে পড়ে।
জুলাই অভ্যুত্থানে নতুন সরকার আসে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অতীতের কলঙ্কিত অধ্যায়গুলো মুছে দেয়ার লক্ষ্যে ১২ই ফেব্রুয়ারিকে সামনে রেখে আরেকটি নতুন নির্বাচনের আয়োজন হচ্ছে। কিন্তু এই ভোটেও দেখা দিচ্ছে ভোট কক্ষের নিরাপত্তা শঙ্কা। ভোটের কক্ষে কৌশলে অবস্থান নিয়ে একটি পক্ষে সিল দিয়ে নির্বাচনকে আবারো বিতর্কিত করার চেষ্টা করতে পারে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইতিমধ্যেই জালভোট দেয়ার ছক কষার অভিযোগে লক্ষ্মীপুরে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া জালভোট দেয়ার নানান নীল নকশার কথাও শোনা যাচ্ছে ভোটের মাঠে।
জানা যায়, লক্ষ্মীপুরে অবৈধভাবে তৈরি করা ভোটের ছয়টি সিল জব্দের ঘটনায় জামায়াত নেতাসহ দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় আটক একজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জালভোট প্রদানের জন্য জামায়াত নেতার নির্দেশে গ্রেপ্তার ব্যবসায়ী সিলগুলো তৈরি করেন বলে মামলায় দাবি করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার এসআই হুমায়ুন কবীর বাদী হয়ে দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
আসামিরা হলো- লক্ষ্মীপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সেক্রেটারি ও দক্ষিণ বাঞ্চানগর এলাকার মো. শাজাহানের ছেলে সৌরভ হোসেন শরীফ এবং সদর উপজেলার টুমচর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের টুমচর গ্রামের খোরশেদ আলমের ছেলে ও জেলা শহরের পুরাতন আদালত সড়কের ‘মারইয়াম প্রিন্টার্সের’ স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা। বুধবার দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর মডেল থানার এসআই মনির হোসেন বলেন, মঙ্গলবার বিকালে সোহেলের দোকান থেকে ১৬ ঘর বিশিষ্ট ছয়টি ভোটের সিল, একটি কম্পিউটার ও একটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। পরে তাকে থানা হেফাজতে নেয়া হয়। মামলার পর সোহেলকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তবে আত্মগোপনে রয়েছেন জামায়াত নেতা। এদিকে সিল জব্দের পরপর বিএনপি পক্ষ থেকে সোহেলকে জামায়াতকর্মী বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া সিল বানানোর অর্ডার দেয়া জামায়াত নেতা শরীফের ছবিও ফেসবুকে ছড়িয়েছে।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে জেলা শহরের গোডাউন রোড এলাকায় বশিরভিলা হলরুমে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ও বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী। এ সময় তিনি সিলকাণ্ডে জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলেন। জালভোটসহ জালিয়াতি ও ষড়যন্ত্র করার লক্ষ্যে জামায়াত পরিকল্পিতভাবে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন এ্যানী চৌধুরী। পরে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে একই আসনের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ও জামায়াতের ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম আটক সোহেল জামায়াতের কেউ নয় বলে দাবি করেছেন।
তবে জামায়াত নেতা শরীফের সংশ্লিষ্টার প্রশ্নে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার তদন্ত করে পুলিশ যাকে জড়িত মনে করবে তাকে গ্রেপ্তার করে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করবে। লক্ষ্মীপুর জেলা জামায়াতের আমীর ও লক্ষ্মীপুর-২ আসনের প্রার্থী এসইউএম রুহুল আমিন ভূঁইয়া বলেন, সিলগুলো জব্দের পরপরই শরীফকে দল থেকে বহিষ্কার করেছি। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, জামায়াত নেতা শরীফ ৩০শে জানুয়ারি সোহেলের কাছে পাঁচটি নির্বাচনী সিলের অর্ডার দেন। তিনি এ সংক্রান্ত একটি ভয়েস মেসেজ সোহেলকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করার অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতারণার মাধ্যমে জালভোট প্রদানের জন্য অবৈধভাবে ভোটের সিল তৈরি করা হয়। এসআই মনির হোসেন বলেন, সোহেলকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে এখনো রিমান্ড চাওয়া হয়নি। অপর আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে আর কেউ জড়িত আছে কিনা ঘটনাটি তদন্ত চলছে।
এদিকে এই ঘটনা ছাড়াও বিভিন্নভাবে ভোটের মাঠে কৌশল অবলম্বন করে জালভোট দেয়ার নানা গুঞ্জন রয়েছে। এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডি নম্বর সংগ্রহ করার বিষয়টি। এ নিয়ে একাধিকবার বিএনপি’র পক্ষ থেকে অভিযোগও জানানো হয়েছে নির্বাচন কমিশনে (ইসি)। পরবর্তীতে সংস্থাটি এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি হুঁশিয়ারি বার্তা দেয়।
এনআইডি সংগ্রহের নেপথ্যে যে কারণ: নির্বাচন কমিশনে বিএনপি অভিযোগ করেছে, জামায়াতের প্রার্থী ও প্রতিনিধিরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এনআইডি সংগ্রহ করছেন। সঙ্গে বিকাশ নম্বরও সংগ্রহ করছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ভোটারদের বিকাশ নম্বরে উপহার পাঠানো বা আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে ভোটার টানার চেষ্টা করছেন জামায়াত প্রার্থীরা। কিন্তু এনআইডি কেন সংগ্রহ করছেন? সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের খবর, যে এনআইডিগুলো সংগ্রহ করা হচ্ছে সেগুলোর তালিকা ধরে ভোটার উপস্থিতি নির্ধারণ করবে জোটটি। যেসব ভোটার সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে উপস্থিত থাকবে না সেগুলো নির্বাচনের আগে পরে যেকোনো মুহূর্তে সিল মেরে রাখার পাঁয়তারা করবে। শুধু তাই নয়, ভোটের আগের রাতে কিছু ব্যালটে সিল দিয়ে রাখার চেষ্টাও রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে গুঞ্জন রয়েছে, একটি রাজনৈতিক জোটের নারী সমর্থকরা নেকাব পরিহিত থেকে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করবেন ১২ই ফেব্রুয়ারি। সূত্র জানিয়েছে, এই নারীদের ভোটকেন্দ্রে রাখা হবে শুধুমাত্র জালভোট দেয়ার জন্যই। কোন প্রক্রিয়ায় জালভোট দেবেন সেটাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। জানা যায়, এই নেকাব পরা নারীরা অনুপস্থিত অথবা উপস্থিত থাকা অনেক ভোটারের এনআইডি কার্ডের কপি নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবেন। পর্দা করার অজুহাত দিয়ে তারা নেকাব খুলবেন না এবং সহজেই আরেকজনের ভোট দিয়ে যাবেন।
যেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে বদ্ধপরিকর সেখানে এ ধরনের ঘটনায় ভোটের কলঙ্কিত অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা বলে মনে করছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি মানবজমিনকে বলেন, এগুলো ভয়ানক ব্যাপার। নির্বাচন কমিশনের উচিত এ বিষয়ে তদন্ত করা। এবং ব্যবস্থা নেয়া।
নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক বললেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ। বুধবার এক ব্রিফিংয়ে নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু ও শৃঙ্খলাপূর্ণ রাখতে সবাইকে আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, আর যদি খুব গুরুতর কোনো বিষয়ে নির্বাচন কমিশন নিজেও তা আমলে নিতে পারেন এবং একটা কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে। আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, আমরা মনে করি, নির্বাচনী পরিবেশ যথেষ্ট ভালো আছে, তুলনামূলকভাবে ভালো আছে তো অবশ্যই বলবো।