কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গত টানা তিনটি জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ায় এবারের নির্বাচনে আশাবাদের একটা জায়গা তৈরি হয়েছে। সর্বত্র আশা করা হচ্ছে এবার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে এবং সাধারণ ভোটাররা ব্যাপকভাবে তাতে অংশগ্রহণ করবেন। নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে একটা ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নারী ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহের কমতি নেই। তাই সবার সাধারণ প্রশ্ন, কেমন হবে কাঙ্ক্ষিত সেই আগামী সাধারণ নির্বাচন।
নির্বাচনে নারীদের ওপর সাইবার হামলাসহ কিছু শঙ্কা ও সহিংসতা হলেও শেষ পর্যন্ত একটা ভালো নির্বাচন হবে বলে সবাই আশা করছেন। রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহল বলছে, অতীতের নির্বাচনগুলোয় ভোট ছাড়া নির্বাচন হয়েছে। এবারের নির্বাচন যদি শান্তিপূর্ণ ও অবাধ হয় তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত কয়েক মাস দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে এসে যা বুঝতে পেরেছি এবার নির্বাচনে আশাবাদের জায়গা আছে। আশা করছি, এবার নির্বাচন গ্রহণযোগ্যভাবেই হবে। এতে জনগণ ও ভোটার ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করবেন বলেই আমার ধারণা। এ নির্বাচনের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার সংশ্লিষ্ট। তারা এ নির্বাচন করতে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ। তিনি বলেন, সামরিক বাহিনী ২০২৪-এর আগস্টের পর থেকেই মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। তারা প্রশাসনকে সহায়তা করছে। নির্বাচন যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় তার জন্য তারাও উদগ্রীব। সেনাপ্রধানও তার বক্তব্যে এ কথা কয়েকবার বলেছেন। নির্বাচন কমিশন এ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ব্যাপারে উদগ্রীব হয়ে আছে। প্রশাসন চায় একটা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব সরকার গঠন করুক। ব্যবসাবাণিজ্য ভালোভাবে পরিচালনার জন্য ব্যবসায়ীরা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন চান। এ ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারের বিকল্প নেই। তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা শঙ্কা প্রকাশ করলেও মনে করেন একটা ভালো নির্বাচনের জন্য সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে। আমার ধারণা, নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণভাবে এবং অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এবার সবার প্রত্যাশার সঙ্গে সরকারও একটি ভালো বা ঐতিহাসিক নির্বাচন করতে চায়। জনগণ বা ভোটাররাও চায় একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে যে ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন, নির্বাচনটি যাতে সেই বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জন করতে পারে। কারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পরিপূর্ণভাবে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। সেই জনআকাঙ্ক্ষা থেকে ভোটারদের মধ্যে একটি আগ্রহের জায়গা আছে। কিন্তু এই একটি ভালো বা গ্রহণযোগ্য এবং একই সঙ্গে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য যে ব্যবস্থাগুলো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গ্রহণ করা প্রয়োজন, সে ব্যবস্থাগুলো নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন আছে।
তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করছেন। এ ক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেগুলো পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলেই তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
টান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মানুষ প্রত্যাশা করছে যে, এ নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, সরকার, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করবে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি এমন না চায় তাহলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা যাবে না। এখন পুঁজির ওপর নির্ভর করে রাজনীতি ও নির্বাচন হয়। আর এ পুঁজির উপাদানগুলো হচ্ছে অর্থ, পেশি, ধর্ম এবং পুরুষতন্ত্র। প্রার্থীর কাছে এ চারটা উপাদানের প্রভাবের কারণে এটি হয়ে গেছে ক্ষমতার নির্বাচন। তিনি বলেন, তার পরও নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তী নির্বাচনকালীন সরকার, কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে পুলিশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, প্রশাসন, সেনাবাহিনী যাদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং বিশেষ করে রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যম এদের যদি সবার মধ্যেই সমান দায়িত্ববোধ থাকে তাহলেই এটা অর্জন করা সম্ভব। অন্যথায় খুবই কঠিন হবে।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আমি অবশ্যই মনে করছি এ নির্বাচন সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হবে। জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমেই এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে যাচ্ছে। যেহেতু ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে সরকার, সে সরকার নিরপেক্ষতার প্রশ্নে একেবারে প্রশ্নাতীত। আমরাও খুব দৃঢভাবে বিশ্বাস করি যে, আসছে নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, সংস্কার, নির্বাচন আর বিচার- এ তিন এজেন্ডা নিয়েই এসেছে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই গণ অভ্যুত্থানের স্পিরিটের মধ্য দিয়ে। এখন নির্বাচন হতেই হবে। সে জায়গায় পরিবেশ-পরিস্থিতি ঠিক বুঝতে পারছি না কী রকম। দুটো বিষয়ে মনে খুব কষ্ট পাচ্ছি বলা যেতে পারে। একটা হচ্ছে গণ অভ্যুত্থানে আমাদের সন্তানরা আত্মাহুতি দিল, সেখানে যেভাবে রাজনৈতিক দলগুলা পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি করছে, মনে হচ্ছে যেন মানবিক মূল্যবোধটা হারিয়ে যাচ্ছে। এখন নির্বাচন করতে গিয়ে যদি মানবিকতা হারিয়ে যায় তাহলে সেটা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এটা একটা আশঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, কাদা ছোড়াছুড়ি এখনো কেন শেষ হলো না। আমরা তো এই প্রথার পরিবর্তন চেয়েছি। নারীর প্রতি যেভাবে সহিংসতা হচ্ছে তা শুধু শারীরিক না, সাইবার সহিংসতাও হচ্ছে। এ সাইবার সহিংসতা থেকে নারীকে রক্ষা কর খুবই প্রয়োজন। আবার প্রতিপক্ষ দলের মধ্যে সংঘাত দেখা যাচ্ছে। এটাও ভালো লক্ষণ না।