মা (গৃহকর্ত্রী বিথী) আমাকে নির্যাতন করেছে। যখন তখন আমাকে মারধর করতো। খুন্তি গরম করে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছ্যাঁকা দিত। মাথার চুল টেনে ছিড়ে ফেলতো। আমাকে কখনো স্যারের (গৃহকর্তা) কাছে যাইতে দিত না। সবসময় আমাকে বাথ রুমে (ওয়াশ রুম) আটকে রাখতো। খাইতে দিত না। পেটে খিদা লাগলেও আমি ভয়ে খাবার চাইতাম না। আমি আমার মা’র (গৃহকর্ত্রী) বিচার চাই, তার ফাঁসি চাই।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের ১৫ নাম্বার কক্ষে চিকিৎসাধীন মোহনা (১১) এসব কথা বলেন। গৃহকর্মী মোহনা গৃহকর্ত্রী বিথীকে মা বলে ডাকতো।
মোহনা আরো বলেন, মা’র (গৃহকর্ত্রী) সাথে বাড়ীর মহিলা বুয়া এবং ছেলে বুয়াও আমাকে মারধর করতো। আমাকে তারা মারধর করলে মা (গৃহকর্ত্রী) তাদেরকে কিছু বলতো না। তোমাকে মারার সময় স্যার কোথায় ছিল জিজ্ঞাসা করলে সে জানায় স্যারের (গৃহকর্তা) সামনে আমাকে কখনো যাইতে দিত না। আমাকে মারধর করলে স্যার জানতো না। স্যার বাসায় আসলে আমাকে বাথরুমে আটকে রাখতো। স্যার আমাকে কখনো মারেনি। স্যারের কোনো দোষ নাই। আমি একটু একটু কাজ করতাম, বাসায় বাবুকে দেখতাম। তরকারি কেটেকুটে দিতাম, ঘর মুছতাম। বাথরুমে বসে থাকি কিল্লিগা, বাবু দেখি না, কাজ করিনা তার জন্য আমাকে খুন্তি দিয়া, লাঠি দিয়ে মারতো। সারা শরীরেই এরকম মারছে। খুন্তি পোড়া দিয়ে আমাকে এভাবে মারতো। বাথরুমে দরজা আটকে সারাদিন বসায়ে রাখতো।
মোহনা পঞ্চগড় জেলা সদর উপজেলার ফকিরপাড়া গ্রামের হোটেল শ্রমিক গোলাম মোস্তফার মেয়ে। সে তার বাবার সাথে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী থানার কুদ্দুস নগরের পেয়ারা বাগান এলাকায় বাবার সাথে বসবাস করতো। গোলাম মোস্তফার কোনাবাড়ী এলাকার একটি ছোট্ট হোটেলে শ্রমিকের কাজ করেন। তিন বছর বয়সে তার (মোহনার) মা গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা এলাকায় ট্রাক ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত হয়। এরপর কয়েক বছর সে তার দাদীর সাথে থাকতো।
মোহনার বাবা গোলাম মোস্তফা বলেন, গত কোরবানির ঈদের পর আমি উত্তরা এক দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। ওই চা দোকানের সামনের উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ৭/ সি, ২৬ নং বাড়ীর সিকিউরিটি গার্ড (দারোয়ান) জাহাঙ্গীর কথায় কথায় চা দোকান মালিকের সাথে আলাপ করতেছিল বিমান কর্মকর্তা স্যারের বাসায় একটা কাজের মেয়ে লাগবে। তখন আমি তার সাথে কথা বলি এবং আমার মেয়ে আছে জানাই। তখন বলে নিয়ে আসেন ম্যাডাম খুব ভালো মানুষ। পরে দারোয়ানের কথামতো যেদিন মেয়ে নিয়ে আসি সেদিন বাসায় উঠে দেখি টেবিলে খাওয়ার অভাব নাই, হিসাব ছাড়া টেবিল ভর্তি খাবার ছিল। বাসায় নিয়ে গেলে ম্যাডাম আমাকে বলে কি হিসেবে তোমার মেয়েকে দিবা? কন্টাক্ট দিবা? তখন আমি বলি আমি কন্টাকে মেয়েকে দিব না। আমার মেয়ের ভবিষ্যতের (বিয়ে সাদি এবং ব্যাংক ব্যালেন্স) জন্য আপনার কাছে রেখে যাব। আর কিছু চাই না। এটা বললে তিনি রাজি হলে মেয়েকে রেখে যাই। প্রায় আট মাস ম্যাডামের বাসায় ছিল। ৩০ জানুয়ারি ম্যাডাম আমাকে ফোন দেয় তোমার মেয়েকে এসে নিয়ে যাও। ৩১ জানুয়ারি দুপুরে আমি মাকে সাথে নিয়ে উত্তরায় আসি। ম্যাডাম তখন বাসায় ছিল না। দারোয়ানকে বলি ম্যাডামকে বলেন আমি আসছি, তখন সে আমাকে বলে তুমি আসবা আমি জানি। বিকেলের দিকে ম্যাডাম বাহির থেকে এসে সরাসরি বাসায় ৬ষ্ঠ তলায় উঠে পড়ে। হাতে সাদা একটা কাগজ নিয়ে সন্ধ্যায় নিচে নামে। আমাকে বলে সাদা কাগজে সাইন দিতে বলে। পরে আমার কাছে মেয়েকে এন দেয়। মেয়েকে দেখে আমি বলি ম্যাডাম এরকম হলো কেন আমার মেয়ের? আমি তো আমার মেয়েখে এমন দেইনি আপনার কাছে? তখন ম্যাডাম বলে বাতরুমে পড়ে গিয়ে এরকম হয়েছে এবং শরীরে চুলকানি হয়েছে। তখন ম্যাডাম আমাকে বলে একটা ঠিকানা দিয়ে দেই সেখানে যাও কবিরাজের কাছে। তোমার মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে কবিরাজের কাছে নিয়ে যাও। সাদা কাগজে সাইন দেওয়ার পর দারোয়ান এবং ম্যাডাম বলে তোমার মেয়ে বুঝে পাইছো? আমি, বলি পাইছি। আট মাসের মধ্যে আমি কোনদিন স্যারের (গৃহকর্তা) সাথে দেখা করতে পারিনি। শুধু কাজের বুয়া এবং ম্যাডামের সাথে দেখা করেছি। তবে প্রথম দিন ছাড়া আমাকে কোনোদিন বাসায় উঠায়নি। আসলে নিচ থেকে দেখা করে চলে যেতে হয়েছে। আমার মেয়েকে নির্যাতনের বিষয়ে স্যার কিচ্ছু জানতো না। দারোয়ান বলছে স্যার খুব ভালো মানুষ। উত্তরা থেকে বাসায় আসার পথে আমার মেয়ে সারা রস্তায় আমাকে শুধু বলছে আব্বা আমি খাব, খাব। যা দিয়েছি তা’ই খাইছে। আমার মেয়েকে না খেয়ে রাখতো এবং খালি মারতো। সবসময় বাথরুমে মেয়েকে রেখে দিত, রাতেও বাথরুমে রাখতো।
গোলাম মোস্তফা আরো বলেন, আমি গরীব মানুষ, আমি আমার মেয়েকে পালতে (লালন পালন) পারব না দেখে বড় লোকের বাসায় দিয়েছিলাম। তারা অনেক বড়লোক মানুষ। নেওয়ার সময় বলেছে তারা মেয়েকে লালন পালন করে বিয়ে-সাদি দিব। এখন দেখি তাদের কাছে আমার মেয়ে আর কয়েকদিন থাকলে মারা যেতো। মেয়ের এরকম অবস্থা করবে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। এটা অত্যাচার। আমি তাদের বড় একটা শাস্তি চাই, ফাঁসি চাই। যেন সারা বাংলাদেশের মানুষ দেখতে পারে। অন্য ঘরের বড়লোকের বউয়েরা যেন ভালো হয়ে যেতে পারে এবং বড়লোকরা যেন ভালো হয়ে যায়। আট বছর পর্যন্ত আমার মেয়েকে স্থানীয় ইসরাফিল তার বাসায় রেখে লালন-পালন করেছে। আমি চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। আমি সবার শাস্তি চাই এবং গৃকর্ত্রীর ফাঁসি চাই।
মোহনার দাদী রেজিয়া (৭০) বলেন, মহিলা (গৃহকর্ত্রী) কিছু করেনা। মহিলা বাসায় থাকে। জামাই এয়ারপোর্টে চাকরি করে। মহিলা খুবই দুর্ব্যবহার করে। মানুষকে মানুষ মনে করে না। গেলে মেয়েকে দেয় না। লাস্টে এই অবস্থা করে মেয়েকে দেয়। খুরচুন (খুন্তি) গরম করে করে মেয়েকে মারত। পিছনে লাঠি দিয়ে বাইড়িয়ে বাইড়িয়ে ফাটাইয়া ফেলেছে। লাঠির বারিতে এমন গর্ত হয়ে গেছে। কোমরে ঘা হয়ে গেছে। মোহনাকে নেওয়ার আগে বলছে খালা বাচ্চাটা দেন। আমার একটা বাচ্চা আছে তাকে নিয়ে খেলবে, অসুবিধা হবে না আমরা লেখাপড়া করামু, খুব যত্নে রাখমু। আমরা বাড়িওয়ালা। প্রথম প্রথম যাইতাম দেখাইতো। এক মাস পরে পরে একদিন যাইতাম দেখাইতো। তবে ওনারা গালাগালি করত আপনারা মানুষ না অমানুষ। আপনাদের যখন খুশি তখনই আসবেন দেখতে? বিভিন্ন কথাবার্তা বলতো। বললে পরে কান্দাকাটি করে চলে আইতাম। ফোন দিলে ফোন ধরতো কথা বলতো। শেষের তিন মাস আমাদেরকে যাইতে দেয় না দেখা করতে দেয় না। গেটে দারোয়ান আছে না, ওই দারোয়ান ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। বলে আমাদের চাকরি থাকবে না। ফোন দিলে বলে মেয়ে নেই ওমুকদিন আসেন, তমুক দিন আসেন। আমার ছেলে আমাকে নিয়ে ওই বাসায় যাই। বাসায় দুপুরের দিকে গেছি, সন্ধ্যা ৬টার সময় বের করে এনেছে মেয়েকে। মেয়ে তার আব্বারে ধরে কান্নাকাটি শুরু করছে। কতক্ষণ পরে দেখি একটা সাদা কাগজ নিয়ে আসলো আর বাইরে থেকে কয়েকজন লোক আসলো। তাগরে আমরা চিনি না। বলতেছে এখানে সাইন দেও। এখানে সাইন দিয়া নিয়া যাও। আমার কোন দাবী নেই এবং আমি আমার মেয়েকে সুস্থ শরীরে নিয়ে গেলাম। আমি পরে ম্যাডামরে বললাম আমরা তো গরিব মানুষ আমরা কিভাবে ডাক্তার দেখাবো আমাদেরকে কিছু টাকা দেন। তখন ম্যাডাম পাঁচ হাজার টাকা দিল। তখন ম্যাডাম বলল খালা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান ডাক্তার দেখান, কবিরাজ দেখান, এরপরে যদি কিছু টাকা পয়সা লাগে আমরা দিব। তারপর আমি আমার ছেলেকেসহ নাতনিকে নিয়ে চলে আসি।
মোহনাকে আট বছর পর্যন্ত লালন-পালন করা ইসরাফিল বলেন, আমি মোহনাকে লালন পালন করেছি আট বছর। আট বছর লালন পালন করার পরে তার বাবা এবং দাদী এসে বলে আমার মেয়েটা নিয়ে চলে যাব। আমি একটা জায়গা পাইছি পয়সাওয়ালা মানুষ, আমার মেয়ের ভালো একটা ব্যবস্থা করে দিবে। তখন আমি বলছি আপনাদের মেয়ে রাখার ক্ষমতা আমার নেই। কারণ, আমি কাগজপত্র করে রাখি নাই, আপনাদের মেয়েকে নিয়ে আপনারা চলে যান। তখন এই মেয়েকে নিয়ে গিয়ে কোরবানি ঈদের পরে ২৫ তারিখে ওখানে (উত্তরা) নিয়ে গেছে। পরে শুনলাম বেশ কিছুদিন ভালোই ছিল। তারা বলেছে পাঁচ মাস যাবত আমাদেরকে (বাবা ও দাদিকে) দেখা সাক্ষাত করতে দিছে। কিন্তু, তিন মাস যাবত আমাদেরকে দেখা-সাক্ষাৎ করতে দিচ্ছে না, গেলেই বলে আমি আজকে বাসায় নাই, বেড়াতে এসে পড়েছি, বিভিন্ন কারণ দেখায়। আমার একটাই আশা তাদের এরকম একটা বিচার করুক, মানুষ যেন দেখে, ভবিষ্যতে এরকম একটা গরিব বাচ্চাকে নিয়া যাইয়া যেন কেউ এরকম অত্যাচার না করে।
গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান চিকিৎসক মোহাম্মদ খলিলুর রহমান বলেন, মোহনার শরীরের আঘাতগুলো দীর্ঘ মেয়াদি। সিরিয়াল অনুযায়ী বা রুটিন মাফিক শিশুর হাতে, পায়ে, পিঠে আঘাত করা হয়েছে। প্রকারভেদে আঘাতের সময়সীমা ১০দিন, ১৫দিন এবং ২০দিন। কোনো কোনো আঘাত এক মাস বা দুই মাস। গুণগত মানসম্পন্ন খাবারও খেতে দেয়নি শিশুটিকে।
রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি কাজী রফিক আহমেদ বলেন, শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের মামলায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমান এবং তাঁর স্ত্রী বিথিকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। গ্রেফতার অপর দুইজন হলেন শফিকুর রহমানের বাসার গৃহকর্মী রুপালী খাতুন এবং সুফিয়া বেগম।