নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আবারও তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করে। দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিতে তারা সারা দেশে এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। দ্য উইক-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুর্নীতি ও অযোগ্য শাসনে হতাশ তরুণ প্রজন্মের জন্য তার দল একটি সুশৃঙ্খল বিকল্প। বিএনপির আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের অনীহা সত্ত্বেও ডা. রহমান “গঠনমূলক সহযোগিতা” এবং একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় সরকারের প্রতি উন্মুক্ত মনোভাব প্রকাশ করেছেন—তবে শর্ত হলো, সেই অংশীদারিত্ব হতে হবে অভিন্ন নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে।
সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ নিচে তুলে ধরা হল:
প্রশ্ন: নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে জামায়াতে ইসলামী কতটা প্রস্তুত?
ডা. শফিকুর রহমান: যদিও স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাত্র কয়েক দিন আগে জামায়াতে ইসলামীর ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে ২০১৩ সাল থেকেই দলটিকে কার্যত নিষিদ্ধ সংগঠনের মতো আচরণ করা হয়েছে। বিচার বিভাগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল এবং দলীয় প্রতীক কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
এই দমন-পীড়নের সময়কালেই বাংলাদেশে নির্বাচনী গণতন্ত্র ভেঙে পড়ে। ২০০১ সালে সর্বশেষ প্রকৃত অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রধান বিরোধী দলগুলো বর্জন করেছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচন, যা ‘রাতের ভোট’ হিসেবে কুখ্যাত, ভোটের দিন আগেই ব্যালট বাক্স ভরাট করে কলঙ্কিত করা হয়েছিল। আর ২০২৪ সালের নির্বাচনেও ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য, যদিও শাসক দলের ভেতরেই অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল।
নিবন্ধন বাতিল, গণগ্রেফতার এবং ভীতি প্রদর্শনের পরও জামায়াতে ইসলামী কখনো জনগণের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে, বিশেষ করে ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আমাদের ফলাফল প্রমাণ করেছে আমাদের সংগঠনের দৃঢ়তা এবং জনসমর্থন। সম্প্রতি গণঅভ্যুত্থান এবং আদালতের মাধ্যমে জামায়াতের নিবন্ধন ও প্রতীক ফিরে পাওয়া আমাদের সমর্থকদের আরও উজ্জীবিত করেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে আমরা জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি—৩০০টি আসনেই প্রার্থী বাছাই এবং সরাসরি জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আমাদের ছাত্রসংগঠনের বিজয় তরুণ ভোটারদের মধ্যে আমাদের প্রতি ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন। সেই অর্থে, জামায়াতে ইসলামী শুধু প্রস্তুতই নয়, আমরা পুরোপুরি তৈরি। সর্বোপরি, আমাদের প্রধান দাবি হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।
প্রশ্ন: আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে কাটানো বছরগুলো থেকে জামায়াত কী শিক্ষা নিয়েছে?
ডা. শফিকুর রহমান: আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থেকেও জামায়াত কখনো গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততা ত্যাগ করেনি। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে আমরা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে অভিন্ন প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের শিখিয়েছে যে, গণতন্ত্র যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর ঐক্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এই বছরগুলো শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীকে শক্তিশালী করেছে। আমরা আমাদের সাংগঠনিক কাঠামো সুসংহত করেছি, অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা জোরদার করেছি এবং তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করেছি। আমরা আমাদের রাজনৈতিক কৌশলগুলো পুনর্মূল্যায়ন করেছি যাতে তা সমসাময়িক বাস্তবতার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী থাকে। জামায়াতে ইসলামী একটি প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থী ইসলামী রাজনৈতিক দল, যা গণতান্ত্রিক ও জনমুখী রাজনীতিতে অটল থেকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেদের নীতিমালা পরিমার্জন করে।
প্রশ্ন: জামায়াতকে প্রায়ই ক্যাডারভিত্তিক আদর্শিক দল বলা হয়। এই আদর্শিক প্রতিশ্রুতিকে আপনারা কীভাবে গণমানুষের নির্বাচনী আবেদনে রূপান্তর করবেন?
ডা. শফিকুর রহমান: জামায়াতে ইসলামী সত্যিই একটি ক্যাডারভিত্তিক আদর্শিক দল, কিন্তু আমাদের আদর্শের ভিত্তি হলো শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা এবং জনসেবা। জামায়াত তার গঠনতন্ত্রের প্রতিটি শব্দ ও চেতনা মেনে চলে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে বছরের পর বছর দমন-পীড়নের মধ্যেও আমরা অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রেখেছি।
যখন দুর্নীতি ও সুবিধাবাদ রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করেছে, তখন মানুষ সততা ও ধারাবাহিকতাকে বেশি মূল্যায়ন করছে। নিরপেক্ষ জরিপে দেখা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর জনসমর্থন বাড়ছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে ভোটাররা সুবিধাবাদের চেয়ে নীতি এবং কথার ফুলঝুরির চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতাকে বেশি পছন্দ করেন। সেই প্রেক্ষাপটে, জামায়াতের আদর্শিক প্রতিশ্রুতি কোনো সীমাবদ্ধতা নয়, বরং এটি আমাদের শক্তি।
প্রশ্ন: তরুণ এবং নতুন ভোটারদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য জামায়াতের পরিকল্পনা কী?
ডা. শফিকুর রহমান: দুর্নীতি, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং অকার্যকর শাসনে হতাশ প্রজন্মের কাছে জামায়াতে ইসলামীর ভিশন বা লক্ষ্য দারুণভাবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তরুণরা উদ্দেশ্য, সততা এবং সুযোগ খুঁজছে; আর জামায়াত মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প দিচ্ছে। সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে এই সংযোগ ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান।
আমাদের নীতিমালার অগ্রাধিকার হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরি করা—যাতে তরুণরা বিদেশে পাড়ি দেওয়ার বদলে দেশেই মর্যাদাপূর্ণ ক্যারিয়ার গড়তে পারে। আমরা তরুণদের ‘ম্যানেজ’ করার মতো কোনো সমস্যা মনে করি না, বরং তাদের জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার ভাবি। জামায়াত ‘জুলাইয়ের চেতনা’কে ধারণ করে—যা গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে তরুণদের আত্মত্যাগের এক অনন্য মুহূর্ত।
প্রশ্ন: সমালোচকরা বলেন, জামায়াতের অতীত তাদের বর্তমানকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
ডা. শফিকুর রহমান: আমি একমত নই যে জামায়াতে ইসলামীর অতীত তার বর্তমানকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। বাংলাদেশের মানুষ আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে ভালোভাবেই জানে এবং একাধিকবার ভোটের মাধ্যমে জামায়াতের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছে। কোনো দলের অতীতকে বিচ্ছিন্নভাবে মূল্যায়ন করা বা বর্তমান গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়।
তবে জামায়াত নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং পুনর্মিলনে বিশ্বাস করে। জামায়াতে ইসলামীর আমির হিসেবে আমি প্রকাশ্যে বলেছি, ১৯৪৭ সাল থেকে জামায়াতের কোনো সদস্যের কর্মকাণ্ডে যদি কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন, তবে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি। এটি আমাদের বিনয়, নৈতিক জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
প্রশ্ন: অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট বা নির্বাচনী সমঝোতার ক্ষেত্রে জামায়াত কতটা উন্মুক্ত?
ডা. শফিকুর রহমান: আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সহযোগিতা অপরিহার্য। জামায়াত স্বল্পমেয়াদী সুবিধার চেয়ে নীতির ভিত্তিতে জোট গঠনের পক্ষে।
আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি তিনটি আপোষহীন নীতির ওপর দাঁড়িয়ে: জুলাইয়ের চেতনা এবং স্বৈরাচার প্রতিরোধের প্রতি অঙ্গীকার; দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স; এবং জাতীয় স্বার্থ ও জনকল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে দেশপ্রেমিক রাজনীতির প্রতি অকৃত্রিম প্রতিশ্রুতি। এই নীতি মেনেই জামায়াত ইতিমধ্যেই ১০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একটি নির্বাচনী জোট গঠন করেছে—যা প্রমাণ করে যে জাতীয় নবজাগরণের জন্য আমরা আদর্শিক মতপার্থক্য ভুলে নীতিগত সহযোগিতায় বিশ্বাসী।
প্রশ্ন: গণতন্ত্র, জেন্ডার ইনক্লুশন (নারী অন্তর্ভুক্তিকরণ) এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে জামায়াতের অবস্থান কী? কেন কোনো নারী প্রার্থী নেই?
ডা. শফিকুর রহমান: জামায়াতে ইসলামী গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের ভিশন হলো সকল বাংলাদেশির জন্য ন্যায়বিচার, সমান নাগরিকত্ব এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করা। এর প্রতিফলন হিসেবে জামায়াত হিন্দু সম্প্রদায় থেকে একজন প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে, যা সংখ্যালঘুদের অর্থবহ প্রতিনিধিত্বের প্রতি আমাদের অঙ্গীকারকে তুলে ধরে।
নারীদের অংশগ্রহণের বিষয়ে বলতে গেলে, জামায়াতের সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং নীতিনির্ধারণে নারীদের অংশগ্রহণের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। নারী প্রার্থীর অনুপস্থিতির কারণ হলো জোটভিত্তিক আসন বণ্টন, যেখানে প্রতি আসনে একজন প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। আমাদের জোট শরিকদের নারী প্রার্থীদের জামায়াত পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে এবং তাদের জোটের যৌথ প্রার্থী হিসেবেই বিবেচনা করছে।
অতীতের স্থানীয় নির্বাচনে জামায়াত অসংখ্য নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে এবং নারী সদস্যরা সংসদীয় কার্যক্রম ও নীতি প্রণয়নে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছেন। আমাদের নীতিমালার কাঠামো একটি ভিত্তি সম্পন্ন জাতীয় সরকারের ওপর জোর দেয়, যা সব স্তরে নারী, সংখ্যালঘু, তরুণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে।
সূত্র : দা পোস্ট/ আরটিএনএন