রাজনীতির ভাষা, কৌশল ও ক্ষমতার ভারসাম্য আমূল বদলে দিয়েছে ‘ডিজিটাল বিপ্লব’। একসময় রাজনৈতিক প্রচারণা বলতে বোঝাত মাঠে-ময়দানে সভা, পোস্টার, দেয়াললিখন কিংবা টেলিভিশন ও পত্রিকার বিজ্ঞাপন। কিন্তু গত এক দশকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথা ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার ও টিকটক রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ফলে নির্বাচনী মাঠে প্রার্থীদের বক্তব্য, আচরণ এমনকি ব্যক্তিগত মুহূর্তও এখন এই প্ল্যাটফর্মগুলোর কড়া নজরদারিতে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সহায়ক নয়, বরং নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রার্থীরা কী বলবেন, কীভাবে বলবেন, কখন বলবেন প্রায় সবকিছুই এখন অনেকাংশে নির্ধারিত হচ্ছে অনলাইন প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে।
সম্প্রতি এক জনসভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করেন বরগুনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত সহকারী সেক্রেটারি মো. শামীম আহসান। তিনি দাবি করেন, একসময় ডাকসু ছিল ‘মাদকের আড্ডা ও বেশ্যাখানা’। তার এই বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
ঘটনাটি ঘটে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া ইউনিয়নের কাটাখালি এলাকায়।
নির্বাচনী মাঠে সংশ্লিষ্ট এক কর্মী জানান, শামীমের ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর এলাকায় পোস্টার ছেঁড়া হয়েছে, কর্মীরা নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। প্রার্থী নিজেও কয়েক দিন প্রকাশ্যে আসতে পারেননি।
১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঢাকা-৮ আসনে তার প্রচারণার শুরুতেই বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে নিশানা করেন।
ধারাবাহিক আক্রমণ, সমালোচনা ও ট্রোলিংয়ের মুখে পড়লেও এর বিপরীতে মির্জা আব্বাস তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ব্যঙ্গচিত্র, মিম ও সম্পাদিত ভিডিও ছড়ানো হলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন না। একাধিক নির্বাচনী সভা ও গণসংযোগে মির্জা আব্বাস বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন তিনি দেখেন না। অনলাইন বিতর্কে না জড়িয়ে তিনি সরাসরি জনগণের প্রশ্নের উত্তর দিতে চান।
তবে তার ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানায়, অনলাইন সমালোচনার প্রভাব মাঠেও পড়েছে। ভোটারদের সঙ্গে আলোচনায় বারবার এসব প্রসঙ্গ উঠে আসছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নজরদারি ও নেতিবাচক মন্তব্য একজন প্রার্থীর জন্য সহজ নয়। মির্জা আব্বাসের সংযত অবস্থানের পেছনে রয়েছে প্রবল মানসিক চাপ। তিনি ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কার্যত একটি ‘ধৈর্যের পরীক্ষা’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন প্রার্থীদের জন্য অনেকাংশে অনানুষ্ঠানিক আদালত হয়ে উঠেছে। যেখানে অভিযোগ ওঠে, রায় হয় এবং শাস্তিও কার্যকর হয় খুব দ্রুত। এই চাপ সামাল দিতে না পেরে অনেক প্রার্থী উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে ফেলছেন।
জনমত নাকি অনলাইন প্রতিক্রিয়া
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা বেশি সক্রিয় তারা প্রকৃত জনমত তুলে ধরেন কি না, এ প্রশ্ন দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের মতো দেশে এখনো বড় একটি জনগোষ্ঠী অনলাইনে সীমিতভাবে সক্রিয়। কিন্তু তবুও প্রার্থীদের সিদ্ধান্তে অনলাইন প্রতিক্রিয়ার প্রভাব বাড়ছে। কারণ অনলাইন প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সংসদ সদস্য প্রার্থী বাংলানিউজকে বলেছেন, ফেসবুকসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখলে মনে হয় সবাই আমার বিপক্ষে। মাঠের চিত্র ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু এই চাপ এড়ানো যায় না। পুরো বিষয়টি একজন প্রার্থীকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে ফেলে দেয়। ফলে অনেক সময় আত্মনিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। এ বিষয়গুলো অনেক সময় স্বতঃস্ফূর্ত রাজনীতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এডিট করা ভিডিও, এআই ছবি ও ভোটের মনস্তত্ত্ব
নির্বাচনী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও ভুয়া খবরের বিস্তার নতুন নয়। তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এর গতি ও ব্যাপ্তি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে একটি এডিট করা ভিডিও বা বিভ্রান্তিকর পোস্ট মুহূর্তের মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে নির্বাচনী রাজনীতিতে। প্রচারণার মাঠ এখন আর শুধু জনসভা, লিফলেট বা পোস্টারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ামক। প্রার্থীদের বক্তব্য, আচরণ ও প্রচারণা কৌশল অনেকাংশে নির্ধারিত হচ্ছে অনলাইন প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে।
এই বাস্তবতায় বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কনটেন্টের ব্যবহারও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব কনটেন্ট ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া বা বিকৃত তথ্য ছড়িয়ে প্রার্থীদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফল হিসেবে প্রার্থীরা নীতিগত আলোচনা বা রাজনৈতিক এজেন্ডার বদলে অনেক সময় আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। ভুয়া অভিযোগের আশঙ্কায় আগাম সতর্কতা হিসেবে কিছু বিষয় এড়িয়ে চলছেন তারা। বিশ্লেষকদের মতে, এতে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জায়গা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।
ফ্যাক্ট চেকার মেহেদী হাসান আকাশ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো এডিট করা ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে পরিকল্পিত প্রচারণা। একটি সাধারণ নির্বাচনী প্রচারণার ছবি-ভিডিওতে কৃত্রিমভাবে ভয়েসওভার যুক্ত করে সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা দেওয়া হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছে।
বাংলানিউজকে তিনি বলেন, সম্প্রতি বিএনপির বিরুদ্ধে ছড়ানো একটি ছবি যাচাই করে দেখা গেছে, সেটি সম্পূর্ণ এআই-জেনারেটেড। আলাদা ছবি ও একটি নির্দিষ্ট হোটেলের দৃশ্য ব্যবহার করে সেটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়। আমরা এমন কনটেন্ট দেখেছি, যেখানে একটি সাধারণ নির্বাচনী প্রচারণার ভিডিওতে পরে ভয়েসওভার যোগ করে বলা হচ্ছে ‘চাঁদাবাজ, চাঁদাবাজ’। বাস্তবে ওই ভিডিওতে এমন কোনো স্লোগান বা বক্তব্যই ছিল না। কিন্তু ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেন ঘটনাটি সত্যি।
এ ধরনের কনটেন্ট জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির জন্য পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে। এ ধরনের ক্যাম্পেইন শুধু বিএনপি নয় জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই করা হচ্ছে। ফলে বিষয়গুলো মিডিয়া লিটারেসিতে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। ভোটারদের মনোভাব ও সিদ্ধান্তে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
নির্বাচনী মিস-ইনফরমেশন ও ডিস-ইনফরমেশন
এবারের নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ছড়াচ্ছে উক্তিভিত্তিক ফটো কার্ড ও এডিট করা ছবি। কোনো নেতার বক্তব্যের সঙ্গে ভুয়া উদ্ধৃতি জুড়ে দিয়ে সেগুলো পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভিডিওভিত্তিক বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের ব্যবহারও বাড়ছে, যদিও পরিসরের দিক থেকে তা এখনো তুলনামূলকভাবে কম।
ফ্যাক্ট চেকার মেহেদী হাসান আকাশ সতর্ক করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির ফলে পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। এক-দেড় বছর আগেও এআই জেনারেটেড ছবিতে স্পষ্ট বিকৃতি থাকত, যা সহজেই ধরা যেত। এখন প্রযুক্তি এত উন্নত যে খালি চোখে সেগুলো শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের তদন্ত ছাড়া সত্য-মিথ্যা আলাদা করা যাচ্ছে না।
যে কারণে নির্বাচনকালীন স্বচ্ছ নীতিমালা ও ডিজিটাল আচরণবিধির বিষয়ে গুরুত্ব দিতে পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। একই সঙ্গে অ্যালগরিদমের চাপ না নিয়ে দায়িত্বশীল রাজনীতি করতে প্রার্থীদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির কথা বলছেন। কেননা, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় নির্বাচনকালীন ডিজিটাল আচরণবিধি, সংগঠিত ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থা এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।
এক্সে জামায়াত আমিরের বক্তব্য ও ভুল স্বীকার
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়ার চাপ যে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও পিছু ছাড়ছে না, তার উদাহরণ সম্প্রতি এক্সের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের পোস্ট। গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) বিকেলে প্রকাশিত ওই পোস্টে লেখা ছিল, 'আমরা বিশ্বাস করি, আধুনিকতার নামে যখন নারীদের ঘরের বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়, তখন তারা শোষণ, নৈতিক অবক্ষয় ও নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়ে। এটা আসলে পতিতাবৃত্তিরই আরেক রূপ।' ওই পোস্টকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছিল। অন্যদিকে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা সহজ নয়। যদি কেউ হ্যাক করেই ফেলে, তবে তা ফেরানোর জন্য যথেষ্ট সময় দরকার। তাছাড়া অ্যাকাউন্ট ফিরিয়ে আনতে যে কনভারসেশন হতে হয় বা মেইলের নির্দেশনা ফলো করতে হয়, সেগুলোর কোনো প্রমাণ জামায়াত দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি অনলাইন প্রতিক্রিয়ার সরাসরি ফল। একসময় এমন বক্তব্য হয়তো সীমিত পরিসরে আলোচিত হতো, কিন্তু এখন মুহূর্তেই তা হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে দলীয় নেতৃত্বকে অবস্থান স্পষ্ট করতে বাধ্য করছে।
তারেক রহমানের ছবি ও অর্থ বিতরণের অভিযোগ
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ছবি- যেখানে তারেক রহমানের পায়ের কাছে রাকিব নামের একজনকে বসে থাকতে দেখা যায়, নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। ছবিটি সত্য না বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন- তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফ্যাক্ট চেকাররা জানান, ছবির প্রেক্ষাপট ও উপস্থাপনা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে বিভিন্ন প্রার্থীর অর্থ বিতরণের ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও প্রকৃত ঘটনা, কোথাও আবার পুরোনো বা ভিন্ন ঘটনার ছবি নতুন করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। এসব ক্ষেত্রে ইসি বলছে, প্রমাণসহ অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ভিডিও ভাইরাল হলেই সেটি সত্য ধরে নেওয়া যায় না। যাচাই জরুরি।’
জাইমা রহমানের ভুয়া ভিডিও
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘জাইমা রহমান’ নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমানের মেয়ে জাইমা রহমানের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, নিজের জন্মদিন উপলক্ষে সবাইকে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলে কমেন্টে বিকাশ নম্বর দিতে অনুরোধ করছেন তিনি। ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব যাচাই করে জানায়, ভিডিওটি বাস্তব নয়। জাইমা রহমানের পুরোনো ছবি ব্যবহার করে এআইয়ের মাধ্যমে এটি তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেজটি খোলা হয় গত ২৩ ডিসেম্বর।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, জাইমার রাজনৈতিক পরিচিতিকে ব্যবহার করে প্রতারক চক্র এই অপকর্ম করেছে। তারা বলছেন, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নামে এআই ভিডিও দিয়ে যদি সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা যায়, তাহলে জাতীয় নির্বাচনে এমন কনটেন্ট ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে- যা নিয়ে খোদ নির্বাচন কমিশনও উদ্বিগ্ন।
এআই অপপ্রচারের বিস্তার
নির্বাচন ঘিরে নেটদুনিয়ায় ইতোমধ্যেই নানা অপপ্রচারে ছেয়ে গেছে। এআই দিয়ে তৈরি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে নির্দিষ্ট দলের পক্ষে ভোট চাওয়ানো হচ্ছে। নারী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু চরিত্র তৈরি করে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে প্রচারিত অপতথ্যের প্রতি দশটির একটি ছিল এআই-নির্মিত। অর্থাৎ অপতথ্যে এআইয়ের ব্যবহার ক্রমেই নিয়মিত কৌশলে পরিণত হচ্ছে। ডিসমিসল্যাবের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, এটিএন নিউজ ও নিউজ ২৪-এর পুরোনো সংবাদ বুলেটিন থেকে সংবাদ পাঠকদের ভিডিও কেটে নিয়ে তাতে ভুয়া অডিও জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অডিওর সঙ্গে ঠোঁটের নড়াচড়া বা দেহভঙ্গির কোনো মিল নেই। প্রথমে এসব ভিডিও একটি স্যাটায়ার পেজে প্রকাশ পেলেও পরে সেগুলো সত্য দাবি করে ব্যক্তিগত প্রোফাইল ও পেজ থেকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে অনেক ব্যবহারকারী এগুলোকে প্রকৃত সংবাদ ভেবে শেয়ার করেছেন।
এআই ভিডিও দিয়ে ভোট চাওয়ার নতুন কৌশল
নির্বাচনী প্রচারণায় এআই ব্যবহারের আরেকটি উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো অবিকল মানুষের চেহারা ও কণ্ঠে তৈরি এআই চরিত্র দিয়ে ভোট চাওয়ানো। ডিসমিসল্যাব জানায়, গত মাসের ৮ তারিখে তারেক রহমানের স্ত্রী জোবাইদা রহমানের নামে আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়ে ভোট চাওয়ার একটি এআই ভিডিও শনাক্ত করা হয়।
এ ছাড়া ‘উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন’ নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে অন্তত ৩৫টি এআই ভিডিও ছড়ানো হয়েছে। এসব ভিডিওতে বিভিন্ন বয়স, পেশা ও ধর্মের মানুষ হিসেবে উপস্থাপিত চরিত্ররা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে এবং প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে নেতিবাচক বক্তব্য দিচ্ছে।
ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচন ঘিরে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সামাজিক মাধ্যমে ৩০৯টি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। এক বছরে রাজনীতি বিষয়ক অপতথ্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮১টি, যা অন্যান্য ক্যাটাগরির তুলনায় সর্বোচ্চ। তবে গত জানুয়ারি মাসেই ৫৭৭টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ৪৬৯টি রাজনৈতিক, যা মোটের প্রায় ৮১ শতাংশ। ফেসবুকেই ছড়িয়েছে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য (৫২৯টি)। নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপতথ্য ছিল ২৭১টি। জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপিকে ঘিরে সমানসংখ্যক (২৩৮টি করে) অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। এআই-নির্মিত কনটেন্ট ছিল ১৪১টি, যার মধ্যে ১১টি ডিপফেক। গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড ছড়ানোর ঘটনাও বেড়েছে।
অপতথ্যে বিভাজনের শঙ্কায় শিক্ষার্থীরা
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া জরিপ ছড়ানোর প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে তৈরি এসব মনগড়া জরিপ ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে এবং নির্বাচনী পরিবেশে বিভাজনের ঝুঁকি তৈরি করছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা ও তথ্য যাচাইকারীরা।
গত বছরের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার বরাত দিয়ে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর জনপ্রিয়তা সংক্রান্ত একটি কথিত ‘গোপন জরিপ’ ছড়ানো হয়। এতে দাবি করা হয়, ৭ কোটি মানুষ জরিপে অংশ নিয়েছে। তবে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে জানায়, আল-জাজিরা এমন কোনো জরিপ পরিচালনা করেনি।
রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচনকেন্দ্রিক ভুয়া জরিপ নিয়ে অন্তত ১৮টি ফ্যাক্টচেক প্রকাশিত হয়েছে, যার বেশিরভাগই ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে। এসব ভুয়া জরিপে আল-জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স, ভিওএসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নাম বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি জাতিসংঘ ও অস্তিত্বহীন সংস্থার নামও জড়ানো হয়েছে।
এদিকে রিউমর স্ক্যানারের সীমিত জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ৪৭ শতাংশ মনে করেন, নির্বাচনী অপতথ্য বিভাজন ও সহিংসতা উস্কে দিতে পারে। প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী অপতথ্য মোকাবিলায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভুয়া জরিপের এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গুরুতর হুমকি।
উদ্বিগ্ন ইসি, কিন্তু উদ্যোগ কতটা কার্যকর?
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন এআই অপপ্রচার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে অপপ্রচার মোকাবিলা করাই বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বাস্তবে ইসির কার্যক্রম এখনো সীমিত পর্যবেক্ষণ ও একটি মনিটরিং সেল গঠনের মধ্যেই আটকে আছে। এখন পর্যন্ত অনলাইনে অপপ্রচার নিয়ে কাউকে দৃশ্যমানভাবে শাস্তি বা সতর্ক করার নজির পাওয়া যায়নি। এদিকে, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি মিস-ইনফরমেশন প্রতিরোধ সেল চালু হয়েছে এবং বিভিন্ন সংস্থা সমন্বয় করে কাজ করছে, তবু বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ এখনো প্রতিক্রিয়াশীল, প্রতিরোধমূলক নয়।
তবে, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করা নিষিদ্ধ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রায় ৮ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং তাদের শতকরা ৭০ জনই সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয়। একই সঙ্গে তারা ডিজিটাল জগতে তথ্য যাচাই করতে অভ্যস্ত নয়। প্রচলিত সামাজিক মাধ্যমের খবর পরীক্ষা না করেই বিশ্বাস করে মানুষ। ফলে বিভ্রান্তিকর তথ্য দ্রুত ছড়ানোর সুযোগ বেশি। একটি মাত্র মিথ্যা ভিডিও কোটি মানুষকে অনায়াসে প্রভাবিত করতে পারে। তাদের মতে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নারীদের জন্য দ্বিমুখী বাস্তবতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নারীদের জন্য একদিকে সুযোগ তৈরি করলেও অন্যদিকে চ্যালেঞ্জও বাড়াচ্ছে। নারী প্রার্থীরা তুলনামূলক কম খরচে ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন, তবে একই সঙ্গে তারা অনলাইন হয়রানি, কটূক্তি ও লিঙ্গবিদ্বেষী আক্রমণের শিকার হচ্ছেন বেশি।
নারীপক্ষের সদস্য জাহানারা খাতুন বলেন, এই অনলাইন সহিংসতা অনেক নারী প্রার্থীকে আত্মসংযমী হতে বাধ্য করছে, এমনকি কেউ কেউ সক্রিয় অনলাইন উপস্থিতি থেকে সরে যাচ্ছেন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন ধরনের প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করছে।
ইনোভেশন ফর ওয়েলবিইং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মনোবিশেষজ্ঞ মনিরা রহমান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের ব্যাপারে যেসব অবমাননাকর বা দমনমূলক বক্তব্য ভাইরাল হচ্ছে সেগুলো শুধু রাজনৈতিক শালীনতাই নয়, গণতান্ত্রিক চর্চাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই প্রবণতা রোধে দলীয় পর্যায়ে সচেতনতা, ডিজিটাল আচরণবিধি এবং সংগঠিত ফ্যাক্ট-চেকিং ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
নারী অধিকার ও গভর্নেন্স বিষয়ক বিশ্লেষক ড. লিপিকা বিশ্বাস বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব বর্তমান নির্বাচনী বাস্তবতায় এড়ানোর সুযোগ নেই। ডিজিটাল যুগে নির্বাচন মানেই সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে নানা ভিডিও, বক্তব্য ও ঘটনা ভাইরাল হবে। তবে বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে তখনই, যখন মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো হয়। ভাইরাল হওয়া বিষয়গুলো সব সময় সত্য নয়। অপতথ্য একদিকে যেমন ভোটারদের বিভ্রান্ত করছে, তেমনি প্রার্থীদের ওপরও অযৌক্তিক মানসিক চাপ তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভুয়া বা বিকৃত তথ্য ছড়িয়ে ভোটব্যাংক প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। দলগুলোর উচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং যেসব তথ্য মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর, সেগুলো দ্রুত ফ্যাক্ট-চেক করে বের করা। একই সঙ্গে এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণমূলক সংগঠন আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। একজন ভোটার হিসেবে কে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে, কোন স্বার্থে এসব ছড়ানো হচ্ছে, সেটা বোঝার চেষ্টা করাও দায়িত্ব। যাচাই না করে কোনো কিছু শেয়ার করা হলে সেটিও অপতথ্য ছড়ানোর অংশ হয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিভ্রান্তিকর কনটেন্টগুলো শুধু ভোটারদের ভুল পথে পরিচালিত করছে না, নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকেও অসম ও অস্বচ্ছ করে তুলছে। রাজনৈতিক বক্তব্যের বদলে মিথ্যা তথ্য ও অপপ্রচারের ওপর ভর করে জনমত গঠনের চেষ্টা নির্বাচনী নৈতিকতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু প্রার্থী বা রাজনৈতিক দলের নয়। নির্বাচনী প্রচারণার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো এখন জরুরি। সোশ্যাল মিডিয়ায় কী ধরনের কনটেন্ট বিভ্রান্তিকর হতে পারে এবং সেগুলো কীভাবে যাচাই করা যায়, সে বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা ও উদ্যোগ প্রয়োজন। এবারের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তবে সচেতনতা ও জবাবদিহি না থাকলে এই হাতিয়ারই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।