ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে আসছে মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায় নেবার সময়। ক্রাইসিস গ্রুপ মনে করছে, ভোটের ফল নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে, তা সামাল দেওয়া হবে এ সরকারের জন্য ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’।
নির্বাচন সামনে রেখে এক বিশ্লেষণী নিবন্ধে শেখ হাসিনার পতন থেকে শুরু করে গত দেড় বছরে বাংলাদেশে সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছেন ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র কনসালট্যান্ট টোমাস কিন।
তার পর্যবেক্ষণ বলছে, নির্বাচন হবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। লড়াই হবে মূলত দুটি জোটের মধ্যে—একটি বিএনপির নেতৃত্বে, অন্যটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে। তবে দুই পক্ষের সামনেই বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
টোমাস কিন লিখেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক। সেই তুলনায় অগ্রগতি কম। কিছু সংস্কার উদ্যোগ মাঝপথেই থেমে গেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রয়ে গেছে সেই তিমিরেই।
নিবন্ধে তিনি বলেছেন, নতুন সরকারকে একগুচ্ছ জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি আসতে পারে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা থেকে। আর নতুন সরকারকে রাজনৈতিক সমঝোতার জটিল প্রশ্নও মোকাবেলা করতে হবে।
কি ঘটছে?
টোমাস কিন লিখেছেন, এবারের ভোট হবে কোটি কোটি মানুষের জন্য ‘জীবনের প্রথম বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে’ অংশ নেওয়ার সুযোগ। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার অধীনে তিনটি নির্বাচনই ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ ছিল। সে সময় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ভালো ছিল বলে গণতান্ত্রিক ঘাটতি অনেকের চোখে ততটা গুরুত্ব পায়নি।
“তবে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়ার সময় থেকে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ে। তখন নাগরিকরা অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদ ও বাড়তে থাকা দুর্নীতির পারস্পরিক সম্পর্ক স্পষ্টভাবে দেখতে শুরু করেন। তার শাসনের বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষই শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তার পতনের ভিত্তি তৈরি করে।”
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সরকারপতনের অভ্যুত্থানে পরিণত হওয়া গণ জাগরণ, হাসিনা সরকারের দমন-পীড়ন, আনুমানিক ১৪০০ মানুষের মৃত্যু, সেনাবাহিনীর ভূমিকা, নিরুপায় শেখ হাসিনার ভারতে পলায়ন এবং নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ গ্রহণের ঘটনাপ্রবাহ লেখায় তুলে ধরেছেন টোমাস কিন।
তিনি লিখেছেন, “সরকার ২০০৯ সালে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে, যাতে শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিচার করা যায়। পাশাপাশি সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা ও বিচার বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের লক্ষ্যে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়।
“এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে এক অনুষ্ঠানে দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ‘জুলাই সনদে’ সই করে—যার নামকরণ হয়েছে সেই জুলাই মাসের স্মরণে, যখন শেখ হাসিনাবিরোধী অভ্যুত্থান শুরু হয়। এই সনদে পরবর্তী সরকারের জন্য একটি সংস্কার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।”
নিবন্ধে বলা হয়, “সমালোচকরা অবশ্য অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপরায়ণ হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে এবং কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি অতিরিক্ত সহনশীলতা দেখিয়েছে।
“তবুও আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে হলেও বিভিন্ন দলের মধ্যে একটি ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে সরকার সক্ষম হয়েছে, যার ফল জুলাই সনদ। এখন তাদের শেষ কাজ হবে বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করে ক্ষমতা একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে হস্তান্তর করা।”
শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা
২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন স্থগিত করা এবং নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়গুলোও নিবন্ধে এসেছে।
টোমাস কিন লিখেছেন, এ নির্বাচনে বাংলাদেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত। এর ফলে কার্যত দলটির লাখো সমর্থক ‘ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত’ হচ্ছেন। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে বহু আওয়ামী লীগ সমর্থককে আটক করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
“তবে নির্বাচন হবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। মূলত দুটি জোটের লড়াই—একটি বিএনপির নেতৃত্বে, অন্যটি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে।”
নিবন্ধে বলা হয়, বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে দেশের অন্যতম বড় দল এবং আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা দলটির বিস্তৃত সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ও জনসমর্থন রয়েছে।
“কিন্তু গত এক বছরে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের চাঁদাবাজি ও অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে দলটির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও অনেকের মধ্যে এই ধারণা জোরালো করেছে যে বিএনপি ক্ষমতা ও অর্থের রাজনীতিতেই আটকে আছে। তাদের চোখে আওয়ামী লীগের থেকে খুব একটা আলাদা নয় বিএনপি।”
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে তারেক রহমানের ফেরার দিনের বিপুল জনসমাগম এবং ৩০ ডিসেম্বর তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তার জানাজায় লাখো মানুষের জমায়েতের কথাও নিবন্ধে এসেছে।
টোমাস কিন লিখেছেন, “এসব ঘটনা ভোটে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিত নয়। তারেক রহমান এখনো মায়ের মত জনসমর্থন গড়ে তুলতে পারেননি, আর বিএনপির সর্বশেষ শাসনামলে তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগও সমালোচকদের মুখে রয়েছে।
“দীর্ঘদিন বিদেশ থেকে দল পরিচালনার পর দেশের বাস্তব রাজনীতিতে তিনি কতটা সফল হবেন, তা এখনো পরীক্ষিত নয়। বিএনপির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে তিনি দলকে কতটা ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন এবং তরুণ ভোটারদের কতটা আকৃষ্ট করতে পারেন তার ওপর।”
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী যে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থি দল, সে কথা তুলে ধরে নিবন্ধে বলা হয়েছে, “শেখ হাসিনার আমলে দমন–পীড়নের শিকার হওয়া দলটি ২০২৪ সালের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় লাভবানদের একটি। আন্দোলনে তাদের ছাত্র সংগঠনের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
“দলের আমির শফিকুর রহমান শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলটির প্রচারণাও তুলনাহীন।”
টোমাস কিন লিখেছেন, “যদিও শেখ হাসিনা–পরবর্তী সময়ে ইসলামপন্থার উত্থান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে, জামায়াতের প্রতি সমর্থন অনেক ক্ষেত্রে মতাদর্শের কারণে নয়, বরং প্রচলিত রাজনীতির বিকল্প হিসেবে আসছে।
“অনেক তরুণ ১৯৭১ সালে দলটির বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে ততটা উদ্বিগ্ন নন। সামাজিক কল্যাণে জোর, শৃঙ্খলা ও তুলনামূলক সততার ভাবমূর্তি দলটিকে তাদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে ঢাকাসহ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতপন্থি ছাত্র সংগঠনের সাফল্য আগে অকল্পনীয় ছিল।”
অভ্যুত্থানের ছাত্রনেতাদের দল এনসিপির সঙ্গে জোট করে জামায়াত ‘আরও শক্তিশালী হয়েছে’ বলেই টোমাস কিন মনে করছেন।
তিনি লিখেছেন, “শিক্ষার্থীদের গড়া এই দলটি একক শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে ব্যর্থ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বড় দলের সঙ্গে জোটে যায়। আসন ভাগাভাগিতে জামায়াত বিএনপির চেয়ে বেশি ছাড় দেওয়ায় জোটটি গড়ে ওঠে, যদিও এতে এনসিপির ভেতরে বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং অনেক নেতা দল ছাড়েন।”
সংস্কার কতটা হল?
নিবন্ধে বলা হয়, শেখ হাসিনার শাসনামলে টালমাটাল হয়ে পড়া অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের পথে সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ‘একটি নাজুক সমঝোতা’ বজায় রাখাকে বড় অর্জন হিসেবে দেখাতে পারেন মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার সহকর্মীরা।
“সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য হল ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়নের তদারকি। সব রাজনৈতিক দলই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তায় একমত ছিল, তবে কী ধরনের সংস্কার হবে বা কোনটি আগে বাস্তবায়ন হবে—এ নিয়ে ঐকমত্য ছিল না।
“তবুও ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী সব দলের সমর্থন আদায় করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এসব সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর। ইউনূস ও তার মন্ত্রিসভা সেই সমর্থন আদায় করতে পেরেছে, যদিও কিছু শর্ত ও আপত্তি রয়ে গেছে।”
শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ ২৫টি দল জুলাই সনদে সই করে। পাঁচটি দল জুলাই সনদে সই করেনি, যার মধ্যে এনসিপিও আছে।
সংস্কারের কিছু বিষয় নিয়ে বিভিন্ন দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’, বাস্তবায়নের জটিলতা কাটাতে সরকারের গণভোটের আয়োজনের কথাও নিবন্ধে বলা হয়েছে।
টোমাস কিন লিখেছেন, “একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল গণভোটের প্রশ্ন এমনভাবে তৈরি করা, যাতে ভোটে সাফল্য এলে বিএনপির আপত্তি সত্ত্বেও নতুন উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব চালু হয়। এতে নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকা দলকে উচ্চকক্ষে সংশোধনী পাস করাতে অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের পর শেখ হাসিনা যেভাবে কারো মতামত ছাড়াই সংবিধান পরিবর্তন করেছিলেন, সেরকম পরিস্থিতির বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ হিসেবে এ ব্যবস্থা।
“এই পরিবর্তনগুলোতে বাধ্য হওয়ায় বিএনপি অসন্তুষ্ট হলেও তারা ‘হ্যাঁ’ ভোট সমর্থনের কথা জানিয়েছে; দলটি ‘সংস্কারবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিতে হতে চায় না।”
‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের জোরালো প্রচারের কথা তুলে ধরে নিবন্ধে বলা হয়েছে, “গণভোট ব্যর্থ হলেও বিজয়ী দল সনদের যেসব অংশ সমর্থন করেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে চাপ অনুভব করবে। বিএনপির নিজস্ব ৩১ দফা সংস্কার পরিকল্পনাতেও সনদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, ফলে যে কোনো অবস্থায়ই কিছু সাংবিধানিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা আছে।
“তবু অনেক পর্যবেক্ষক সন্দিহান—এই সংস্কারগুলো আদৌ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে কি না, কারণ অতীতে ক্ষমতায় যাওয়ার পর দলগুলো বড় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসার নজির রেখেছে।”
নিবন্ধে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার নিজেও কিছু সংস্কারের চেষ্টা করেছে, তবে সাফল্য ছিল খণ্ডিত। অন্য অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি কম।
“আইনশৃঙ্খলা খাত আগের মতই রয়ে গেছে। শেখ হাসিনার সময় দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত ও বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ থাকা পুলিশ বাহিনী এখনো জনআস্থা ফেরাতে পারেনি।
“এর দুর্বল অবস্থানের ফলে গণপিটুনির মত সহিংসতার প্রবণতা বেড়েছে; অপরাধীদের খুব কমই বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। র্যাব ও ডিজিএফআইয়ের মত সংস্থার কাঠামোগত সংস্কারেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে; তারা বরং কর্মকর্তাদের বিচারের দিকেই মনোযোগ দিয়েছে।”
টোমাস কিন লিখেছেন, “কিছু সংস্কার উদ্যোগ মাঝপথেই থেমে গেছে। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন রক্ষণশীল ইসলামপন্থি গোষ্ঠীর সমালোচনার মুখে পড়ে, আর তাদের সুপারিশগুলোর খুব কমই বাস্তবায়িত হয়েছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধানও অভিযোগ করেছেন, তার দেওয়া শতাধিক সুপারিশের একটিও সরকার কার্যকর করেনি।
“এই ব্যর্থতা সরকার একসঙ্গে এত বিষয় সামলাতে না পারার ফল, নাকি জনমত বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ ভাঙার দৃঢ়তা না থাকার কারণে—তা স্পষ্ট নয়। তবে ক্রমেই বেশি সংখ্যক বাংলাদেশির ধারণা হচ্ছে, সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার তার উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।”
নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে তো?
নির্বাচনের আগে ও ভোটের দিন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন থাকবে, তাকেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছে ক্রাইসিস গ্রুপ।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে। আর মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ২০২৪ সালের অগাস্টের পর থেকেই সহিংসতার ঘটনা বাড়তে শুরু করেছে।
“ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে, আর তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে এ ধরনের সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।”
টোমাস কিন লিখেছেন, “আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটিগুলোতে পরিস্থিতি বিশেষভাবে স্পর্শকাতর। দলটি নিষিদ্ধ থাকায়, অনেক এলাকায় তাদের সমর্থকেরা প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রচারে বাধা দিতে পারেন।
“বিএনপির ভেতরের দ্বন্দ্বও আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয়। স্থানীয় চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সুবিধার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দলটির বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সংঘাত দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি মানবাধিকার সংগঠনের মতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতার প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল।”
গত ডিসেম্বরে শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড যে নির্বাচনী উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, সে কথা তুলে ধরে নিবন্ধে বলা হয়েছে, অনেক বাংলাদেশি মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে আওয়ামী লীগের সদস্যরা জড়িত।
“হাদীর মৃত্যুর খবর দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং সহিংস প্রতিবাদ শুরু হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের ভারতে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে অনেকেই ভারতকে দায়ী করায়, বিক্ষুব্ধ জনতা ভারতপন্থি তকমা দিয়ে কিছু গণমাধ্যমে হামলা চালায় এবং বিভিন্ন শহরে ভারতের মিশন ঘিরে বিক্ষোভ করে।
“হাদী হত্যার দায় যেই বহন করুক না কেন, এ ঘটনা দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে এবং বহু রাজনীতিবিদকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। ডিসেম্বরের শুরুতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে অন্তত ১৬ জন রাজনীতিবিদ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই বিএনপির।”
টোমাস কিনের বিশ্লেষণ বলছে, “ভোটে অংশগ্রহণকারীদের লক্ষ্য করে আরও সহিংসতার আশঙ্কা রয়েছে, পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সমর্থক কিংবা হিন্দু সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধেও প্রতিশোধমূলক হামলার ঝুঁকি রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পুলিশের দুর্বলতা এবং বাড়তে থাকা মবের ঘটনা।”
তিনি লিখেছেন, “নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে যদি বড় ধরনের বিরোধ দেখা দেয়, তবে তা রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে। গত দেড় বছর ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের টিকে থাকা অনেকটাই নির্ভর করেছে সেনাবাহিনী ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গড়ে ওঠা সমঝোতার ওপর।
“সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্যে পৌঁছাতে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আয়োজনের পথে যেতে ইউনূসকে সব পক্ষের সঙ্গে আপস করতে হয়েছে। তবে ভোটের ফল নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে, সেটি সামাল দেওয়া হবে তার জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
পরবর্তী সরকারের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ কী
নতুন সরকারকে যে একগুচ্ছ ‘জটিল চ্যালেঞ্জ’ মোকাবিলা করতে হবে, সেই বাস্তবতা তুলে ধরে নিবন্ধে বলা হয়, মন্থর অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলার পাশাপাশি পররাষ্ট্র নীতিতেও সরকারকে কঠিন হিসাব-নিকাশ করতে হবে।
“বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়ে ওঠার প্রভাব এবং ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে অচলাবস্থা—এ সব বিষয় সামলাতে হবে।
“পাশাপাশি, শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর হিজবুত তাহরীরের মতো কট্টর ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বাড়তে থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সহিংস চরমপন্থি তৎপরতা নজরদারিতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।”
টোমাস কিন লিখেছেন, “আগামী বছরগুলোতে স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি আসতে পারে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা থেকে। বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক মানুষই ৩০ বছরের কম বয়সী। এদের অনেকেই শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ খুঁজে পান না, যা গভীর হতাশার জন্ম দিচ্ছে।
“কর্মসংস্থানের বাইরেও তরুণেরা চায়—দেশ পরিচালনায় আরও সততা, স্বচ্ছতা এবং উন্নয়নের সুফল যেন আরও বিস্তৃতভাবে বণ্টিত হয়। জুলাই সনদ দিয়ে শুরু হওয়া সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে সামান্য ব্যর্থতাও এই ধারণা জোরালো করতে পারে যে, যেসব রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলো ছিল কেবল মুখের কথা।”
নতুন সরকারকে ‘রাজনৈতিক সমঝোতার জটিল প্রশ্ন’ মোকাবিলা করতে হবে–এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে নিবন্ধে লেখা হয়েছে, দেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের ভূমিকা এবং তার ‘শক্ত ভোটভিত্তির’ কারণে দলটিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা সম্ভব নয়।
“তবে শেখ হাসিনার শাসনামলে, বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দলের ভূমিকার কারণে নতুন নেতৃত্বে হলেও আওয়ামী লীগকে আবার নির্বাচনি অঙ্গনে ফিরতে দেওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। দলটির প্রত্যাবর্তনের শর্ত কী হবে—এ বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি ঐকমত্য তৈরি হলে বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতি তৈরির ঝুঁকি কমতে পারে।
“তবে এর জন্য আওয়ামী লীগের নেতৃত্বকে ২০২৪ সালে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে চালানো সহিংসতার জন্য প্রকৃত অনুশোচনা প্রকাশ করতে হবে—যা শেখ হাসিনা এখন পর্যন্ত করেননি। ভারতসহ যেসব বিদেশি সরকারের প্রভাব রয়েছে, তারা দলটি ও ভবিষ্যৎ সরকারের মধ্যে সংলাপের পথ সুগম করতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।”