রমজান লক্ষ্য করে প্রতি বছর নিত্যপণ্যের দামে চলে লাগামহীন প্রতিযোগিতা। এতে কষ্টে পড়েন নিম্ন বা নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। সেজন্য প্রতি বছর সরকারের তরফ থেকে পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকে। আসন্ন রমজান সামনে রেখে এবারও এর ব্যতিক্রম নেই।
রমজানে বেশি চাহিদা থাকে চিনি, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, ছোলা ও খেজুরের। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, রোজায় চিনির চাহিদা থাকে ৩ লাখ মেট্রিক টন। গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে এলসি খোলা হয়েছে ৩.২৯ লাখ মেট্রিক টন। যেগুলো এরই মধ্যে বাজারে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। জানুয়ারিতে নতুন করে আবার এলসি খোলা শুরু হয়েছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চিনি আমদানি হয়েছিল ৩ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন।
চিনির পরই যে পণ্য বেশি লাগে, সেটা ভোজ্যতেল। দেশের বাজারে সয়াবিন ও পামঅয়েল বেশি ব্যবহার হয়। বছরে গড়ে ২৫ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল লাগে। এর মধ্যে প্রতি বছর রোজায় গড় চাহিদা ৩ লাখ মেট্রিক টন। স্থানীয়ভাবে দেশে রাইসব্রান ও সরিষার তেল উৎপাদন হয় ৫ লাখ মেট্রিক টন, যা প্রয়োজনীয় চাহিদার চেয়ে বেশি।
সাধারণত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার এবং রেস্তোরাঁয় সয়াবিন ও পামঅয়েল বেশি ব্যবহার হয়। গত বছরের (২০২৫ সালে) নভেম্বর-ডিসেম্বরে ১.৪৩ লাখ মেট্রিক টন সয়াবিন তেল আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়। এ ছাড়া ২.৪৯ লাখ মেট্রিক টন পামঅয়েলের জন্য এলসি খোলা হয়। চলতি মাসে দেশের বাজারে সয়াবিন ও পামঅয়েল ঢুকবে ৩ লাখ ৯২ হাজার মেট্রিক টন, যা রমজানের চাহিদার চেয়েও প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন বেশি।
রোজাদারদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় উপাদান খেজুর। রোজায় দেশে খেজুরের চাহিদা থাকে গড়ে ৬০ থেকে ৮০ হাজার মেট্রিক টন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ৫৬ হাজার মেট্রিক টন খেজুর আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়। সে সময় খেজুরের আমদানি শুল্ক ছিল ২৫ শতাংশ। কিন্তু রমজান উপলক্ষে খেজুরের আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। ফলে খেজুরের দাম কমবে।
রমজানে ইফতারি এবং রাতের মুখরোচক খাবার তৈরিতে পেঁয়াজ ছাড়া চলেই না। এতে বর্ধিত চাহিদার কারণে দামও বেড়ে যায়। তবে এবার সুখবর হলো, পেঁয়াজের দেশীয় মৌসুম শুরু হবে ঠিক রোজার সময়। রোজায় দেশে পেঁয়াজের চাহিদা থাকে ৫ লাখ মেট্রিক টন, যা আমাদের স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে পূরণ হয়ে যায়। তারপরও গত বছরের ডিসেম্বরে ৫৬ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে, যা এখন বাজারে প্রবেশ করছে।
রোজায় ইফতারির অন্যতম আইটেম ছোলা। সারা বছর চাহিদা কম থাকলেও রোজায় দেশে ছোলার চাহিদা ১ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন। এরই মধ্যে এক লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন ছোলা আমদানির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া মজুত আছে প্রায় ৫০ লাখ টন। অর্থাৎ বাজারে চাহিদার চেয়েও অতিরিক্ত ছোলা মজুত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে আমদানির তথ্য এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও টিসিবি থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ বছর রোজায় চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত পণ্য রয়েছে। অর্থাৎ রোজায় সংকট হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এদিকে, গতকাল শুক্রবার স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রমজানের ছাপ এখনো বাজারে পড়েনি। রাজধানীর সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারে কয়েকটি দোকানে ঘুরে জানা গেছে, বাজারে পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। খোলা চিনি (সাদা) ৯৫ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্যাকেটজাত চিনির দাম ১০৫ টাকা।
অন্যদিকে, বুটের ডালের বেসন ভালোটা পাওয়া যাচ্ছে ৮০ টাকা কেজিতে। সয়াবিন তেলের দামও স্থিতিশীল রয়েছে। খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৫৮-১৬৫ টাকা এবং বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৭৩ টাকা থেকে ১৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ৯০০-৯৫৫ টাকার আশপাশে রয়েছে।
সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের দোকানি বাহার উদ্দিন কালবেলাকে বলেন, রোজার চাপ এখনো তৈরি হয়নি। নির্বাচন সামনে থাকায় মানুষ রোজার বিষয়ে এবার সিরিয়াস কম বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, মানুষ নির্বাচনমুখী। নির্বাচনের পর বাজারে রোজার চাপ তৈরি হতে পারে।
মালিবাগ কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, পণ্যের দাম প্রায় কাছাকাছি। পণ্যভেদে দামে কিছুটা তারতম্য দেখা গেছে। মালিবাগ বাজারে বাজার করতে এসেছিলেন আলমগীর হোসেন। তিনি কালবেলাকে বলেন, রোজার এখনো অনেকটা বাকি। তাই রোজার পণ্য আরও পরে কিনবেন। তিনি মনে করেন, সামনে আরও দাম কমবে।
রাজধানীর খেজুরের বাজারেও এখন পর্যন্ত রোজার প্রভাব পড়েনি। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের উত্তর গেট সংলগ্ন আজাদ প্রোডাক্টসের গলিতে দেশি-বিদেশি নানান ধরনের ফলের সঙ্গে খেজুর বিক্রি করেন বিক্রেতারা। সেখানে খেজুর বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন কালবেলাকে জানান, মাবরুম, মরিয়ম, সুকারি, আজওয়া, আম্বার, সাফাউই ও মেজুল সবচেয়ে জনপ্রিয় খেজুর। এগুলো বাংলাদেশের ক্রেতাদের বেশি পছন্দ। এর মধ্যে বেশি চলে আজওয়া খেজুর। এগুলো বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। বয়স্ক মানুষ সুকারি খেজুর পছন্দ করেন। দাম কমবেশি ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা। মরিয়ম ও আম্বার খেজুর বিক্রি হয় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকায়। খেজুরের দাম নির্ধারিত হয় আমদানির সময়ের ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ আগের পণ্যের দাম কম, নতুন আমদানি পণ্যের দাম বেশি হয়।
জানা গেছে, রোজায় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে তৎপর রয়েছে টিসিবি। পণ্যের মজুত স্বাভাবিক থাকলেও আরও পণ্য কেনার জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি ৩ হাজার মেট্রিক টন সাদা চিনি কেনার ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া ৫ ফেব্রুয়ারি ৫ হাজার মেট্রিক টন ডাল কেনার টেন্ডার ডকুমেন্ট ওপেন করার তারিখ নির্ধারিত রয়েছে।
আসন্ন রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ে গত রোববার টাস্কফোর্সের সভা হয় মন্ত্রণালয়ে। সভা শেষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন সাংবাদিকদের বলেন, আসন্ন রমজানে কিছু কিছু পণ্যের দাম কমবে। গত বছরের চেয়ে এবার নিত্যপণ্য ৪০ শতাংশ বেশি আমদানি হয়েছে, তাই এবার দাম মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে। ব্যবসায়ীরা আশ্বস্ত করেছেন নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। আসছে রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে থাকবে। দাম বাড়বে না বরং কিছু কিছু পণ্যের দাম আরও কমবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব মো. মাহবুবর রহমান কালবেলাকে বলেন, সরকারের শেষ সময় হলেও রমজানে এর কোনো প্রভাব পড়বে না। রমজানের প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। মজুত আরও বাড়ানোর কাজ চলমান।
তিনি জানান, নির্বাচনের পরও যেন বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে, পণ্যমূল্য স্বাভাবিক থাকে, সে লক্ষ্যে কাজ করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।