আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ছে। এতে প্রাণহানিও বেড়েছে। খুনাখুনির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলোকে আরো দায়িত্বশীল ও তৎপর হতে হবে। ভোটের মাঠে আতঙ্ক দূর করতে হবে। অন্যথায় ভোটাররা উৎসাহ হারাবেন।
সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার বিকেলে নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন অন্তত ১০ জন।
পুলিশ, মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ও আসক এবং হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে প্রতিদিনই একাধিক ব্যক্তি খুন হয়েছেন। বিভিন্ন ডোবা ও অজ্ঞাত স্থান থেকে লাশ উদ্ধার হচ্ছে। রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নির্বাচনী বিরোধের জের ধরে অন্তত ১৩ জন নিহত হন।
পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভোটের মাঠে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক পেশিশক্তির ব্যবহার, প্রতিশোধপরায়ণতা, সমাবেশকেন্দ্রিক সহিংসতা, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ছাড় না দেওয়া, পোস্টার ছেঁড়া ও কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে বেশির ভাগ সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।
জানা গেছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য এবার নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করবেন। ভোটের চার দিন আগে থেকে এই বিশাল বাহিনী মাঠে নামবে। তবে এর আগেই সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, কাউকে নির্বাচনী আইন ভঙ্গ করতে দেওয়া যাবে না। বেআইনি কাজ করলে তাদের নিয়ে আসতে হবে আইনের আওতায়। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আইন-শৃঙ্খলাবিষয়ক মতবিনিময়সভায় নির্বাচনী দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে তিনি এসব কথা বলেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪৫ দিনে সারা দেশে ১৪৪টি নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে ৫৫টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ভীতি প্রদর্শন ও আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১১টি, প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ছয়টি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার দুটি।
এর বাইরে প্রচারকাজে বাধা প্রদানের ঘটনা ১৭টি, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা আটটি, অবরোধ-বিক্ষোভের মতো ঘটনা ১০টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা একটি এবং অন্যান্য ঘটনা ২৪টি।
পুলিশ ও মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বলছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬৫টি পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৫৫৫ জন। গত ২২ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪২টি রাজনৈতিক সহিংসতায় চারজন নিহত হন। আহত হন ৩৫৩ জন। এভাবে চার মাস ধরে নিবাচনী সহিংসতা বাড়ছে। এ সময় সারা দেশে শুধু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অন্তত ১১৩টি ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কমপক্ষে ৯৮১ জন আহত হন।
এইচআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বরে নির্বাচনী সহিংসতায় আহত হন ২৬২ জন, নিহত হন দুজন। এ মাসে শুধু রাজনৈতিক বিরোধ ও সহিংসতায় ১২ জন নিহত ও ৮৭৪ জন আহত হন। এর আগে অক্টোবরে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন ১০ জন, আহত হন পাঁচ হাজার ১২৩ জন।
এভাবে ২০২৫ সালে সারা দেশে নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের ৯১৪টি সহিংস ঘটনায় ১৩৩ জন নিহত হন। এর মধ্যে বিএনপির ৯৩ জন, আওয়ামী লীগের ২৩ জন, জামায়াতের তিনজন, ইনকিলাব মঞ্চের একজন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের একজন রয়েছেন। আহত সাত হাজার ৫১১ জন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী সহিংসতার ৫৪টি ঘটনায় তিনজন নিহত ও ৪৯৪ জন আহত হয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পর ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে দুই শতাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, ‘আমরা ভোট সম্পন্ন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বাংলাদেশের নির্বাচনে কমবেশি সংঘর্ষ হয়ে থাকে। এরপর যদি দু-চারটি ঘটনা ঘটে নির্বাচনের জন্য তা বড় বাধা নয়।
সংঘর্ষ ও মৃত্যু : সর্বশেষ গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে শতাধিক আহত ও শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহত হয়েছেন। এর আগে গত ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সালমান ওমরের সমর্থক মো. নজরুল ইসলাম নিহত হন।
গত ১৮ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি এক সপ্তাহের দীর্ঘ জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের পর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টন-বিজয়নগর এলাকায় সন্ত্রাসীরা দিনদুপুরে তাঁর মাথায় গুলি করলে তিনি গুরুতর আহত হন।
এর আগে গত ৫ নভেম্বর চট্টগ্রামে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে নির্বাচনী গণসংযোগে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে সরওয়ার হোসেন ওরফে বাবলা (৪৩) নামের একজন নিহত হন। এ সময় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ, সরোয়ার ও শান্ত নামের তিনজন গুলিতে আহত হন। ঘটনাস্থলেই সরোয়ারের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনে বিএনপির মনোনয়ন দ্বন্দ্বের জেরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে তানজিন আহমেদ (৩০) নামের এক ছাত্রদল কর্মী মারা যান।
পুলিশ ও বিভিন্ন সূত্র বলছে, সবচেয়ে বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে কুমিল্লা জেলায়। গত ১৯ জানুয়ারি জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার সমেশপুর ও তেলিপুকুর এলাকায় স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর অফিস ও সমর্থকদের বাড়িতে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুভপুর ও মুন্সীরহাট বাজারে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। গত ২০ জানুয়ারি চৌদ্দগ্রাম উপজেলার উজিরপুরে ইউনিয়ন বিএনপি নেতাকর্মীরা জামায়াত নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ান। গত ২২ জানুয়ারি কুমিল্লার হোমনা থানা এলাকার পুরনো বাসস্ট্যান্ড ওভারব্রিজের নিচে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। হামলা ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়ায় উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন।
গত ১৬ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের ওই ইউনিয়নেই জামায়াত-বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আবার সংঘর্ষ হয়। এরপর গত ২২ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের সদর থানার রিফিউজি মার্কেট এলাকায় জামায়াত এবং ছাত্রশিবির কর্মীদের লিফলেট বিতরণকে কেন্দ্র করে বিএনপি কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হয়। এতে উভয় পক্ষের একজন করে আহত হন।
গত ২৫ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জে জামায়াত সমর্থকদের নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি সমর্থকরা বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি বাধে। এতে জামায়াত সমর্থক তারেক ইসলাম আহত হয়ে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পাশাপাশি মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী, পদ্মা সেতু (উত্তর) থানা, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, পটুয়াখালীর বাউফল ও গলাচিপা, ময়মনসিংহের গফরগাঁও ও ভালুকা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের পতেঙ্গা ও বন্দর থানা এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এদিকে গত ১৬ ডিসেম্বর দুপুরের দিকে নেত্রকোনার আটপাড়া থানার পিঁয়াজকান্দি এলাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে রাস্তায় অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতকারীরা খড় দিয়ে অগ্নিসংযোগ করে। পরে পুলিশ সেখান থেকে স্কচটেপ প্যাঁচানো ছয়টি ককটেল সদৃশ্য বস্তু এবং একটি চিরকুট উদ্ধার করে। চিরকুটে লেখা ছিল—‘ইলেকশন নির্মূল কমিটি’। ৪ জানুয়ারি সকাল ৯টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়া থানার মধ্য রাজাপালং এলাকায় কক্সবাজার-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী শাহজাহান চৌধুরীর বাসায় অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতকারীরা ডাকযোগে একটি চিঠিসহ কাফনের কাপড় পাঠায়। চিঠিতে উল্লেখ রয়েছে—‘তিনি যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন তাহলে তাঁকে শরিফ ওসমান হাদির মতো ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।’
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন দলের মনোনয়নকেন্দ্রিক সম্ভাব্য প্রার্থী এবং বঞ্চিত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী দল ও প্রার্থীদের প্রতি প্রতিহিংসার রাজনীতি, সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা বর্জন করে দলীয় ও রাজনৈতিক সহাবস্থানে থাকা উচিত।
পুলিশ ও হাসপাতালসহ সারা দেশে কালের কণ্ঠের নিজস্ব অনুসন্ধানে পাওয়া ভুক্তভোগী পরিবারের তথ্য-উপাত্ত বলছে, সারা দেশে অবৈধ অস্ত্রের ছড়াছড়ি। গত ১৩ মাসে দেশে ১৮৫টি গুলির ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে অন্তত ৮১ জনের বেশি গুলিতে নিহত হন।
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. উমর ফারুক বলেন, বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বলছে, অপরাধ বাড়ার এই ঊর্ধ্বগতি কার্যত পরিসংখ্যান নয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ব্যর্থতারও প্রতিফলন। ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়তে থাকলে মনে করতে হবে, এখানে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা চলছে। সেই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর নিষ্ক্রীয়তা সমাজে এক ধরনের সহিংতার পরিবেশ তৈরি করছে।