ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের বাকি আর মাত্র ১১ দিন। প্রথমে শঙ্কা থাকলেও তপশিল ঘোষণার পরপরই পাল্টে যায় সারা দেশের নির্বাচনী চিত্র। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই লেগেছে প্রচারের রং। টানা গণসংযোগে ব্যস্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। যেন দম ফেলারও ফুরসত নেই তাদের। চলছে রাস্তায় রাস্তায় মাইকিং, পাড়া-মহল্লায় হচ্ছে জনসভা ও উঠান বৈঠক। সব মিলিয়ে দেশজুড়ে এখন সরগরম ভোটের মাঠ। দীর্ঘদিন পর হতে যাওয়া প্রতিযোগিতামূলক এই নির্বাচন সুষ্ঠু করার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এরই মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। আজকালের মধ্যেই বিএনপি এবং আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহার ঘোষণার কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, শঙ্কা ছাপিয়ে সারা দেশে বইছে নির্বাচনী উৎসবের হাওয়া। বিভিন্ন জায়গায় বিচ্ছিন্নভাবে নির্বাচনী সহিংসতার কিছু ঘটনা ঘটলেও মোটাদাগে উৎসবের আমেজেই দেশজুড়ে চলছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার।
শহর থেকে গ্রাম, অলিগলি থেকে রাজপথ—সব জায়গায় এখন প্রধান আলোচনার বিষয় ‘ভোট’। ভোটগ্রহণের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, পাল্লা দিয়ে জমে উঠছে নির্বাচনী প্রচার। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের নির্বাচনী প্রচার-গণসংযোগে দেশের প্রতিটি জনপদ মুখর। বড় রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে স্বতন্ত্র প্রার্থী—সবাই এখন ভোটের মাঠে। জনসভা, গণসংযোগ, প্রচারপত্র বিতরণসহ নানা কর্মসূচিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থী ও সমর্থকরা। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। অবশ্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা সমালোচনামূলক মন্তব্যে জড়িয়েছেন বাকযুদ্ধে। একদিকে ভোট নিয়ে নানামুখী সমালোচনা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে প্রার্থীদের সরব উপস্থিতি—সব মিলিয়ে উৎসবমুখর আবহ বিরাজ করছে। নির্বাচন কমিশন বলছে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। ভোটের মাঠে এক লাখ সেনাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য থাকবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভোটের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের মন জয়ের জন্য নানান প্রতিশ্রুতি সামনে আনছেন। কোথাও উন্নয়ন, কোথাও কর্মসংস্থান, আবার কোথাও সামাজিক সুরক্ষা ইস্যু হয়ে উঠছে প্রচারের মূল সুর। নেতাদের কথার লড়াই যেমন জমে উঠেছে, তেমনি ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল প্রচারযুদ্ধ। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ থেকে শুরু করে শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম সব মাধ্যমেই চলছে প্রচার। চায়ের দোকান, বাসস্ট্যান্ড কিংবা বাজার সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ভোট। কেউ উন্নয়নের হিসাব কষছেন, কেউ আবার পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করছেন। প্রথমবার ভোট দিতে চলা তরুণদের মধ্যেও উৎসাহ চোখে পড়ার মতো। অন্যদিকে, শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে তৎপর প্রশাসন। নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, চলছে নজরদারি। সব মিলিয়ে, ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতির পারদ ক্রমেই চড়ছে, আর সেই উত্তাপেই সরগরম হয়ে উঠেছে জনজীবন।
নির্বাচনী হাওয়া এখন শুধু সভা-সমাবেশে সীমাবদ্ধ নেই। পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, সবখানেই আলোচনার প্রধান বিষয়—কে হচ্ছেন আগামী দিনের জনপ্রতিনিধি? ভোটারদের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি আর বিগত দিনের কাজের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত সাধারণ মানুষ। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পাড়া-মহল্লার চায়ের দোকানগুলো এখন রাজনৈতিক তর্কের কেন্দ্রবিন্দু। ভোটারদের চুলচেরা বিশ্লেষণে উঠে আসছে প্রার্থীদের অতীত আমলনামা ও ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীরা নাওয়া-খাওয়া ভুলে দিনরাত এক করে ছুটছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। সাতসকালে ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময়, দুপুরে উঠান বৈঠক আর বিকেলে জনসভা—এভাবেই কাটছে তাদের ব্যস্ত সময়। অনুসারীদের বহর নিয়ে প্রার্থীরা চষে বেড়াচ্ছেন মাঠ-ঘাট ও দুর্গম জনপদ।
নির্বাচনী ইশতেহার কার কখন: নির্বাচনের আগে দলগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তাদের ইশতেহার ঘোষণা বা ক্ষমতায় গেলে তারা কী করবেন, সে বিষয়ে অঙ্গীকার তুলে ধরা। এরই মধ্যে গতকাল এনসিপি ৩৬ দফা ইশতেহার ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার চূড়ান্ত করেছে, যা দু-এক দিনের মধ্যেই জাতির সামনে ঘোষণা করা হবে। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনায় কেন্দ্রীয় স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য সচিব ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল কালবেলাকে বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহার দু-এক দিনের মধ্যেই ঘোষণা করা হবে বলে জেনেছি। এ নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কাজ করছেন।’
আর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং নির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, তাদের নির্বাচনী ইশতেহার চূড়ান্ত হয়ে গেছে। এখন ছাপানোর কাজ চলছে। তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম যে, ১ ফেব্রুয়ারি ইশতেহার ঘোষণা করব; কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের তৃণমূল সফরে ব্যস্ত থাকায় সেটি হয়তো কিছুটা বিলম্ব হবে। তবে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহের যে কোনোদিন ইশতেহার ঘোষণা করব।’
ডিজিটাল প্রচারণায় নতুন মাত্রা, প্যারোডির জয়জয়কার: এবারের নির্বাচনে প্রথাগত প্রচারণার পাশাপাশি অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডিজিটাল প্রচারণা। কেননা, এবারের নির্বাচনে পোস্টার লাগানো নিষেধ। তাই রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের বেশি মনোযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তারা যেন নেমেছেন ডিজিটাল যুদ্ধে। ডিজিটাল টিম তৈরি করে কনটেন্ট বানাচ্ছেন আর তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সব ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। ফেসবুক পেজ, লাইভ ভিডিও, গ্রাফিক পোস্ট, শর্ট ভিডিও এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তারা ভোটারের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের তরুণ ভোটার ধরতে ডিজিটাল ক্যাম্পেইন করছেন প্রার্থীরা। এভাবে প্রার্থীরা শুধু নিজ নির্বাচনী এলাকার ভোটার নয়, বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সমর্থকদের কাছ থেকেও প্রচারের সুবিধা নিতে পারছেন। আবার অনেকে এসব পোস্টারে এনেছেন নতুনত্ব। ফলে তুলনামূলক কম খরচে স্মার্ট প্রচার চালাতে পারছেন প্রার্থীরা।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচার তেমন চোখে পড়েনি। তবে ২০১৪ সালের একতরফা দশম সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ফেসবুকে ভোটের প্রচার বেড়েছে। ২০১৮ সালে একাদশ ও ২০২৪ সালের দ্বাদশ বিতর্কিত নির্বাচনেও ভোটারকে প্রভাবিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়েছেন প্রার্থীরা। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, হাতে হাতে স্মার্টফোন থাকায় ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে ওঠে প্রার্থীদের। এ ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম (ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব) এখন নির্বাচনী প্রচারের বড় হাতিয়ার। শুধু তাই নয়, নির্বাচনী প্রচারে প্যারোডি গানের জয়জয়কার চলছে। জনপ্রিয় সব আধুনিক ও লোকজ গানের সুরে তৈরি করা হচ্ছে নির্বাচনী প্যারোডি গান। শ্রুতিমধুর সুরে ও প্রার্থীদের গুণগান গেয়ে তৈরি এই গানগুলো ভোটারদের বেশ আকৃষ্ট করছে। প্রার্থীরা তাদের ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ এবং গ্রাফিক্সের মাধ্যমে নিজের মার্কা ও উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরছেন মুহূর্তের মধ্যেই। জনপ্রিয় সব গানের সুরে প্রার্থীর গুণগান আর উন্নয়নের কথা তুলে ধরে তৈরি করা হচ্ছে এসব গান, যা অল্প সময়ের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ছে। তরুণ প্রজন্ম ও প্রবাসী ভোটারদের কাছে পৌঁছতে এই ডিজিটাল কৌশল বেশ কার্যকর হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সংসদ সদস্য প্রার্থী ও তাদের অনুসারীরা পথসভা, মাইকিং, লিফলেট, সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে সংযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা, উঠান বৈঠক, চা-চক্র, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সমর্থন আদায়ে লাগাতার পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।
এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা বদরুল আলম চৌধুরী শিপলু কালবেলাকে বলেন, নির্বাচন মানেই যুদ্ধ এবং কৌশল। এককথায় টিকে থাকার লড়াই। এই যুদ্ধে নানারকম কৌশলে এগোতে হয়। আধুনিক দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো, অনলাইন তথা ডিজিটাল মাধ্যম। স্বাভাবিক কারণেই অতীতের বিবেচনায় এবার আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রায় সব রাজনৈতিক দল ও তাদের মনোনীত প্রার্থীরা ডিজিটাল প্রচারকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন। কেননা, এ মাধ্যমে খুব দ্রুত এবং সহজেই কমবেশি সবার কাছে নিজেকে তুলে ধরা যায়। সে লক্ষ্যে নানা ভঙ্গিমায় প্রার্থী এবং তাদের অনুসারীরা ডিজিটাল প্রচারকে গুরুত্ব দিয়ে এগোচ্ছেন। তিনি মনে করেন, এবারের প্রচারে প্রযুক্তির ব্যবহার অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের টানতে প্রার্থীরা ডিজিটাল মাধ্যমকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
দিনরাত প্রচার কার্যক্রম, নেই দম ফেলার সময়: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে রাজপথ ও অলিগলি। মাইকের আওয়াজ জানান দিচ্ছে ভোটের আগমনী বার্তা। কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে প্রতীকী ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা, শাপলা কলি, কাস্তে, কোদালসহ বিভিন্ন মার্কার সমন্বয়ে সাজানো তোরণ। দিনরাত বিরামহীন এই কার্যক্রম প্রমাণ করে যে, দেশের মানুষ একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। অন্যদিকে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও তাদের অনুসারীরা এখন নাওয়া-খাওয়া ভুলে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে পথসভা, উঠান বৈঠক আর বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণসংযোগ।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এলাকার মানুষের সঙ্গে তিনি নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। বিভিন্ন সভায় মতবিনিময় ও শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। জনগণের সাড়া খুবই ভালো বলে তিনি জানান।
ঠাকুরগাঁও-২ (বালিয়াডাঙ্গী-হরিপুর ও রাণীশংকৈলের একাংশ) আসনে বিএনপির এমপি প্রার্থী ডা. মো. আব্দুস সালাম কালবেলাকে বলেন, তাকে পরিকল্পনামাফিক প্রচার চালাতে হচ্ছে। স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রতিদিন নানা কর্মসূচির মাধ্যমে গণসংযোগ করছেন। তার পক্ষে অন্য নেতাকর্মীরা ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পসহ সেবামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে বিএনপির প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশার পক্ষে দিনরাত গণসংযোগ করছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান ভূঁইয়া মিল্টন। তিনি কালবেলাকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোস্তফা কামাল পাশার পক্ষে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে ডোর টু ডোর গণসংযোগ ও নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছি। প্রার্থী নিজে এবং তার পক্ষে দলীয় নেতাকর্মীরা দিনরাত লাগাতার গণসংযোগ চালানো হচ্ছে।’
মিল্টন ভূঁইয়া নির্বাচনী প্রচারে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের গুরুত্ব, সুবিধা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে কৃষক ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে বাস্তবভিত্তিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। সাধারণ মানুষ ব্যাপক সাড়া দিচ্ছেন বলে তিনি জানান।
ঢাকা-১০ আসনে (ধানমন্ডি-হাজারীবাগ-নিউমার্কেট) ১১ দলীয় জোট মনোনীত জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. জসীম উদ্দীন সরকার বলেন, দেশের মানুষ এখন পরিবর্তনের পক্ষে। কারণ একটি বিশেষ গোষ্ঠীর চাঁদাবাজি, দখলদারত্বসহ তাদের অত্যাচারে জনগণ অতিষ্ঠ। তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে দিন-রাত গণসংযোগ করছেন এবং সাধারণ মানুষ বেশ সমর্থন দিচ্ছেন।
সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান কালবেলাকে বলেন, তিনি নির্বাচনী গণসংযোগে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। এরই মধ্যে নানামুখী আলোচনা সত্ত্বেও নির্বাচন ঘিরে যেন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে।
সর্বাত্মক প্রস্তুতিতে ইসি: নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন মনে করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে এ পর্যন্ত গৃহীত সব কার্যক্রম সঠিক পথেই রয়েছে। কোনো আশঙ্কাই টিকবে না। তিনি বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশ, জাতি এবং বিশ্ব দেখবে যে, বাংলাদেশে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমরা মনে করি, শতভাগ আস্থার সঙ্গে জনগণ এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নিচ্ছে এবং একটা উৎসবমুখর পরিবেশ মাঠে ঘাটে নির্বাচনে প্রচারণা চলছে। এগুলো তো আস্থারই বহিঃপ্রকাশ। ইসির পক্ষ থেকে শতভাগ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ভোটাররা নিরাপদে কেন্দ্রে যাবেন, ভোট দেবেন এবং নিরাপদে তারা বাড়ি ফিরবেন—এই পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে।’
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ বলেছেন, ‘নির্বাচনে প্রশাসন যথাযথভাবে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত রয়েছে। এ কাজে আমরা এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের সংকট দেখছি না। এবার একটি সম্পূর্ণ সুষ্ঠু নির্বাচন হতে যাচ্ছে বলে আমরা আশাবাদী। এর জন্য যা যা করণীয় প্রশাসন তা-ই করবে।’
ভোটের মাঠে থাকবে কড়া নিরাপত্তা: নির্বাচন ঘিরে নাশকতা ঠেকাতে তৎপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নির্বাচন ঘিরে অপতৎপরতা ঠেকাতে অনলাইনেও নজরদারি বাড়িয়েছে পুলিশ। এরই অংশ হিসেবে জামিনে মুক্তি পাওয়া সন্দেহভাজনদের প্রতি কড়া নজর রাখা হয়েছে। জেলা, থানা ও ইউনিয়নে পর্যায়ে অপরাধীদের গতিবিধির ওপর নজরদারি করছে নিরাপত্তা বাহিনী।
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত উগ্রবাদী কার্যক্রমে জড়িতের মামলায় কারাগার থেকে তিন শতাধিক আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তাদের মধ্যে সন্দেহভাজন, বিচারাধীন—এমনকি যাবজ্জীবন সাজা পাওয়া আসামিও রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, নির্বাচন ঘিরে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) জসীম উদ্দিন খান বলেন, ‘আমরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ওপর নজরদারি অব্যাহত রেখেছি। সাইবার পুলিশ কন্ট্রোল, সাইবার পেট্রোলিং ইউনিট ২৪ ঘণ্টা পরিস্থিতি মনিটর করছে। নির্বাচন ঘিরে যে কোনো উসকানি কিংবা অপতৎপরতার তথ্য পাওয়ামাত্র ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারের এ মহোৎসবের সমান্তরালে রাজনৈতিক মহলে রয়েছে নানা সমালোচনা ও শঙ্কা। তবে সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা, সব বাধা কাটিয়ে একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকবে। সাধারণ মানুষের চাওয়া—যিনিই নির্বাচিত হোন না কেনো, তিনি যেন জনকল্যাণে নিবেদিত থাকেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সাহাবুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপিসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল ও জনগণ, সামরিক বাহিনী, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক মহল থেকে শুরু করে প্রত্যেকেই নির্বাচনের জন্য অপেক্ষায় আছে। সুতরাং নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কার কিছু মনে হচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘এখন নির্বাচন হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। প্রচারণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন মানেই গণসংযোগ আর প্রচারণা। মানুষ তথা ভোটারদের কাছে প্রার্থীকে তুলে ধরার কোনো বিকল্প নেই। সে জন্য প্রার্থীরা নানাভাবে নিজেদের জনগণের কাছে উপস্থাপন করছেন। তবে সম্প্রতি
দুই-একটা ঘটনা উদ্বেগ ছড়িয়েছে। বিশেষ করে কোনো ধরনের প্রাণহানি কাম্য নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও সংযতভাবে প্রচারণা চালাতে হবে। সে সঙ্গে শুধু কথার ফুলঝুড়ি নয়, বাস্তবধর্মী ইশতেহার দেওয়াটা বাঞ্ছনীয়।’