Image description

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বাড়ছে সংঘাত-সহিংসতা। ইতোমধ্যে সারা দেশে অন্তত ১১৩টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৫ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা ৯৮১ জন। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে সবশেষ বুধবার শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে প্রতিপক্ষের হামলায় শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন অর্ধশতাধিক। এরপর থেকে জনমনে নির্বাচনি সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মাত্রা আরও বেড়েছে। পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে সারা দেশে ৫৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় আড়াইশ। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সহিংসতা হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। সামনের দিনগুলোতে এই সহিংসতা আরও বাড়তে পারে-এমন আশঙ্কা করে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন পরিস্থিতির যত অবনতি হবে, তৃতীয় পক্ষ তত বেশি সুযোগ নেবে।

বিশেষ করে ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে নির্বাচন বানচাল করতে তার দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। ওই নির্দেশ বাস্তবায়নে ভয়ংকর সব পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামছে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী দুষ্কৃতকারীরা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনের মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতা না থাকলে পরাজিত শক্তি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে-এটাই স্বাভাবিক। নির্বাচনি প্রচারে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহিংসতা বাড়তে থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এসব মোকাবিলায় বেশি ব্যস্ত থাকতে হবে। এতে করে অন্যান্য প্রস্তুতি ব্যাহত হবে। এছাড়া অপর এক প্রশ্নের জবাবে

তিনি বলেন, প্রচারে মাঠে থাকা দলগুলো সংঘাত-সহিংতায় জড়িয়ে পড়লে স্বভাবিকভাবে পরাজিত শক্তি এ সুযোগে তাদের ভয়ংকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ খুঁজবে। এজন্য তিনি অপশক্তির পরিকল্পনা নস্যাৎ করতে পুলিশি তৎপরতার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর যথাযথ সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, ‘সহিংসতা যে বাড়তে পারে সেই আশঙ্কা সবাই কমবেশি করছিলেন। বেশ কয়েক মাস ধরে আমরা বলে এলেও যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল, তা নেওয়া হয়নি। নির্বাচনি সহিংসতার মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থ জড়িত। এছাড়া পরাজিত রাজনৈতিক শক্তিও তাদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, অথচ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুরো সমাজকে এক করা উচিত ছিল। কিন্তু সেটা করা হয়নি। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব তো রয়েছেই। তিনি মনে করেন, সহিংসতার মতো ঘটনা এড়াতে তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সামাজিক কমিটি করা প্রয়োজন ছিল।

যে কমিটিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, মিডিয়াকর্মী, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি রাখা উচিত ছিল। কিন্তু বারবার বলা হলেও এ ধরনের কোনো কমিটি হয়নি।

এক প্রশ্নের জবাবে ড. নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, পরাজিত রাজনৈতিক শক্তি কিন্তু বসে নেই। দেশে অবস্থান করা তাদের নেতাকর্মীদের দিয়ে বিদেশে পলাতক নেতারা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সব চেষ্টা করছেন। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে তারা এ বিষয়ে তত বেশি তৎপর হবে।

মনে রাখতে হবে-সৃষ্ট নির্বাচনি সহিংসতা ওই চক্রের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। তিনি বলেন, কোনো কোনো স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে নিরপেক্ষতা হারিয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি কেবল সহিংসতাকেই উসকে দিচ্ছে না, নির্বাচনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘাত-সহিংসতার সুযোগকে কাজে লাগাতে তৎপর পরাজিত রাজনৈতিক শক্তি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংসতা মোকাবিলায় ব্যস্ত থাকায় ইতোমধ্যে অপশক্তিগুলো নাশকতার নানা পরিকল্পনা নিয়ে তাদের টিম মাঠে নামার অপচেষ্টা করছে। তবে আশার কথা হলো-প্রযুক্তির সহায়তায় এ চক্রের অনেক কিছু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতে সক্ষম হয়েছে। যাদের অনেকে নজরদারির মধ্যে রয়েছে। সূত্রটি জানায়, এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে কাজ করছে। এছাড়া নাশকতাকারীদের মধ্যেও সোর্স সেট করতে সক্ষম হয়েছে। ফলে নাশকতা নিয়ে নানামুখী ষড়যন্ত্র থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জনসাধারণকে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সূত্রমতে, কেবল বিদেশে পলাতক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বা দেশে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই নয়; অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করতে প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা ফ্যাসিবাদের দোসররাও তৎপর। বর্ণচোরা ও সুযোগসন্ধানী এ চক্রের সদস্যদের বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

ঝিনাইগাতীর ঘটনা তুলে ধরে পুলিশের একজন ডিআইজি যুগান্তরকে বলেন, এর দায় থানা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) নিতেই হবে। তিনি কেন এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের পর সবার জন্য বসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করলেন না? অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার অনেক আগেই একটি দলের নেতাকর্মীরা কেন সব চেয়ার দখল করে বসে গেলেন। আর অন্য দলের নেতাকর্মীরা আসার পর কেন চেয়ার পেলেন না? এটি কিন্তু রহস্যজনক। এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে।

যেসব আসনে সহিংসতা : পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার পর অর্ধশতাধিক নির্বাচনি এলাকায় সংঘাত-সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-শেরপুর-৩, চুয়াডাঙ্গা-১, গাইবান্ধা-৫, মানিকগঞ্জ-১, ঢাকা-৩, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৫, যশোর-৫, কুমিল্লা-৯, ভোলা-১, বাগেরহাট-১ (একাধিক সংঘর্ষ), খুলনা-৩, শরীয়তপুর-১, নেত্রকোনা-৩, সিরাজগঞ্জ-১, ভোলা-৩, পটুয়াখালী-৩, ফেনী-৩, চট্টগ্রাম-২, নারায়ণগঞ্জ-৪, লক্ষ্মীপুর-৩, ময়মনসিংহ-১, ৯ ও ১০, বগুড়া-৫, ঠাকুরগাঁও-১, ফেনী-১, বরিশাল-৩, কিশোরগঞ্জ-৪, চট্টগ্রাম-১১, মুন্সীগঞ্জ-৩ (একাধিক সংঘর্ষ), বরিশাল-১, লালমনিরহাট-১, চুয়াডাঙ্গা-১, মাদারীপুর-৩, ভোলা-২, লক্ষ্মীপুর-৩, লালমনিরহাট-২, ভোলা-২, পটুয়াখালী-৩, টাঙ্গাইল-১, খুলনা-২, সিরাজগঞ্জ-২, জামালপুর-৪, শরীয়তপুর-২, নারায়ণগঞ্জ-২, ঝালকাঠি-১ এবং চট্টগ্রাম-১৫।

যারা নিহত : বুধবার শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে শতাধিক আহত ও শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। এর আগে ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সালমান ওমরের সমর্থক মো. নজরুল ইসলাম প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন। তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাটি ছিল সবচেয়ে আলোচিত এবং উদ্বেগের। এক সপ্তাহের জীবন-মৃত্যুর লড়াইয়ের পর গত ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচনি গণসংযোগকালে গত ৫ নভেম্বর চট্টগ্রামে প্রাথমিকভাবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর কর্মী সরওয়ার হোসেন ওরফে বাবলা (৪৩) গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এ সময় প্রার্থী এরশাদ উল্লাহসহ তিনজন গুলিতে আহত হন। এছাড়া গত ৯ নভেম্বর ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনে বিএনপির মনোনয়ন দ্বন্দ্বের জেরে দুপক্ষের সংঘর্ষে তানজিন আহমেদ (৩০) নামে এক ছাত্রদল কর্মী নিহত হন।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনি সহিংসতার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মৌলিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তিনি বলেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংসতা ফ্যাসিবাদী শক্তিকে উসকে দিচ্ছে। কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে সবকিছু মোকাবিলা সম্ভব হবে না। দেশের স্থিতিশীলতার জন্য প্রত্যেককেই যার যার অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিয়ে কয়েকটি জেলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে বিভিন্ন দলের বেশ কয়েকজন নারীকর্মী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচনি প্রচারণা চলাকালীন প্রার্থীদের আক্রমণাত্মক মনোভাব, বিদ্বেষ ছড়ানো, হুমকি-ধমকি, অপপ্রচার, মিথ্যাচার এবং বিরূপ মন্তব্য প্রতিহিংসা ও সহিংসতার জন্ম দিচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।