বাংলাদেশের রেলওয়ে এখনো বহন করে চলেছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার ছাপ। ট্রেন চলাচলের নিয়ম, সিগন্যালিং পদ্ধতি, লাইন ব্যবস্থাপনা, এমনকি প্রশাসনিক কাঠামোর বড় একটি অংশ এখনও চলছে ব্রিটিশ আমলে প্রবর্তিত সিস্টেমের ওপর ভিত্তি করে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশের রেলপথ পুরোপুরি আধুনিক ও সমসাময়িক প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে একদিকে যেমন রেল একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তুলনামূলক সাশ্রয়ী গণপরিবহন হিসেবে টিকে আছে, অন্যদিকে তেমনি দুর্ঘটনা, বিলম্ব, লোকসান ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগও লেগেই রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের রেলওয়ে এক ধরনের সংক্রমণকালীন বাস্তবতায় অবস্থান করছে। যেখানে ব্রিটিশ আমলের কাঠামো আর আধুনিক চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কতদিন এই পুরোনো সিস্টেমে ভর করে চলবে দেশের রেল, আদৌ কি সম্ভব সম্পূর্ণ আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও লাভজনক রেলব্যবস্থা গড়ে তোলা এমন প্রশ্ন তাদের। গেজ বৈচিত্র্য রেলের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ায় এবং অপারেশনাল দক্ষতা কমিয়ে দেয়। রেলওয়ের আরেকটি বড় সমস্যা হলো গেজ বিভাজন। ব্রিটিশ আমলে অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বিবেচনায় বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন গেজের রেললাইন স্থাপন করা হয় কোথাও ব্রডগেজ, কোথাও মিটারগেজ। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডুয়েল গেজ লাইনের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে তবুও পুরো নেটওয়ার্ক একীভূত করা সম্ভব হয়নি। ফলে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সরাসরি ট্রেন চলাচলে এখনও নানা জটিলতা রয়ে গেছে। রেল আধুনিকায়নে বেশ কিছু বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ডাবল লাইন, নতুন কোচ ও ইঞ্জিন সংযোজন, ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বলছেন তারা।
রেলে আধুনিকায়নের নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও মূল নেটওয়ার্ক এখনো ব্রিটিশদের তৈরি রেল ম্যাপের সীমারেখা অতিক্রম করতে পারেনি। বহু রুট ঘুরপথে তৈরি, সরাসরি সংযোগ নেই। উত্তর-দক্ষিণ সংযোগ দুর্বল, রাজধানীকেন্দ্রিক হাব-স্পোক মডেল অনুপস্থিত, নদী পারাপারে সেতুর বদলে ফেরি বা দীর্ঘ ঘুরপথ। বড় জনবসতিতে স্টেশন নেই, শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে রেল সংযোগ দুর্বল, নতুন শহর গড়ে উঠলেও রেল পৌঁছেনি, মালবাহী রেলের প্রতি অবহেলা এসব নানা কারণে আধুনিক অবকাঠামো গড়ে উঠলেও কাঠামোগত রূপান্তর হচ্ছে না বলছেন তারা।
জানা যায়, ১৮৬২ সালে প্রথম রেলপথ স্থাপন করা হয় দর্শনা থেকে জগতি পর্যন্ত মাত্র ৫৩ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা-পাট, চা, নীলসহ বিভিন্ন কাঁচামাল দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে বন্দরনগরী কলকাতায় পৌঁছে দেওয়া। ব্রিটিশরা তখন রেলকে দেখেছিল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক শোষণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে। ফলে রেললাইন স্থাপন, স্টেশন নির্মাণ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও পরিচালন কাঠামো সবকিছুই সাজানো হয়েছিল তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী। সেই সময়ের নকশা ও নিয়মই পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রেলের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। স্বাধীনতার পরও এই কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু সংস্কার ও সংযোজন হলেও মূল দর্শন ও পরিচালন পদ্ধতি রয়ে গেছে অনেকটাই একই। এখনও দেশের বহু রেলস্টেশনে দেখা যায় ব্রিটিশ আমলের তৈরি ভবন, লোহার সিগন্যাল পোস্ট ও ম্যানুয়াল পয়েন্ট লিভার।
রেলওয়ের একজন প্রকৌশলী বলেন, রেলওয়ের বড় সমস্যা হলো আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করছি পুরোনো সিস্টেমের ওপর। এতে করে কাঙ্খিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। রেলওয়ের সবচেয়ে দুর্বল দিকগুলোর একটি হলো সিগন্যালিং ব্যবস্থা। দেশের একটি বড় অংশের রেলপথে এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে সেমাফোর সিগন্যাল বা রঙিন বাতিভিত্তিক প্রাচীন ব্যবস্থা, যা পুরোপুরি মানবনির্ভর। আধুনিক বিশ্বের রেল ব্যবস্থায় যেখানে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিং, সেন্ট্রালাইজড ট্রাফিক কন্ট্রোল এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবহৃত হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের রেল এখনও নির্ভর করছে হাতে লেখা নথি, টোকেন পদ্ধতি ও মৌখিক যোগাযোগের ওপর। ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ, লাইনচ্যুতি কিংবা সিগন্যাল অমান্যের মতো ঘটনা বারবার সামনে আসছে। এসব দুর্ঘটনার বড় একটি অংশের পেছনে রয়েছে মানবিক ভুল এবং পুরোনো প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা।
সাধারণ যাত্রীদের কাছে রেল এখনও জনপ্রিয়, কারণ এটি তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ বলে মনে করেন তারা। ট্রেনে নিয়মিত যাতায়াত করেন আনোয়ার হোসেন কামাল। তিনি বলেন, রেল নিরাপদ বাহন, ভাড়া কম, কিন্তু সময়ের কোনো নিশ্চয়তা নেই। এটা মূলত ব্যবস্থাপনার সমস্যা। আধুনিক ও দক্ষ রেলব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে শুধু অবকাঠামো নয়, পুরো সিস্টেমের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। বাস্তবতার নিরিখে প্রয়োজন অনুযায়ী রেলের ব্যবস্থাপনা সাজাতে হবে। সাধারণ যাত্রীদের চাহিদার কথা বিবেচনা করতে হবে। রেল রুট আরো সহজ করা প্রয়োজন। যাত্রী পরিবহন ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সময় বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রফেসর ড. হাদিউজ্জামান ইনকিলাবকে বলেন, বাংলাদেশের রেলকে টেকসই ও নিরাপদ করতে হলে পুরো সিস্টেমে প্রযুক্তিগত রূপান্তর জরুরি। উত্তরাধিকার পদ্ধতিতে পাওয়া ব্যবস্থা থেকে বেড়িয়ে আসা দরকার। এক যুগে রেলে দেড় লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। কিছু নতুন লাইন তৈরি হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। ঘুরপাক যাতায়াতে বড় সমস্যা সৃষ্টি হয়। চট্টগ্রাম যেতে হলে গাজীপুর-নরসিংদী হয়ে ঘুরে যেতে হয়। আবার সিলেটে যেতে হলে একই পথে যেতে হয়। সিলেটের ট্রেনে লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটলে চট্টগ্রামের যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকা-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম সরাসরি লাইন দরকার। উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। কর্ডলাইন যুক্ত করে রেল লাইনের পুনবিন্যাস করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি।