ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। শেরপুরে হত্যাকাণ্ড, ভোলা, ঝালকাঠি, লালমনিরহাট, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুরে হামলা-সংঘর্ষ ও কুপিয়ে জখমের ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতার মাত্রা ততই বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার বিকালে শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনি ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে জামায়াতের উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন যখন হার্ডলাইনে হাঁটছে, তখন সহিংসতায় শেরপুরে জামায়াত নেতাকে হত্যা ভয় ধরিয়ে দিয়েছে জনমনে।
স্থানীয় সূত্র ও উপজেলা প্রশাসন জানায়, ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শেরপুর-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নিয়ে ইশতেহার পাঠের আয়োজন করা হয়। বুধবার সকাল থেকেই বিভিন্ন দলের প্রার্থী ও সমর্থকরা অনুষ্ঠানস্থলে জড়ো হতে থাকেন। সামনের সারিতে বসা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত কর্মীদের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় সভামঞ্চের সামনে থাকা কয়েক শ চেয়ার ও বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করা হয়। এ ঘটনায় দুই দলের অন্তত ৩০ নেতা-কর্মী আহত হন। হামলায় গুরুতর আহত শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিমকে উদ্ধার করে প্রথমে ঝিনাইগাতী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে শেরপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি মারা যান। জানা গেছে, ফরিদপুর-১ আসনের মধুখালীতে নির্বাচনি ব্যানার টাঙানোর সময় স্বতন্ত্র প্রার্থীর দুই সমর্থককে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় মধুখালী উপজেলার জাহাঁপুর ইউনিয়নের দোস্তরদিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আহতরা হলেন আবিদ হাসান রনি (২৬) ও আলিফ হাসান (২৪)। তাঁরা ওই গ্রামের জাহিদ হাসানের ছেলে। তাঁরা ফরিদপুর-১ আসনে ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আবুল বাসার খানের সমর্থক। আহতদের বাবা জাহিদ হাসান জানান, ‘বিকালে আমাদের গ্রামের ইটভাটার পাশে ফুটবল মার্কার ব্যানার টাঙাচ্ছিল আমার দুই ছেলেসহ আবুল বাসার খানের লোকজন। তখন বিএনপি প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলামের সমর্থক জিহাদ (৩৮) ব্যানার টাঙাতে নিষেধ করে। একপর্যায়ে ধারালো ছুরি দিয়ে আমার দুই ছেলেকে কুপিয়ে জখম করে।’
ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনে প্রচারকালে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী এ কে এম কামাল উদ্দিনের মেয়ে মারিয়া কামালসহ তিন সন্তানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে চরফ্যাশন পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ইসলামী আন্দোলনের নির্বাচনি দাওয়াতি কার্যক্রম চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। ইসলামী আন্দোলনের অভিযোগে বলা হয়, জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষ হয়ে মো. সোহেল হাওলাদার ও আলাউদ্দিন নামে দুই ব্যক্তি প্রচারে বাধা দেন এবং গালিগালাজ শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁরা মুহাম্মাদ তাহজিব ও ফয়সাল আহমাদকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। পরে প্রার্থীর মেয়ে মারিয়া কামালকেও ধাক্কা দেওয়া হয়। এ সময় বিএনপির লোকজন এসে বিষয়টি সমঝোতার চেষ্টা করেন। জামায়াতের লোকজন আরও কর্মী-সমর্থক ডেকে এনে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলেন। এ সময় ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আরও লাঞ্ছিত করা হয়। এতে তিনজন আহত হন। স্থানীয় লোকজন মারিয়া কামালসহ আহতদের উদ্ধার করে চরফ্যাশন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।
এদিকে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ২৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় নির্বাচনি প্রচার কেন্দ্র করে জামায়াতের এক কর্মীকে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠেছে যুবদলের এক নেতার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত রাজাপুর উপজেলার ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি আমির হোসেন বাচ্চু হাওলাদার। মঙ্গলবার রাতে উপজেলার ‘সারে চার আনি’ ইসলামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তি জামায়াতের কর্মী আবদুল করিম সিকদার।
চট্টগ্রাম মহানগরের খুলশী আমবাগান এলাকায় বুধবার নির্বাচনি প্রচার কেন্দ্র করে বিএনপি এবং জামায়াত কর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। নাটোর-১ (লালপুর-বাগাতিপাড়া) আসনে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নির্বাচনি ব্যানার পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা। নড়াইলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনি কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার অভিযোগ করেছেন একজন প্রার্থী। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় রবিবার বিএনপি ও জামায়াতের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হন। একই দিনে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন। ময়মনসিংহে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হামলা ও কার্যালয় ভাঙচুরের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পাওয়া গেছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে বিজিবি মোতায়েন : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকা, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, সিলেট, দিনাজপুর ও শেরপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনের সময় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভোটাধিকার সুরক্ষার লক্ষ্যে এ বাহিনী মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। গতকাল বিজিবির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহতের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী উপজেলায় পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
বিজিবির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও বিজিবির মহাপরিচালকের নির্দেশনায় বিজিবি মাঠে কাজ করছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পাঁচটি সংসদীয় আসনে ১১ প্লাটুন, সাভার ও ধামরাই উপজেলার দুটি আসনে ৬ প্লাটুন, ফরিদপুর জেলার চারটি আসনে ১৩ প্লাটুন, মানিকগঞ্জ জেলার তিনটি আসনে ৮ প্লাটুন বিজিবি সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করতে বিজিবির বিশেষায়িত কে-৯ ডগ স্কোয়াড ইউনিট মোতায়েন থাকবে। মোট ১২টি বেজ ক্যাম্প থেকে এসব বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে।
এদিকে গতকাল সিলেট সেক্টর সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন বলেন, সিলেটের চার জেলায় ৯০টি প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেট সীমান্তে নেওয়া হয়েছে বাড়তি সতর্কতা। জনগণের ভোটাধিকার সুরক্ষায় বিজিবি সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। সিলেট সেক্টরের অধীনে দুটি জেলার ১০টি সংসদীয় আসনে বিজিবি সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে নির্বাচনি নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে ১৯টি প্লাটুনে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির প্রায় ২ হাজার ১০০ জন সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। সীমান্তবর্তী ছয়টি উপজেলা- সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জকিগঞ্জে বিজিবি এককভাবে নির্বাচনি দায়িত্বে থাকবে। সীমান্তবর্তী আরও পাঁচটি উপজেলায় সেনাবাহিনী ও বিজিবি যৌথভাবে এবং অন্যান্য ১২টি উপজেলায় বিজিবি অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ে দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচনি এলাকার ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবি-৯ ইউনিটের চারটি ডগ স্কোয়াড মোতায়েন করা হবে। গতকাল দিনাজপুর শহরের কাদের বকস মেমোরিয়াল কলেজিয়েট হাই স্কুল চত্বরে ৪২ বিজিবি পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল আবদুল্লাহ আল মঈদ বলেন, দিনাজপুরের ছয়টি সংসদীয় আসনে ৩৭ প্লাটুন বিজিবি মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালনে মোতায়ন করা হয়েছে। দিনাজপুর ব্যাটালিয়নের ১৯ প্লাটুনসহ মোট ৩৭ প্লাটুন বিজিবি সদস্য ছয়টি নির্বাচনি আসনে মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। এর মধ্যে ৮৪৪টি ভোট কেন্দ্র রেকি সম্পন্ন হয়েছে। ২৯ জানুয়ারি সব উপজেলায় একযোগে ১৩টি বেইস ক্যাম্পে বিজিবি মোতায়েন থাকবে এবং ১ ফেব্রুয়ারি থেকে পূর্ণমাত্রায় দায়িত্ব পালন শুরু হবে। প্রতি উপজেলায় ২৪ প্লাটুন মোতায়েন থাকবে, পাশাপাশি কিউ-৯ ডগ স্কোয়াড, র্যাপিড অ্যাকশন টিম (আরএটি), হেলিকপ্টার ও ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা হবে। দিনাজপুর জেলার পাঁচটি সীমান্তবর্তী উপজেলায় (বিরল, বোচাগঞ্জ, ফুলবাড়ী, বিরামপুর ও হাকিমপুর) মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে বিজিবি এককভাবে দায়িত্ব পালন করবে।
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের নিরাপত্তাব্যবস্থায় বিজিবি বডি-ওর্ন ক্যামেরা, নাইট ভিশন ডিভাইস, মেটাল ডিটেক্টর, এপিসিসহ আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করবে। ভোটদানে জনগণের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণের পরিবেশ সৃষ্টি করা, জালভোট ও নাশকতা প্রতিরোধ, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচনি পরিবেশ বজায় রাখা এবং ভোট গ্রহণ ও পরবর্তী কার্যক্রম শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে সহায়তা করবে বিজিবি। নির্বাচনকালীন পুরো সময়ে বিজিবি স্বতন্ত্রভাবে অথবা অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে মোবাইল স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচনের দিন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট স্থাপন করে যানবাহন ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি করা হবে। সংবিধান ও আইনের আলোকে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে বিজিবি।