বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ বলেছে, অতীতের মতো আসন্ন নির্বাচনেও ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী ভোট দিয়ে নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করতে চায়। তবে কোনোভাবেই জীবন-জীবিকা-সম্পদ ও সম্ভ্রম নিয়ে তাদের শঙ্কা ও উদ্বেগ কাটছে না।
এই শঙ্কা ও উদ্বেগ ভোট প্রদানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিরুৎসাহিত করতে পারে। এর দায় সরকার, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে নিতে হবে। এই অনভিপ্রেত পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনে নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের দৃঢ় ভূমিকা কামনা করেছে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ঐক্য পরিষদ এসব কথা বলেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সংগঠনটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৫ সালে সারা দেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে ৫২২টি, যার মধ্যে হত্যার ঘটনা ৬১টি।
লিখিত বক্তব্যে ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, নির্বাচনের আর মাত্র ১৪ দিন বাকি। এখনো গত বছরের মতো চলমান সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম ২৭ দিনে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৪২টি। এর মধ্যে হত্যার ঘটনা ১১টি, ধর্ষণ ১টি, মন্দির-গির্জায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ৯টি, বাড়িঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট, জমি দখল এবং অন্যান্য ঘটনা ২১টি।
তিনি আরও বলেন, সারা দেশে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বিশেষ করে নারী প্রতিনিয়ত ভীতি এবং আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীরা নিজ অবস্থানে থেকে স্বাভাবিকভাবে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছেন না। এ অবস্থায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় অভ্যন্তরীণভাবে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে।
ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বলেন, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণভোটের নামে যুক্ত হয়েছে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোট। এখানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এর পক্ষে সরকার ও নির্বাচন কমিশন সরাসরি প্রচার চালাচ্ছে। এটি দুর্ভাগ্যজনক এবং নিতান্তই পক্ষপাতদুষ্ট।
সংগঠনটি বলেছে, অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের সংবিধান আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। এটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সমঅধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন তারা। এ পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া এবং তার নিজ পছন্দ অনুযায়ী ভোট প্রদান একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অবস্থায় হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ সংবাদ সম্মেলন থেকে সাত দফা দাবি জানায়। এগুলো হলো—
প্রথমত, ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে; প্রার্থী হওয়ার কারণে যেন কোনো রকম বাধার সম্মুখীন না হতে হয়। নির্বাচনী প্রচারে অংশগ্রহণে সমান সুযোগ যেন পায়, তার জন্য নির্বাচন কমিশনকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী প্রচারে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হোক। যদি কোনো প্রার্থী বা কোনো দল নির্বাচনে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করে, তবে তার শাস্তির বিধান রাখতে হবে।
তৃতীয়ত, আসন্ন নির্বাচনে সংখ্যালঘু ও নৃগোষ্ঠীর নির্ভয়ে-নির্বিঘ্নে ভোটদানের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক। প্রয়োজনে সেনাবাহিনী নিয়োগের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, নির্বাচনের পূর্বাপর সময়কালে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলাজনিত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের তাগিদে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে পুলিশ, আনসার ইত্যাদি মোতায়েনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবির নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা করা হোক। নিয়মিত মনিটরিং করার জন্য একটি ‘মনিটরিং সেল’ গঠন করতে হবে।
পঞ্চমত, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় নির্বাচন কমিশনের গৃহীত যাবতীয় পদক্ষেপের বিষয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, রাজনৈতিক দলসহ সবাইকে সম্যকভাবে অবহিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, নির্বাচনী প্রচারকাজে মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গির্জাসহ যে কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে।
সপ্তমত, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, বিবৃতি, গুজব প্রচার বা এ ধরনের যাবতীয় প্রচার বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে দায়ী ব্যক্তিদের প্রার্থিতা বাতিলের ব্যবস্থা করতে হবে।
এ সময় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের স্বার্থ ও অস্তিত্ব রক্ষায় তাদের দাবিগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
ঐক্য পরিষদের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট দীপংকর ঘোষের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের দুই সভাপতি অধ্যাপক ড. নিমচন্দ্র ভৌমিক ও নির্মল রোজারিও, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, কাজল দেবনাথ, জে এল ভৌমিক, রঞ্জন কর্মকার; যুগ্ম সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ বসু, সাংগঠনিক সম্পাদক পদ্মাবতী দেবী, অতুল চন্দ্র মণ্ডল, হৃদয় গুপ্ত, সুপ্রিয়া ভট্টাচার্য, পরিমল ভৌমিক, প্রাণতোষ আচার্য শিবু, শিমুল সাহা, সুজন রায়, সজীব সরকার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।