Image description
Ali Ahmad Mabrur (আলী আহমেদ মাবরুর)

 
আমার বাবা সরকারে থাকা অবস্থায় কারা সংস্কার সংক্রান্ত কমিটির সদস্য ছিলেন। সারা দেশ ঘুরে কারাগারগুলো ভিজিট করেছিলেন। তিনি ও তার কমিটির অন্যান্য সদস্যদের পরামর্শ ও পরিশ্রমে কারাগারে পিসি সিস্টেম চালু হয়। আমার মনে হয়, তিনি যদি আরো সময় পেতেন তাহলে প্যারোল সিস্টেমেও সংস্কার আনতেন।
 
আমার বাবা কারাগারে থাকা অবস্থায় আমার ছোট চাচা ইন্তেকাল করেন। আব্বার জন্য প্যারোলের আবেদন করেছিলাম। এত কষ্ট, এত ঝক্কি। কল্পনা করা যায় না। সম্মানিত আইনজীবীদের আমি সকাল থেকে সচিবালয়, আইজি প্রিজনের অফিসে দৌড়াচ্ছি। আর চাচার লাশ বাসায়। আমি তাদের সাথে নেই। তারা আমার সাথে নেই। পরিবার আশা করে আছেন আব্বা প্যারোলে মুক্তি পাবেন। অথচ এই ঝক্কি সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারনা নেই।
 
আমার তখন দৌড়াতে দৌড়াতে অবস্থা সঙ্গীন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সিগনাল লাগে, সচিব সাহেবের সাইন লাগে। আইজি প্রিজনের অনুমোদন লাগে। তারপর সংশ্লিষ্ট কারাগারে সেগুলো পৌঁছাতে হয় তারপর তারা দয়া করে ৪ ঘন্টার জন্য মুক্তি পান। এই চারঘন্টার অর্ধেকের বেশি যায় বন্দীর যাওয়া আর আসায়। ফাইনালী একজন বন্দী যে কারণে মুক্তি পান সেখানে হয়তো তারা আধা ঘন্টাও থাকারও সুযোগ পান না।
 
আব্বার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। শহীদ কামারুজ্জামানের বেলায়ও তাই। আল্লামা সাঈদী নিজের সন্তানের বেলায় প্যারোলে মুক্তি পেলেও ছোট ভাইয়ের ক্ষেত্রে পাননি। উনি আসবেন বলে মতিঝিল স্কুলের মাঠে অনেক মানুষ আমরা জড়ো হয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনুমতি পাননি। মিয়া গোলাম পরওয়ার সাহেবের পিতার ইন্তেকালের পর তারও লম্বা সময় লেগেছিল প্রোসেস শেষ হতে। পরে ধানমন্ডি ঈদগাহ মাঠের জানাজায় তিনি শরীক হতে পেরেছিলাম। আমি এই প্রতিটি ওকেশনে উপস্থিত ছিলাম। ফলে ভোগান্তিগুলো কেমন হয় আমার জানা আছে। বিশেষ করে বন্দীর আপনজন যদি শুক্রবার মারা যায়, তাহলে ভোগান্তি ১০ গুণ বেড়ে যায়। কারণ সরকারী লোকজনকে সেদিন খুঁজে পাওয়াই কঠিন।
 
সর্বশেষ এটিএম আজহার চাচার সময়ও আমি ছিলাম। ওনার স্ত্রী মারা গেলেন। বিকেল থেকে বসে আছি। আবেদন হয়েছিল সকালেই। বিকেল থেকে শুনছি চাচা আসবেন, এই আসছেন। শেষ পর্যন্ত তিনি আসলেন রাত সাড়ে ১১টার দিকে। লোকজন দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে অনেকেই চলে গিয়েছিল। উনি আসলেন। সরাসরি চলে গেলেন লাশের কাছে। সেখানে মেয়েদের ও অন্যান্য আত্মীয়দের সাথে দেখা করলেন। তারপর ঈদগাহ মাঠে গেলেন। জানাজার আগে অল্প কথা বললেন। তখন ভারপ্রাপ্ত আমীর ছিলেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। কেননা ডা. শফিকুর রহমান সাহেব কারাগারে বন্দী ছিলেন।
 
জানাজা পড়েই আজহার সাহেবকে নিয়ে যাওয়া হলো। অথচ এটুকুর জন্য বিকাল থেকে অপেক্ষা। লাশ নিয়ে পরিবারকে বসে থাকতে হয়। তারপর অপেক্ষার পালা শেষ হয়। বন্দী আসেন, আবার কখনো কখনো আসেনও না। এর সুরাহা হওয়া উচিত। এখন সময় কিছুটা অনুকূল বলে এই বিষয়ে চুপ থাকবো তা হতে পারে না।
 
আমি মনে করি, কার মৃত্যুতে প্যারোল মঞ্জুর হবে কার বেলায় হবে না- এর সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা উচিত। এই নীতির আলোকে যদি তালিকাভুক্ত কারো মৃত্যু হয়; তাহলে সংশ্লিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষের ঐ বন্দীকে স্বাভাবিকভাবে প্যারোলে মুক্তি দেয়া উচিত। এজন্য অহেতুক হাইকোর্ট দেখানো, মন্ত্রী মিনিস্টার পর্যন্ত যাওয়ার বিধান বা বহু লোকের সাইন দেয়ার প্রক্রিয়া শিথিল করা উচিত। আর যদি তালিকার বাইরে কেউ মারা যান, তাহলেও ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে না বলে সরাসরি বলা উচিত যে, মৃত ব্যক্তি বন্দীর ততটা ঘনিষ্ঠ নন, ফলে তার প্যারোল হবে না। আপনারা বিলম্ব না করে জলদি দাফন করে দিন।
দ্বিতীয়ত, ছুটির দিনে প্যারোল প্রক্রিয়ার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। মানুষকে স্বাভাবিক ও আইনসিদ্ধ সুবিধা পেতেও যেন ভোগান্তিতে না পড়তে হয়, তা নিশ্চিত করা উচিত। আর প্যারোলে মুক্তি পেলে বন্দীকে শিকল বা ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে আনাও কাম্য নয়। এতে মানুষের ইমপ্রেশন খারাপ হয়। অনেকেই উত্তেজিত হয়ে পড়েন। ডান্ডাবেড়ি পরে কেউ তার আপনজনের জানাজা পড়ছেন- এই দৃশ্য দেখা খুবই কষ্টকর।
 
অনেকেই নির্বাচনের আগে অনেক পলিসি বা প্রতিশ্রুতির ঘোষণা দেন। আমি বরাবরই জীবনঘনিষ্ঠ বিষয় নিয়ে আলোকপাত করার পক্ষে। আমি মনে করি, যারাই আগামীতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাবেন, প্যারোল পদ্ধতি নিয়ে তাদের কাজ করা দরকার।