আপনার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ নেই। তবে নির্বাচনের আগে আপনাকে ছাড়া হবে না। ফেসবুকে আপনার অনেক ফলোয়ার। অনেক কর্মকর্তা আপনার অনুগত। সেজন্য আপনি সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
গুম থাকা অবস্থায় জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিনুর রহমানকে এ কথাগুলো বলেছিলেন এক কর্মকর্তা। জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার বা জেআইসিতে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জবানবন্দিতে এসব কথা জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের একক বেঞ্চে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। যদিও সকালে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে দুই নম্বর সাক্ষী হিসেবে হাসিনুরের সাক্ষ্য শুরু হয়।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে গুম করা হয়েছে বলে জানান হাসিনুর রহমান। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আমাকে বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন করতেন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। একদিন আমাকে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে আপনাকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। তাই নির্দেশ মোতাবেক কাজ করবেন। কথা না শুনলে গায়েব করে দেওয়া হবে। এখানে আপনার মতো অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিও আটক আছেন। সুতরাং কোনো ঝামেলা করবেন না।
এ ছাড়া, বরাবরের মতো নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। ধারাবাহিক এমন নির্যাতন-নিপীড়নের কারণে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা। এতে কয়েকদিন অস্বাবভাবিক আচরণ করেন তিনি। কী কারণে তাকে আটক রাখা হলো, তা জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করা ওই কর্মকর্তার কাছে খবরও পাঠান। কিন্তু কোনো জবাব না পেয়ে অনশন শুরু করেন। বন্ধ করে দেন খাওয়া-দাওয়া।
হাসিনুর বলেন, অনশনের সপ্তম দিনে আমার অবস্থার অবনতি হলে আগের মতো হাত-পা ও চোখ বেঁধে ওই কর্মকর্তার সামনে নেওয়া হয়। তিনি আমাকে বলেন— আপনার বিরুদ্ধে আমার ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ নেই। তবে নির্বাচনের আগে আপনাকে ছাড়া হবে না এটুকু বলতে পারি। ফেসবুকে আপনার অনেক ফলোয়ার। অনেক অফিসারও আপনার অনুগত। সেজন্য আপনি সরকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এরপর ফের আমার কক্ষে নিয়ে আসা হয়। আসার পথেও নির্যাতন চালান প্রহরীরা।
তিনি আরও বলেন, আমি সেনাবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। আমার কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে তিনটি পদক যথাক্রমে বীর প্রতীক, বাংলাদেশ রাইফেল পদক ও বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল পেয়েছি। সাধারণ সৈনিক দিয়ে আমার সঙ্গে এমন অমানবিক ও লজ্জাজনক আচরণ মেনে নিতে পারিনি। মানসিক চাপ ও শারীরিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আমার হার্ট অ্যাটাক হয়। এরপর সেখানেই আমাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসার সময়ও আমার চোখ বাঁধা ও হাতে হাতকড়া লাগানো থাকতো।
জবানবন্দিতে গুমজীবনের আরও ভয়াবহ বর্ণনা তুলে ধরেন হাসিনুর রহমান। তাকে কোথায় রাখা হয়েছিল, সেই স্থানের নামও বলা হয়। অর্থাৎ আয়নাঘর নামে পরিচিত জেআইসিতে তাকে রেখেছিল বলে জানান তিনি। তবে জবানবন্দি অসমাপ্ত অবস্থায় আগামী ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত মুলতবি করেন ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশনের পক্ষে আজ শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, শাইখ মাহদী, সাইমুম রেজা তালুকদার, মঈনুল করিমসহ অন্যরা। এছাড়া আসামিপক্ষের আইনজীবীরাও উপস্থিত ছিলেন।