ঝালকাঠিতে এক আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যার জেরে কোনোভাবেই জড়িত না থেকেও গুম হয়েছেন তিন পরিবারের ১১ জন। যারা ফেরেননি আর কখনোই। এই গুমের ঘটনায়ই র্যাবের হাতে গুলিবিদ্ধ হন পা হারানো আলোচিত লিমন। যার নেপথ্যে এনটিএমসির সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান। প্রসিকিউশন বলছেন, ঘটনার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে।
আমাদের এসএ পরিবহন থেকে নামানোর পর আমাকে একটি গাড়িতে তোলা হয়। তখন আমার দুই হাত পেছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছিল এবং চোখে কালো কাপড় পরানো হয়। কিছুক্ষণ পর একটি গেট খোলার শব্দ পাই। গেট খুলে আমাকে ভেতরে নেয়া হয় এবং বাইরে সাইডে হাতকড়া পরানো হয়। সেখানে বসে থাকা ছাড়া আমার আর কোনও উপায় ছিল না। ঘুমানোর কোনও ব্যবস্থা ছিল না। টানা ২৪ ঘণ্টা, দিন-রাত সেখানে বসে থাকতে হয়েছে। শুরুতে আমি বুঝতে পারিনি কোথায় আমাকে রাখা হয়েছে।
কিছু সময় পর তাকিয়ে দেখি, আমার এক বন্ধু সেখানে এসেছে। সে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তখন আমি তাকে বলি, কাঁদিস না, যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আল্লাহ যা ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাতে কোনও ক্ষতি হয়নি।
গুম থেকে ফিরে প্রথম দফায় আইনজীবীর কাছে এভাবেই ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন ঝালকাঠির রাজাপুরের ফুরকান। কে জানতো! গুমের সেই বর্ণনাই একদিন কাল হয়ে দাঁড়াবে ফুরকানের জন্য! প্রথম দফায় ফিরে এলেও, দ্বিতীয়বার গুম হওয়ার পর আর তিনি। আজও সেই শূন্যতা পোড়াচ্ছে পুরো পরিবারকে।
কেন গুম করা হয়েছিল ফুরকানকে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চ্যানেল-24 পৌঁছায় তার বাড়িতে। ঘটনার বিবরণ এতোটাই ভয়াবহ, যা যে কোনও সিনেমার লোমহর্ষক গল্পকেও হার মানায়।
গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবার অভিযোগ করেছেন, তাদের দুই ছেলে অসীম ও রাজিব আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতন এবং গুমের শিকার হয়েছেন।
ফোরকানের বড় ভাই জানান, ফোরকান কেন র্যাবের বিরুদ্ধে কথা বলল, এই অভিযোগে আমার দুই ভাইকেও নিয়ে গেছে। দুই ভাইকে ধরে নিয়ে গেছে, তারপর ফোরকানকে নিয়েছে। ফোরকানকে নেয়ার পর ২০১০ সালের ১৫ আগস্ট সকাল থেকে এখন পর্যন্ত আমরা কোথাও খোঁজ পাইনি। আমার ভাইরা কোথায় আছে, আমরা জানি না।
২০১০ সালে ঝালকাঠির রাজাপুরে খুন হন গিয়াসউদ্দিন নামে এক আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবী। এই ঘটনার মামলার এজাহারে নাম না থাকলেও, জড়ানো হয় বিএনপি কর্মী মিজান জমাদ্দার ও তার ভাই মোর্শেদ জমাদ্দারকে। তবে ঢাকায় পালিয়ে এলে শেষ রক্ষা হয়নি। দুজনকে তুলে নেয় র্যাব। সেই শুরু… একে একে গুম হন তিন পরিবারের মোট ১১ জন সদস্য।
এরই মধ্যে মোহাম্মদপুর থেকে উদ্ধার হয় অজ্ঞাত তিনটি মরদেহ। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেগুলো জমাদ্দার পরিবারের বলে বুঝিয়ে দেয়। দাফনের পর জানা যায়, মরদেহগুলো জমাদ্দার পরিবারের সদস্যদের নয়। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, এই তিনটি মরদেহ আসলে কার?
এঘটানায় ফুরকানের ভাই বলেন, আমার ভাই গ্রেপ্তার হওয়ার তিন-চার মাস পরে ফোরকান বাড়িতে আসে। তার লাশ দাফন করা হয়েছে। আমি ফোরকানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তুমি কোথায় ছিলে? ফোরকান বলেছে, আমি র্যাব-১ ছিলাম, র্যাব-১ সেলের ভিতর ছিলাম।
ঘটনা এখানেই থেমে থাকেনি। জমাদ্দার পরিবারের সদস্য ভেবে গুম করতে গিয়ে র্যাব গুলি করে বসে ঝালকাঠির বহুল আলোচিত লিমনকে। পা হারান লিমন। এই ঘটনা ঘিরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে র্যাব।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর উদয় তাসমি বলেন, ভুলবশত মোর্শেদ জমাদার মনে করে লিমনকে টার্গেট করে গুলি করে র্যাব। এরপর মুর্শিদ জমাদারসহ ধারাবাহিকভাবে সুমন শিকদার ও মিজান শিকদার র্যাবের হাতে আটক হন। তবে আজ পর্যন্ত তাদের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।
৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আবারও আলোচনায় আসে গুমের ঘটনা। সামনে আসে ঝালকাঠির দুই পরিবারের ১১ জন গুম হওয়ার ভয়াবহ অধ্যায়। এই গুমের সঙ্গেও জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেছেন, একজনকে গুম করতে গিয়ে এক, দুই বা তিনটি পরিবার জড়িত হয়ে যায়। পরে সেই তিন পরিবারের মোট ১১ জনকে গুম অবস্থায় হত্যা করার তথ্য আমরা পেয়েছি বা আশঙ্কা করছি। প্রসিকিউশন বলছে, এই গুমের ঘটনায় আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে।