Image description

গতকাল ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমএন্ডডিসি) স্বীকৃত নয় এমন ডিগ্রি ব্যবহার করে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে বাংলাদেশ ফার্টিলিটি হাসপাতাল লিমিটেডের ডা. এস এম খালিদুজ্জামানের কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছে বিএমএন্ডডিসি। আসন্ন ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে খালিদুজ্জামান ঢাকা-১৭ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী।

বিএমএন্ডডিসির পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ডা. খালিদুজ্জামান তার প্রচারপত্রে নামের পাশে ‘এমএসসি ইন ক্লিনিক্যাল এমব্রায়োলজি অ্যান্ড প্রি-ইমপ্লান্টেশন জেনেটিক্স (ইন্ডিয়া)’ ডিগ্রি উল্লেখ করে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তার এই ডিগ্রি বিএমডিসি কর্তৃক স্বীকৃত নয়। আব্দুল কাদের নামের একজন ব্যক্তির চিঠির প্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপ নেয়া হয় বলে জানান হয়েছিল বিএমডিসির নোটিশে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, "এমতাবস্থায় আপনার ডিগ্রি যা বিএমএন্ডডিসি কর্তৃক স্বীকৃত নয় তা ব্যবহারের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে এবং বিএমএন্ডডিসি হতে প্রাপ্ত রেজিস্ট্রেশন নম্বর উল্লেখ পূর্বক পত্র প্রাপ্তির ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে নিম্নস্বাক্ষরকারীকে লিখিতভাবে অবহিত করার জন্য জানানো হল।" 

বাংলাদেশের বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমে নোটিশের খবরটি প্রকাশিত হয়েছে।

“জামায়াত নেতা ডা. খালিদুজ্জামানকে বিএমডিসির শোকজ" শিরোনামে  যুগান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, “অনুমোদনহীন ডিগ্রি ব্যবহার করার অভিযোগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা-১৭ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও বাংলাদেশ ফার্টিলিটি হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. এসএম খালিদুজ্জামানকে শোকজ করেছে চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি)।" 

এই খবরটিকে ঘিরে কিছু ফেসবুক একাউন্ট ও পেইজ এবং স্বল্পপরিচিত কিছু ওয়েবসাইট থেকে অসত্য তথ্য প্রচার করা হয়েছে। বিএমডিসির নোটিশকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে খালিদুজ্জামানের ডিগ্রিকে ‘ভুয়া’ সাব্যস্ত করে প্রচার চালানো হচ্ছে।

বাংলা টাইমস নামে একটি নিউজ পোর্টালে ‘ভুয়া মেডিক্যাল ডিগ্রি জামায়াতের ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী খালিদুজ্জামানকে বিএমডিসির শোকজ’ শিরোনামে একটি প্রতিবদেন প্রকাশ করা হয়। 

বাংলা টাইমস-এর ফটোকার্ড শেয়ার দিতে দেখা গেছে Zahid F Sarder Saddi - জাহিদ এফ সরদার সাদী নামের একটি ফেসবুক পেইজ থেকে।

এর বাইরে দ্য ন্যাশনালিস্ট ডাটা ফেসবুক পেইজ থেকে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়, যেখানে লেখা রয়েছে, ‘ঢাকা ১৭ আসনে জামায়াতের প্রার্থী খালিদুজ্জমানের ডিগ্রি ভুয়া। শোকজ করে বিএমডিসি।’

উক্ত ফটোকার্ডে খবরের সূত্র হিসেবে ঢাকা মেইল উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ঢাকা মেইলের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ডা খালিদুজ্জামানের ডিগ্রিকে ‘ভুয়া’ বলা হয়নি, বরং ‘অনুমোদহীন’ বলা হয়েছে। প্রতিবেদনটির  শিরোনাম ছিল, ‘জামায়াত নেতা ডা. খালিদুজ্জামানকে বিএমডিসির শোকজ’।

বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট সাইবার ফোর্স-বিএনএসএফ ফেসবুক পোস্টে দাবি করা হয়, “ঢাকা ১৭ আসনের জামাতের প্রার্থী ডা: খালিদুজ্জামানকে ভুয়া ডিগ্রি ব্যবহারের জন্য বি এম ডি সি'র শোকজ। এই ভুয়া বাটপাররা আবার পরিবর্তন এর কথা বলে, জান্নাতের টিকেট বেচে আর মানুষের সাথে প্রতারণা করে। এদের বয়কট করুন।”

 এছাড়া বেশ কিছু ব্যক্তিগত আইডি (,২,) থেকেও খালিদুজ্জামানের ডিগ্রিকে ভুয়া বলে পোস্ট করা হয়। 

দ্য ডিসেন্ট বিএমডিসি কর্তৃপক্ষ, একাধিক চিকিৎসক এবং খালিদুজ্জামানের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছে, ডা. এস এম খালিদুজ্জামানের এমএসসি ডিগ্রিটি ভুয়া নয়, তবে বিএমডিসি এই ডিগ্রিকে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি। 

 

‘ভুয়া’ নাকি ‘অনুমোদনহীন’?

ডাঃ খালিদুজ্জামানকে পাঠানো চিঠির সূত্র ধরে দ্য ডিসেন্ট যোগাযোগ করে বিএমডিসির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ডা. মো. লিয়াকত হোসেনের সাথে। তার স্বাক্ষরে খালিদুজ্জামানকে চিঠিটি পাঠানো হয়েছিল।

জনাব খালিদের প্রচারপত্রে উল্লিখিত ‘এমএসসি ইন ক্লিনিক্যাল এমব্রায়োলজি অ্যান্ড প্রি-ইমপ্লান্টেশন জেনেটিক্স (ইন্ডিয়া) ডিগ্রিটি ভুয়া কিনা এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যারা বাইরে থেকে বিদেশি ডিগ্রি নিয়ে আসেন, তারা সবাই যার যার ডিগ্রিগুলো আমাদের কাছে স্বীকৃতি করিয়ে নেন। এটি না করে থাকলে তার ডিগ্রি অস্বীকৃত থাকলো। আমরা কখনই বলিনি ডিগ্রিটি ভুয়া, আমাদের চিঠিতেও সেটি বলা হয়নি।”

ডিগ্রির বিষয়ে আরও জানতে ডা. এস এম খালিদুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি ভারতের মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত তার ডিগ্রির সনদপত্রের ছবি পাঠান। তাতে দেখা যায়, অধ্যাপক হেমান্থ কুমার স্বাক্ষরকৃত ডিগ্রিটি তিনি ২০১৯ সালে অর্জন করেছেন।

সনদপত্রে একটি কিউআর কোড সংযুক্ত আছে যা দিয়ে ডিগ্রিটি অনলাইনে যাচাই করে দেখেছে দ্য ডিসেন্ট।

খালিদুজ্জামান দ্য ডিসেন্টকে বলেন, "আমি ভারতের মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রথম মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছি। এরপর আরও অনেকে এই ডিগ্রি নিয়েছেন। সবাইকে নিয়ে আমরা বিএমডিসিতে আবেদন করব যাতে আমাদের এই ডিগ্রিকে বিএমডিসি অনুমোদন দেয়।”

এরকম ডিগ্রি আরও ডাক্তারের আছে কিনা জানতে চাওয়া হয় বিএমডিসির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের কাছে। তিনি বলেন, “অন্য কোন ডাক্তারের এই এমএসসি ইন ইনফার্টিলিটি ডিগ্রি আছে কিনা সেটা অবশ্য আমাদের চেক করতে হবে। এখন অন্যদেরটা আমরা চেক করতেছি না। আমাদের কাছে উনারটা সম্বন্ধে একটা অভিযোগ আসছে, চিঠি আসছে। সেটা আমরা খালি উনাকে চিঠি দিয়েছি।”

দ্য ডিসেন্ট গুগলে সার্চ করে একই বিষয়ে ডিগ্রিধারী বেশ কয়েকজন ডাক্তারের সন্ধান পেয়েছে যারা ডা. খালিদুজ্জামানের মতো এমব্রায়োজলিস্ট ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং নামের পাশে তা ব্যবহার করেন। এরকম কয়েকজন ডাক্তারের প্রোফাইলে দেখতে ক্লিক করুন এখানে, এখানে, এখানে

ডিগ্রিগুলো কীভাবে বিএমডিসি স্বীকৃতি দেওয়া হয় এমন প্রশ্নে রেজিস্ট্রার বলেন, “কিছু ডিগ্রি নিয়ে কোর্টে মামলা পেন্ডিং করা আছে, যেমন এমআরসিপি। এগুলো কোর্টের অধীন রয়েছে। সাধারণভাবে অনেক ডিগ্রি আছে যেগুলো আমরা কিছু অনুমোদন করি আবার কিছু করি না, সেটা আমাদের বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয়। আমাদের একটা স্বীকৃতি কমিটি আছে, সেই কমিটি থেকে সেগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোনটা আমরা রিকগনাইজ করতেছি—এটা সময়ের ব্যাপার।”

রেজিস্ট্রার ডা. মো. লিয়াকত হোসেনের আরো বলেন, “উনি এমএসসি যেখান থেকে করে আসুক, ইংল্যান্ড, ডেনমার্ক যে কোনো জায়গা থেকে করতে পারেন। উনি কোর্সটি এক বছর হতে পারে দুই বছর হতে পারে তিন বছর হইতে পারে। এটি আমরা কিন্তু জানি না যেহেতু আমাদের সাথে এটা এনডোর্স করা না। এই ডিগ্রির কোর্স কনটেন্ট, কতদিনের কোর্স সেটি আমাদের জানা নেই। কাজেই আমরা কেন এটিকে ভুয়া ডিগ্রি বলবো? উনি তো সার্টিফিকেট নিয়ে এসেছেন। তবে সেই সার্টিফিকেট যেহেতু স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএমডিসি স্বীকৃত নয়। তাই আমরা বিষয়টি জানিয়েছি।”

ঢাকা মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক্স বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শরীফ উদ্দিনের মতে, বিএমডিসির অনুমোদনের বিষয়টি মূলত ওই নির্দিষ্ট ডিগ্রির কথা কোন প্রচারপত্রে ব্যবহার করা যাবে কি যাবে না তার সাথে সম্পর্কিত।

তিনি বলেন, ”কোন ডিগ্রি অনুমোদিত না হওয়া মানে সেটি ভুয়া নয়। এবং এই অনুমোদন না থাকলে কেউ কোন ডিগ্রির ভিত্তিতে প্রাক্টিস করতে পারবে না তাও নয়। তবে অনুমোদন না থাকলে সেই ডিগ্রির কথা প্রচারপত্রে উল্লেখ করা যাবে না।”