বাংলাদেশের ইতিহাসে কর্মব্যস্ততা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের এক অনন্য উদাহরণ ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ১৯৮১ সালের ২৮ মে, বৃহস্পতিবার ছিল তার শেষ কার্যদিবস। অধ্যাপক নিসার উদ্দিনের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ঘটনাবলি নিয়ে লেখা ‘প্রেসিডেন্ট জিয়া বাংলাদেশের কামাল আতাতুর্ক’ বই থেকে জানা যায়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিয়মিত ভোর ৬টায় শয্যা ত্যাগ করতেন এবং প্রতিদিন গড়ে ১৮ ঘণ্টারও বেশি সময় কাজ করতেন। বিশ্রাম ছিল তার জীবনে কদাচিৎ।
বিশ্বের অন্যতম কর্মব্যস্ত নেতা নেপোলিয়ন দিনে গড়ে ১৮ ঘণ্টা কাজ করতেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাকেও অতিক্রম করেছিলেন। যেদিন তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে শহীদ হন, সেদিনও তিনি রাত প্রায় দুইটা পর্যন্ত কর্মব্যস্ত ছিলেন এবং নামাজ পড়ে রাত আড়াইটায় ঘুমাতে যান; সেদিন তার কর্মঘণ্টা ছিল ২০ ঘণ্টারও বেশি।
১৯৮১ সালের ২৮শে মে, বৃহস্পতিবার তার শেষ কার্যদিবসের কর্মসূচী পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি কতটা নিরলস ও আপসহীন ছিলেন। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত টানা কর্মব্যস্ত এই দিনটি তাঁর সার্বিক কর্মজীবনেরই প্রতিচ্ছবি।
দিনটির সূচনা হয় ভোর ৫টা ১১ মিনিটে সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে। সকাল সাড়ে ৭টায় তিনি শিক্ষা সম্পর্কিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে অংশ নেন। এরপর সকাল ৮টা ৪৪ মিনিটে একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎদান করেন। সকাল ৯টায় হেলিকপ্টারযোগে তিনি রংপুরের পলাশবাড়ী থানার চরমুংগেশপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সকাল ১০টা ৫ মিনিটে সেখানে উপস্থিত হয়ে খননকৃত খাল পরিদর্শন ও জনসভায় ভাষণ দেন।
এরপর তিনি একের পর এক কর্মসূচীতে অংশ নেন নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলে জনসভা, কৃষক সম্মেলন, প্রশাসনিক পরিদর্শন ও মধ্যাহ্নভোজে। দুপুর ১টায় গাইবান্ধা জেলা ডাক বাংলোয় মধ্যাহ্ন ভোজ গ্রহণ করলেও তা ছিল কর্মসূচীরই অংশ। বিকাল ৩টা ১০ মিনিটে তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং বিকাল সোয়া ৪টায় ঢাকায় পৌঁছান।
ঢাকায় ফিরেই তার কর্মসূচী শেষ হয়নি। বিকাল সাড়ে ৫টায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় সম্পর্কিত এনআইসি বৈঠকে অংশ নেন। সন্ধ্যার পর একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ করেন—শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রী, জাতীয় রপ্তানি পরিষদ, মন্ত্রী, এমপি, সামরিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক চলে রাত পর্যন্ত।
এদিন রাত ৯টায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠক শুরু হয়। সবাই জানেন, এ ধরনের বৈঠক প্রায়ই রাত এক-দুইটা পর্যন্ত গড়াত। উল্লেখিত পুরো কর্মসূচীতে কোথাও তার বিশ্রামের কোনো সুযোগ চোখে পড়ে না। এটি কোনো একদিনের ব্যতিক্রমী চিত্র নয়; বরং প্রতিদিনই তিনি এভাবেই অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন।
শেষ কার্যদিবসের এই কর্মসূচি শুধু একটি দিনের বিবরণ নয়; এটি একজন রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্ববোধ, পরিশ্রম ও সময়ানুবর্তিতার জীবন্ত দলিল। শহর ও গ্রামের মানুষ, দেশবাসী; সবাই তাঁর এই অক্লান্ত পরিশ্রমের সাক্ষী। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কর্মজীবন আজও নেতৃত্ব, নিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করতেন। দেশে বা বিদেশে সফররত অবস্থায়ও তিনি সময় নষ্ট করতেন না। রেলগাড়ি, জাহাজ কিংবা বিমানে বসেও ‘ফাইল ওয়ার্ক’ করতেন। প্রয়োজনীয় ফাইল সঙ্গে নিয়ে যেতেন এবং যাত্রাপথেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজ সম্পন্ন করতেন।