Image description

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ‘বীরের কণ্ঠে বীরগাথা’ প্রকল্পের আওতায় ধারণ করা ১৪ হাজার ৬৪০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকারভিত্তিক ভিডিও বাতিল করেছে সরকার। ভিডিওগুলো মানসম্মত না হওয়া এবং নির্ধারিত কারিগরি ও ঐতিহাসিক মানদণ্ড উত্তীর্ণ না হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় নির্ধারিত কাঠামো অনুসরণ করা হয়নি। সরকার গঠিত ১০ সদস্যের পর্যালোচনা সাব-কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ (এমটিআই)-কে প্রতিটি সাক্ষাৎকারের জন্য ১৯টি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—মুক্তিযোদ্ধা কোন সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন, কার নির্দেশে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, সম্মুখযুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং অস্ত্রের প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য। তবে পর্যালোচনা কমিটির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ ভিডিওতে এসব শর্ত মানা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ভিডিওর শব্দের মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং কারিগরিভাবে ত্রুটিপূর্ণ, যা ভবিষ্যতে আর্কাইভে রাখার অনুপযোগী। 

পর্যালোচনা কমিটির সভাপতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার ভিডিওর মান উন্নয়নের তাগাদা দেওয়া হলেও তারা তা শোনেনি। বরং তড়িঘড়ি করে কাজ শেষ করে বিল তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন, “এসব ভিডিও নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসের পরিবর্তে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে, তাই আমরা এগুলো বাতিলের সুপারিশ করেছি।” 

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইশরাত চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ভিডিওগুলো বাতিল করা হয়েছে। শর্ত পূরণ না করায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এই কাজের বিপরীতে কোনো বিল পরিশোধ করা হবে না।” তিনি জানান, শুনেছি মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নাকি মামলা করেছে।   

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (এমটিআই) ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার আজমল কবির রাব্বি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা সরকারের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করেছি। সরকারের দেওয়া ১৯ শর্ত মেনে ৮০ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছি। সেই মোতাবেক আমরা কাজ করেছি। কাজ করতে গিয়ে জেলায় ডিসি, উপজেলায় ইউএনও এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের সঙ্গে সমন্বয় করেই সাক্ষাতকারগুলো সংগ্রহ করেছি। মন্ত্রণালয়ে থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আমাদের লোকজন ভিডিও করেছে। কাজেই মানহীন কাজ বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তার কোনো ভিত্তি নেই।” 

তিনি আরও বলেন, “২০২৪ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত আমরা মাঠে ছিলাম। তখন সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া মৌখিক নির্দেশ অনুযায়ী মাঠ থেকে উঠে এসেছি। কাজেই আমাদের কাজের কোনও ত্রুটি আছে বলে মনে করি না। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খানেরও সাক্ষাৎকার নিয়ে ভিডিও ডকুমেন্ট বানিয়েছি। এখানে আমাদের নিজস্ব কোনও মতামতের প্রতিফলন ঘটেনি।”    

রাব্বি জানান, প্রকল্প বিষয়ে ৩১ জুলাইয়ের আগে মন্ত্রণালয়ের সব বৈঠকে আমাদের উপস্থিত থাকার জন্য ডাকা হলেও ৫ আগস্টের পরে মন্ত্রণালয়ের কোনো বৈঠকে আমাদের ডাকা হয়নি। এমনকি ১০ সদস্যের পর্যালোচনা সাব কমিটিও আমাদের মতামত নেয়নি। 

তিনি জানান, একই প্রকল্পের অধীনে একই সংগঠনের করা ১২ হাজার ভিডিও ডকুমেন্টস সরকারি আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হলেও ১৪ হাজার ডকুমেন্টস মানহীনের অভিযোগে বাতিল করা ঘটনা রহস্যজনক। এর মধ্য দিয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রকল্পের অধীনে আমাদের কর্মচারীরা আর্থিক কষ্টে আছে। আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ন্যায়বিচার পেতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি, যা আদালতে বিচারাধীন আছে বলেও জানিয়েছেন আজমল কবির রাব্বি। 

২০২২ সালে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল ৮০ হাজার জীবিত বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার ও প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করা। প্রকল্পের মোট ২৭ হাজার ৪২৮টি ভিডিওর মধ্যে বিগত সরকারের আমলে ১২ হাজার ৭৮৮টি ভিডিও অনুমোদিত হয়ে ফিল্ম আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জমা দেওয়া বাকি ১৪ হাজার ৬৪০টি ভিডিওই মানহীন হিসেবে চিহ্নিত করে বাতিল করা হলো।  

একটি মহল এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা ‘ইতিহাস মুছে ফেলার’ চেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করলেও মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাখ্যান করেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অসম্পূর্ণ ও ভুল তথ্যে ভরা ভিডিও সংরক্ষণ করা ইতিহাসের জন্য আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম দায়িত্ব গ্রহণের পর নিজেই কিছু ভিডিও দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সেগুলো যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। 

উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজমের নির্দেশে ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের এক সভায় এসব সাক্ষাৎকার সংবলিত ভিডিওসহ পুরো প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। 

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত সাব কমিটির সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, পর্যালোচনা সংক্রান্ত সাব কমিটির একাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধা সদস্য কমিটির সভায় জানিয়েছেন, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রহণ করা সাক্ষাৎকার ও তৈরি করা ভিডিও মানসম্পন্ন নয়। নিম্নমানের প্রযুক্তিতে তাড়াহুড়া করে এ কাজ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধা এখনো বেঁচে আছেন, তাদের রণদিনের অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে ২০২২ সালে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ৪৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘বীরের কণ্ঠে বীরগাথা’ শিরোনামে এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের মূল লক্ষ্যসমূহ ছিল—মোট ৮০ হাজার বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্যচিত্র নির্মাণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য ৮০ হাজার ইউটিউব কনটেন্ট (আধেয়) তৈরি। এছাড়া বিশেষ পর্যায়ে ১৬টি পূর্ণাঙ্গ ডকুমেন্টারি নির্মাণ।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য ২০২৩ সালের ১৬ মে ‘ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ (এমটিআই) নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রকল্পের কাজ শেষ করার নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তবে নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মাস আগেই ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে এবং ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন কমিটির যাচাই-বাছাইয়ে গুণগত মান রক্ষা না করার প্রমাণ পাওয়ায় বর্তমানে প্রকল্পের বড় একটি অংশ বাতিলের মুখে পড়লো।