Image description

নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন।

সাক্ষাৎকার শুরুর আগে শ্রীনিবাসন বলেন, ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন থেকে মাত্র এক মাস দূরত্বে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর এটি প্রথম নির্বাচন। সেই অভ্যুত্থানে কর্তৃত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন, পালিয়ে ভারতে যান এবং সেখানেই নির্বাসনে রয়েছেন।

অর্থনীতিবিদ ও নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি বলেন, 'এই প্রশাসনের সামনে থাকা দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত কঠিন। অস্থিরতায় নিমজ্জিত একটি দেশকে প্রথমে কিছুটা শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে এনে, এরপর তাকে গণতান্ত্রিক শাসনের পথে পরিচালিত করতে হয়েছে।'

নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি, ছাত্রনেতা নিহত, গণমাধ্যমের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, এক হিন্দু ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি।

নির্বাচনের আগ মুহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে উপদেষ্টা পর্যন্ত কেউই আল জাজিরাকে সাক্ষাৎকার দিতে চাননি উল্লেখ করে শ্রীনিবাসন জানান, শেষ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে কথা বলতে সম্মত হন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।

শ্রীনিবাসন জৈনকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন শফিকুল আলম। ছবি: ভিডিও থেকে

শ্রীনিবাসন জৈন: শফিকুল আলম, আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

শফিকুল আলম: ধন্যবাদ।

শ্রীনিবাসন জৈন: শুরু করার আগে আমাদের সারা বিশ্বের দর্শকদের জন্য প্রেক্ষাপটটা একটু তুলে ধরতে চাই। সাধারণত অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে সাক্ষাৎকার নিতে চাইলে আমরা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গেই কথা বলি এবং তাকে পাওয়া যায়। কিন্তু এবার কিছুটা দ্বিধা লক্ষ্য করা গেছে। আমরা তার সঙ্গে কথা বলতে পারিনি, এমনকি কোনো মন্ত্রীকেও (উপদেষ্টা) পাওয়া কঠিন ছিল।

তাদের কারো সাক্ষাৎকার নেওয়ার বিষয়ে আপনি আমাদের সহযোগিতা করেছেন—সে জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে কি এমন কোনো উদ্বেগ আছে, যার কারণে এই অনীহা?

শফিকুল আলম: আমি সেটা মনি করি না। আমি মনে করি, তারা তাদের কাজে খুবই ব্যস্ত। তাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব এখন নির্বাচন আয়োজন করা। তারা এমন কিছু বলতে চান না, যা নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। সম্ভবত সে কারণেই তারা সংযত রয়েছেন।

সবাই নিজ নিজ কাজ নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত। এমনকি আজও টানা অনেকগুলো মিটিং আছে। এমনকি আপনিও আমাদের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং দেখেছেন সেখানকার পরিস্থিতি।

শ্রীনিবাসন জৈন: সবাই যে ব্যস্ত, তা বোঝা যায়। প্রধান উপদেষ্টার সাক্ষাৎকার না পেলেও তার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ করতে পেরেছি।

নির্বাচন নিয়ে আপনাকে প্রশ্ন করি। কেউই আশা করেনি এই যাত্রাপথ সহজ হবে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে যা ঘটেছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। মানুষ কি যুক্তিসঙ্গতভাবেই এই প্রশ্ন করতে পারে যে, সরকার কি আদৌ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে?

শফিকুল আলম: আমার মনে হয়, পারছে। কেন নয়? সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে। শুধু গত সপ্তাহেই অন্তত তিনটি বড় রাজনৈতিক সমাবেশ হয়েছে—বিশাল আয়োজন—এবং তিনটিই জনসমাগমের দিক থেকে রেকর্ড করেছে। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী সেগুলো সবার প্রত্যাশা মতোই শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছে।

শ্রীনিবাসন জৈন: তারপরও ঢাকায় প্রচারণার সময় একজন প্রভাবশালী যুবনেতাকে হত্যা করা হয়েছে, দুটি বড় গণমাধ্যম কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়েছে। এটা কি চরম আইনহীনতা নয়?

শফিকুল আলম: হামলাগুলো করেছে মব এবং সেগুলো ঠেকাতে আমরা সেনা পাঠিয়েছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত, তারা হামলা ঠেকাতে পারেনি। তারা দ্য ডেইলি স্টার ভবনে আটকে পড়া সাংবাদিকদের উদ্ধার করেছে, কিন্তু হামলা বন্ধ করতে পারেনি।

শ্রীনিবাসন জৈন: ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মবের হামলা দেখছিল। পুলিশের তেমন একটা তৎপরতা দেখা যায়নি।

শফিকুল আলম: আমরা সেখানে পুলিশ ও সেনা সদস্য পাঠিয়েছি। তারা কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলো, তা তদন্ত করা হচ্ছে।

শ্রীনিবাসন জৈন: সম্মান রেখেই বলছি—আপনি কি ঘটনার ভয়াবহতা কম করে দেখাচ্ছেন না? দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম বলেছেন, 'আমরা হত্যার যুগে প্রবেশ করেছি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা ভুলে যান—এখন প্রশ্ন হলো টিকে থাকার অধিকার নিয়ে।'

নিউ এজ সম্পাদক নুরুল কবিরকে গণমাধ্যম (দ্য ডেইলি স্টার) কার্যালয়ের বাইরে মারধর করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, 'আমি পরিষ্কারভাবে বলতে পারি—সরকারের একটি অংশ, কিংবা পুরো সরকারই এই ঘটনা ঘটতে দিয়েছে।'

শফিকুল আলম: এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। এমন অভিযোগ করার আগে তাকে প্রমাণ দিতে হবে। এটা ভিত্তিহীন কথা। যদি তিনি মনে করেন সরকারের কোনো অংশ জড়িত, তাহলে প্রমাণ দেখাক। আমরা কি পুলিশ পাঠাইনি, সেনা পাঠাইনি?

শ্রীনিবাসন জৈন: হয়তো তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে পুলিশ কার্যকর ছিল না—তারা হামলা ঠেকাতে পারেনি।

শফিকুল আলম: তাহলে তারা তদন্ত করুক, কেন পুলিশ তা ঠেকাতে পারেনি।

শ্রীনিবাসন জৈন: কিন্তু সেই ব্যাখ্যা কি সরকারের পক্ষ থেকেই আসা উচিত নয়? আপনি কি বলছেন, সরকারের ভেতরে কেউই দায়ী নয়?

শফিকুল আলম: আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। কয়েক ডজনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে যাদের শনাক্ত করা গেছে, প্রায় সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

শ্রীনিবাসন জৈন: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ার বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়মুক্তির সংস্কৃতি মোকাবিলায় ব্যর্থতার ফল হচ্ছে এই মব হামলা। এটা তো নুরুল কবির বলেননি, জাতিসংঘ বলছে।

শফিকুল আলম: আমি তার এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করি। আমাদের রেকর্ড দেখুন। আমরা ১৭ মাস ধরে ক্ষমতায় আছি। এই সময়ের অপরাধ পরিসংখ্যান পুলিশের কাছ থেকে দেখুন।

শ্রীনিবাসন জৈন: আপনি নুরুল কবিরের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করছেন, জাতিসংঘের মূল্যায়নও প্রত্যাখ্যান করছেন। অর্থাৎ, আপনি এটা অস্বীকার করছেন যে, সরকারের ভেতরে বা জোটে কোনো চরমপন্থি উপাদান আছে—যারা সরকারকে অনেকটা হাইজ্যাক করে রেখেছে—যার কারণে এসব ঘটনা ঘটছে?

শফিকুল আলম: হ্যাঁ। এটা সম্পূর্ণ আজগুবি কথা। এটি আমাদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্যাবিনেট—শিক্ষাবিদ, শীর্ষ সাবেক আমলা, অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও মানবাধিকারকর্মীদের নিয়ে গঠিত।

শ্রীনিবাসন জৈন: কেবল হামলার ঘটনাই নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগের একমাত্র কারণ নয়। আরেকটি বড় কারণ হলো, আপনাদের সরকার নিষিদ্ধ করায় আওয়ামী লীগ—শেখ হাসিনার দল—নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। এটি তো একটি বড় রাজনৈতিক দল। এটা কি বড় আকারে অগণতান্ত্রিক নয়?

শফিকুল আলম: মোটেই না। কেন হবে? তারা নিজেরাই রাজনৈতিক দল হিসেবে থাকার অধিকার হারিয়েছে। আপনি জানেন, কত মানুষ হাতে বন্দুক নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল? শুধু নিরাপত্তা বাহিনীই গুলি করেনি। আওয়ামী লীগের কর্মীরা—ছাত্রলীগ, যুবলীগ—তাদের হাতেও বন্দুক ছিল। তার মধ্যে কিছু আগ্নেয়াস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনীর কাছ থেকেই এসেছে। তারা মানুষ হত্যা করেছে।

শ্রীনিবাসন জৈন: ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে। এটা নিয়ে দুই দেশের উত্তেজনা কতটা গুরুতর?

শফিকুল আলম: আমি এখানে সংকট দেখি না। আমরা দেখেছি, ২০২৪ সালের আগস্টের পর ভারতীয় মিডিয়া মিথ্যা তথ্যের বন্যা বইয়ে দিয়েছে। তারা একটি ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছে যে, বাংলাদেশে সহিংস ইসলামপন্থীরা ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে।

শ্রীনিবাসন জৈন: বাংলাদেশের অনুরোধের পরও ভারত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ করতে রাজি হচ্ছে না—আমি এই বিষয় নিয়ে জানতে চাইছি।

শফিকুল আলম: আমাদের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি আছে। আমরা আনুষ্ঠানিক নোট পাঠিয়েছি। তিনি (হাসিনা) দণ্ডিত হলে আমরা আবারও নোট পাঠাবো। আমরা নিশ্চিত, ভারত হাসিনাকে ফেরত পাঠাবে। তিনি একজন গণহত্যাকারী।

শ্রীনিবাসন জৈন: আপনি এটাকে সংকট বলছেন না, কিন্তু আপনার সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, ভারতে মাটিতে বসে শেখ হাসিনা তার সমর্থকদের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে। এটা অনেক বড় অভিযোগ এবং ভারত বলেছে, তিনি এমন কোনো বিবৃতি দেননি।

শফিকুল আলম: এটা সত্য। তার সমর্থকই প্রকাশ্য দিবালোকে শরীফ ওসমান হাদীকে হত্যা করেছে।

শ্রীনিবাসন জৈন: হাসিনা তার সমর্থকদের নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রম করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছে—এটার প্রমাণ কোথায়?

শফিকুল আলম: অডিও বার্তায় তিনি যেসব বার্তা দিচ্ছে, দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করছে—সেগুলো আমরা পরীক্ষা করেছি। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সবসময় সেগুলো নজরে রাখছে। আমরা এগুলো দেখতে পাচ্ছি। এর অনেকগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আছে।

শ্রীনিবাসন জৈন: আপনি আশাবাদী যে ভারত হাসিনা ফেরত পাঠাবে। যদি তা না করে?

শফিকুল আলম: আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্র, আমাদের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। আমি মনে করি এবং আমরা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী যে তাকে ফেরত পাঠানো হবে।

শ্রীনিবাসন জৈন: এই নির্বাচন ড. ইউনূসের পরীক্ষার শেষ অধ্যায়। তিনি কি সবমিলিয়ে দায়িত্ব সামলাতে পেরেছেন?

শফিকুল আলম: তিনি অসাধারণ কাজ করেছেন। ইতিহাস তার প্রতি সদয় হবে। তিনি ও তার সরকার একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি সামলেছেন। একটি গণঅভ্যুত্থান হয়েছে এবং মানুষ ক্ষিপ্ত। তিনি সবাইকে শান্ত করে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পেরেছেন। এটা খুবই কঠিন সময়। তিনি কতটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি ছিলেন, সেটা মানুষ দেখেনি।

আমাদের রেকর্ড কথা বলবে—অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন হয়েছে, শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা হয়েছে, আমরা নতুন পররাষ্ট্রনীতি নিয়েছি, গৌরবের সঙ্গে আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরছি। তিনি (ড. ইউনূস) নতুন বাংলাদেশ গড়ার জন্য সবকিছু করেছেন।

শ্রীনিবাসন জৈন: ইতিহাস তার প্রতি সদয় হবে বলেছেন—আমরা এটা দেখার অপেক্ষায় থাকব।

শফিকুল আলম: আরেকটি বিষয় দেখুন, গত ১৭ মাসে তার গ্রহণযোগ্যতা কিন্তু কখনো ৭০ শতাংশের নিচে নামেনি। একবারও না।

শ্রীনিবাসন জৈন: মিস্টার আলম, আপনাকে ধন্যবাদ।

শফিকুল আলম: ধন্যবাদ।