দুর্বল ও অপরিকল্পিত কর কাঠামোর কারণে বিশ্বজুড়ে চিনিযুক্ত পানীয় ও অ্যালকোহল ক্রমেই সস্তা হয়ে উঠছে। এর ফলে বিশেষত শিশু ও তরুণদের মধ্যে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ, ক্যানসার এবং আঘাতজনিত ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করে দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) প্রকাশিত দুটি বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে চিনিযুক্ত পানীয় ও অ্যালকোহলজাত পণ্যের ওপর কর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো এবং কর কাঠামো পুনর্গঠনের। সংস্থাটি বলছে, দুর্বল করব্যবস্থার সুযোগে স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর পণ্যগুলো সাশ্রয়ীই থেকে যাচ্ছে, অথচ প্রতিরোধযোগ্য অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) ও আঘাতজনিত সমস্যার কারণে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস বলেন, “জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও রোগ প্রতিরোধে আমাদের হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ারগুলোর একটি হলো ‘স্বাস্থ্যকর’ বা হেলথ ট্যাক্স। তামাক, চিনিযুক্ত পানীয় ও মদের (অ্যালকোহল) মতো পণ্যে কর বাড়িয়ে সরকার একদিকে যেমন ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার কমাতে পারে, অন্যদিকে তেমনি জনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে।”
সংস্থাটির মতে, বিশ্ববাজার থেকে চিনিযুক্ত পানীয় এবং মদ্যপণ্যে কোটি কোটি ডলার মুনাফা অর্জিত হলেও সরকারগুলো ‘স্বাস্থ্য-কেন্দ্রিক কর’ থেকে এর খুব সামান্য অংশই পায়। যার ফলে সমাজকে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং এর অর্থনৈতিক ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হচ্ছে।
চিনিযুক্ত পানীয়: কর থাকলেও প্রভাব দুর্বল
প্রতিবেদন অনুসারে, বর্তমানে অন্তত ১১৬টি দেশে চিনিযুক্ত পানীয়ের ওপর বিশেষ উৎপাদন কর (এক্সাইজ ট্যাক্স) চালু রয়েছে। যদিও বেশিরভাগ দেশই কার্বোনেটেড কোমল পানীয় (৯৮%), এনার্জি ও স্পোর্টস ড্রিংকস (৯৭%) এবং চিনিযুক্ত নন-কার্বোনেটেড পানীয়ের (৯৪%) ওপর কর আরোপ করে, তবে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পণ্যের ক্ষেত্রে এই করের আওতা নাটকীয়ভাবে কমে আসে।
বিশ্বের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক দেশ তৈরি চা বা কফির ওপর কর আরোপ করে, দুই-তৃতীয়াংশের কম দেশে সিরাপ বা ঘন মিশ্রণ (কনসেনট্রেট) করের আওতায় রয়েছে এবং প্রায় ৪৬ শতাংশ দেশ শতভাগ ফলের রসের ওপর বিশেষ উৎপাদন কর বসায়। বৈশ্বিক পর্যায়ে চিনিযুক্ত দুধজাতীয় পানীয় এবং উদ্ভিদজাত বিকল্প পানীয়গুলো করের আওতার বাইরে থাকার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে।
এতসব দেশ কর আরোপ করলেও দেখা গেছে যে, একটি সাধারণ চিনিযুক্ত সোডার খুচরা মূল্যের ওপর করের হার মাত্র ২ শতাংশ; যা ব্যবহার কমানোর জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এছাড়া খুব কম দেশই এই করকে মূল্যস্ফীতির সাথে সমন্বয় করে, যার ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চিনিযুক্ত পানীয়গুলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসছে এবং আরও সস্তা হয়ে পড়ছে।
মদ আরও সস্তা হচ্ছে
মদ্যপ পানীয়ের কর সংক্রান্ত পৃথক এক প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, অন্তত ১৬৭টি দেশ অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়ের ওপর কর আরোপ করে, আর ১২টি দেশে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও, ২০২২ সাল থেকে অধিকাংশ দেশে অ্যালকোহল বা মদ্যপ পানীয় আরও সস্তা হয়েছে অথবা এর দাম অপরিবর্তিত রয়েছে; কারণ আরোপিত করের হার মূল্যস্ফীতি ও মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
এদিকে অ্যালকোহলভেদেও রয়েছে করের ব্যাপক বৈষম্য। বিশ্বের অনেক দেশে বিয়ার ও স্পিরিটে কর থাকলেও করমুক্ত রয়ে গেছে ওয়াইন। বিশ্বজুড়ে বিয়ারে ১৪ শতাংশ এবং স্পিরিটে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ কর থাকলেও অন্তত ২৫টি দেশে ওয়াইনের ওপর কোনও কর ধার্য করা নেই।
ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘হেলথ ডিটারমিন্যান্টস, প্রমোশন অ্যান্ড প্রিভেনশন’ বিভাগের পরিচালক ড. এতিয়েন ক্রুগ বলেন, “সহজলভ্য মদ সহিংসতা, দুর্ঘটনা এবং রোগব্যাধিকে উসকে দেয়।” তিনি আরও বলেন, “যখন সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো মুনাফা করে, সাধারণ মানুষ তখন তার স্বাস্থ্যগত কুফল ভোগ করে এবং এর অর্থনৈতিক মাশুল গুনতে হয় পুরো সমাজকে।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বাংলাদেশ
চিনিযুক্ত পানীয় নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের শীর্ষ ছয় দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চিনিযুক্ত পানীয়ের কর সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ সব ধরনের চিনিযুক্ত পানীয়ের ওপর কর আরোপ করলেও সাধারণ বোতলজাত পানিকে করমুক্ত রেখে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
নীতিমালার ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ করার জন্য বার্বাডোস, আইভরি কোস্ট, গ্যাবন, নাইজার এবং টোগোর পাশাপাশি বাংলাদেশকেও প্রশংসা করেছে সংস্থাটি। কারণ কার্বোনেটেড ও নন-কার্বোনেটেড চিনিযুক্ত পানীয়, এনার্জি ড্রিংকস, ফ্রুট ড্রিংকস, সিরাপ ও ঘন মিশ্রণ (কনসেনট্রেট), প্রস্তুতকৃত চা-কফি এবং চিনিযুক্ত দুধজাতীয় পানীয়কেও করের আওতায় এনেছে বাংলাদেশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বজুড়ে অনেক দেশ ফলের রস এবং দুধজাতীয় পানীয়ের মতো পণ্যগুলোকে বিশেষ উৎপাদন করের বাইরে রাখে, যা ভোক্তাদের বিকল্প ক্ষতিকর পণ্য বেছে নেওয়ার সুযোগ করে দেয় এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর করের ইতিবাচক প্রভাবকে দুর্বল করে। তবে পণ্যের ব্যাপক আওতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই ধরনের সীমাবদ্ধতাগুলো অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে।
তবে অ্যালকোহল কর সংক্রান্ত প্রতিবেদনে পর্যাপ্ত দাম ও কর সংক্রান্ত তথ্য ঘাটতির কারণে বিয়ার বা স্পিরিটের বৈশ্বিক করের হিসাবের তালিকায় বাংলাদেশের নাম আসেনি। এটি মূলত পর্যবেক্ষণ এবং স্বচ্ছতার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে বলে মনে করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। নিয়মিত মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় না করায় বাংলাদেশে স্বাস্থ্যকরের প্রভাব ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
‘স্বাস্থ্যকরের’ পক্ষে নাগরিক সমাজ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ‘এনসিডি অ্যালায়েন্স’ বলছে, জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং রোগ প্রতিরোধে ‘স্বাস্থ্যকরের’ কোনও বিকল্প নেই। সংস্থাটির পলিসি এবং অ্যাডভোকেসি ডিরেক্টর অ্যালিসন কক্স বলেন, “এই করের মাধ্যমে তিনটি বড় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব— জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, সরকারি কোষাগার শক্তিশালী করা এবং ভবিষ্যতে রোগব্যাধির পেছনে বিশাল ব্যয়ের বোঝা কমানো।”
কক্সের মতে, তামাক ও পানীয় কোম্পানিগুলোর প্রভাবেই ২০২৫ সালের জাতিসংঘ ঘোষণায় ‘স্বাস্থ্যকর’ নিয়ে বাধার সৃষ্টি হয়েছে। তথাকথিত ‘সার্বভৌমত্বের’ যুক্তি আসলে এক ধরণের অজুহাত। বাস্তবতা হলো, স্বাস্থ্যকর আরোপ করলে দেশের নিজস্ব আয় বাড়ে এবং বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমে, যা একটি দেশের সার্বভৌমত্বকে আরও সুসংহত করে।
তিনি মনে করেন, বড় বড় বৈশ্বিক সভার চেয়ে নিজের দেশে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘৩ বাই ৩৫’ উদ্যোগ
২০৩৫ সালের মধ্যে তামাক, মদ ও কোমল পানীয়ের দাম বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চালু করেছে ‘৩ বাই ৩৫’ কর্মসূচি। এর উদ্দেশ্য হলো ক্ষতিকর পণ্যের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে অসংক্রামক ব্যাধি ও আঘাতজনিত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ড. টেড্রোসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ভার্চ্যুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এসব ফলাফল তুলে ধরা হয়। সেখানে জরায়ুমুখ ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধ ও ডব্লিউএইচওর সার্ভিক্যাল ক্যানসার নির্মূল উদ্যোগের অগ্রগতির কথাও জানানো হয়।
জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতি রক্ষায় ‘স্বাস্থ্যকর’ কার্যকর করার আহ্বান জানিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, “এই কর একদিকে যেমন ক্ষতিকর অভ্যাস কমাবে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ কমিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করবে।” সংস্থাটি সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, প্রমাণকে নীতিতে রূপ দিতে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রদর্শনের।