মিয়ানমারে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী মুসলমানদের বিরুদ্ধে চালানো গণহত্যা মামলার বিচার শুরু করেছে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। এক দশক পর গতকাল ঐতিহাসিক ওই মামলার পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু হয়েছে। গণহত্যায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অভিযুক্ত। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।
এতে বলা হয়, নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আইসিজেতে শুরু হওয়া বিচার টানা তিন সপ্তাহব্যাপী চলবে। শুনানিতে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী দাউদা জালো বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার লক্ষ্যেই অভিযান চালিয়েছে। তিনি বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনের জটিল তাত্ত্বিক বিষয় নয়। এটি বাস্তব মানুষ, বাস্তব গল্প এবং একটি বাস্তব জনগোষ্ঠী মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নিয়ে। তাদের ধ্বংসের লক্ষ্যেই আঘাত করা হয়েছে।
২০১৯ সালে গাম্বিয়া আইসিজেতে এই মামলা করে। এর দুই বছর আগে, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা নিজ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন, যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। শরণার্থীরা সে সময় গণহত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান।
এক দশকেরও বেশি সময় পর আইসিজেতে পূর্ণাঙ্গভাবে নেয়া এটিই প্রথম কোনো গণহত্যা মামলা। তিন সপ্তাহব্যাপী এই শুনানির রায় শুধু মিয়ানমারের ক্ষেত্রেই নয়, ভবিষ্যতে অন্যান্য গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এর আগে জাতিসংঘের একটি তদন্ত মিশন ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দেয়। তবে মিয়ানমার সরকার সেই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে দাবি করে, এটি ছিল রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার জবাবে চালানো বৈধ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান।
জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার প্রধান নিকোলাস কৌমজিয়ান বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, এই মামলাটি গণহত্যার সংজ্ঞা, তা প্রমাণের উপায় এবং প্রতিকারের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
শরণার্থী শিবিরে নতুন আশার সঞ্চার: কক্সবাজারে আশ্রয়রত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এই মামলার মাধ্যমে ন্যায়বিচারের আশায় বুক বাঁধছেন। দুই সন্তানের মা ৩৭ বছর বয়সী জানিফা বেগম বলেন, আমরা ন্যায়বিচার ও শান্তি চাই। সেনা অভিযানের সময় আমাদের নারীরা তাদের মর্যাদা হারিয়েছে। গ্রাম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে, পুরুষদের হত্যা করা হয়েছে, নারীরা ব্যাপক সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
অনেকে বলেন, আইসিজের রায় কার্যকর করার সরাসরি ক্ষমতা না থাকলেও এই মামলা তাদের জন্য বাস্তব পরিবর্তনের পথ খুলে দিতে পারে। ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার সদস্য ও সাবেক শিক্ষক মোহাম্মদ সাঈদ উল্লাহ বলেন, এই আদালত আমাদের গভীর ক্ষত কিছুটা হলেও প্রশমিত করবে বলে আশা করি। অপরাধীদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ন্যায়সঙ্গত ও দ্রুত বিচার হলে প্রত্যাবাসনের পথও খুলতে পারে।
মিয়ানমারের উইমেনস পিস নেটওয়ার্কের প্রধান ওয়াই ওয়াই নু বলেন, এই বিচার শুরু হওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন আশার আলো। তিনি বলেন, দশকের পর দশক ধরে চলা নিপীড়নের অবসান ঘটাতে বিশ্বকে অবশ্যই ন্যায়বিচারের পক্ষে দৃঢ় থাকতে হবে।
এই শুনানির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের কথা কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে শোনা হবে। তবে সংবেদনশীলতা ও গোপনীয়তার কারণে এসব শুনানি গণমাধ্যম ও জনসাধারণের জন্য বন্ধ থাকবে।
লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইড (এলএডব্লিউ) এক বিবৃতিতে বলেছে, আইসিজে যদি গণহত্যা সনদের আওতায় মিয়ানমারকে দায়ী করে, তবে তা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণহত্যার জন্য জবাবদিহির ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হবে।
আইসিসিতে আলাদা মামলা: ২০১৯ সালের প্রাথমিক শুনানিতে মিয়ানমারের তৎকালীন নেতা অং সান সুচি গাম্বিয়ার অভিযোগকে অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। এর পর থেকে দেশটি চরম অস্থিতিশীলতায় নিমজ্জিত।
বর্তমানে সামরিক জান্তা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করলেও, অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত বিরোধী ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি) আইসিজের এখতিয়ার মেনে নিয়েছে এবং আগের সব আপত্তি প্রত্যাহার করেছে। তারা স্বীকার করেছে, অতীত সরকারের ব্যর্থতার কারণেই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং রোহিঙ্গা নামটিও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এদিকে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) পৃথক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। তার বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বিতাড়ন ও নিপীড়নের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন আরও জোরদার করেছে। এর মধ্যেই মিয়ানমারে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে, যা জাতিসংঘ, পশ্চিমা দেশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে স্বাধীন ও সুষ্ঠু নয়।