Image description

জুমার নামাজ পড়ে বের হওয়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক শিক্ষার্থীকে আটক করে নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরির সংশ্লিষ্টতা দেখিয়ে মামলা দিয়েছে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ। গত শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) বেলা পৌনে ২টার দিকে আটকের পর বর্তমানে কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন তিনি। রাজধানীর উত্তরা ৭ নং সেক্টর জামে মসজিদের সামনে থেকে তিনি আটক হন।

গ্রেপ্তার ঢাবি ছাত্রের নাম সাদ ইবনে মাহবুব। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেক্ট্রনিক্স অ্যান্ড ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। শনিবার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিয়ে ঢাকার সিএমএম আদালতে চালান দিলে তাকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের অভিযানের সময়কার পাঞ্জাবি পরিহিত এক যুবকের ছবি দেখিয়ে সাদকে আটক করা হলেও তিনি ওই সময়ে শার্ট-প্যান্ট পরা ছিলেন। থানায় তোলা ছবিতেও তাকে শার্ট-প্যান্ট পরা অবস্থায় দেখা গেছে।

সাদ ইবনে মাহবুবের বাবা মাহবুবুল হক বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক। তিনি উত্তরার দক্ষিণখান থানার ফায়দাবাদ এলাকার বাসিন্দা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে সাদ ঢাকার নটরডেম কলেজ ও মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এমআইএসটি) পড়েছেন।


জানা গেছে, শুক্রবার জুমার নামাজের পর মসজিদের সামনে নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরিরের সদস্যরা লিফলেট বিতরণ করছিলেন। এ সময় সেখানে পুলিশ অভিযান চালালে আটক হন সাদ। তার পরিবারের অভিযোগ, মসজিদের পাশে একটি বাসায় টিউশন পড়ান সাদ। সে সূত্রে তিনি ওই মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন। বের হওয়ার পর পুলিশি অভিযানের মুখে পড়লে আরও দুজনের সঙ্গে তাকেও আটক করা হয়।

উত্তরা পশ্চিম থানায় শুক্রবার দায়ের হওয়া মামলার বিবরণ থেকে জানা গেছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ এর ৮, ৯, ১০, ১২ ও ১৩ ধারায় দায়েরকৃত মামলাটিতে গ্রেপ্তার হয়েছেন তিনজন। এ ছাড়া আরও অজ্ঞাত ১৫-১৬ জনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে মামলায়। সাদ ছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া অপর দুই আসামী হলেন— ঢাকার দক্ষিণখান থানার বায়তুল মামুন মসজিদ এলাকার মোসলেহ উদ্দিনের ছেলে শাকিল আহাম্মদ (৩০) ও খিলক্ষেত নামাপাড়া এলাকার নুুরুল আমিনের ছেলে কাওছার হোসেন (১৯)। এই মামলার বাদী উত্তরা পশ্চিম থানার উপপুলিশ পরিদর্শক (এসআই) মো. মনিরুজ্জামান।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রাক্কালে কোটা সংস্কার আন্দোলনে সাদের অংশ নেওয়ার দৃশ্য
আদালত সূত্রে জানা গেছে, শনিবার বিকেলে সাদসহ আরো দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. কামরুল ইসলাম তাদের কারাগারে রাখার আবেদন করেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জামিন চেয়ে আবেদন করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিলরুবা আফরোজ তিথি জামিন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।


মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, উত্তরা ৭ নং সেক্টর জামে মসজিদের সামনে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন হিজবুত তাহরির সদস্যরা বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার জন্য জনসাধারণের ভিতর আতঙ্ক সৃষ্টি ও উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচারের জন্য একটি ব্যানার টানিয়ে মাইক দিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে সঙ্গীয় অফিসার ও ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে আসামীদের বেলা ১টা ৪৫ মিনিটে আটক করি। এ সময় অজ্ঞাতনামা আসামীরা কৌশলে পালিয়ে যায়। আটক আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তারা জানায় যে, তারা নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন হিজবুত তাহরিরের সক্রিয় সদস্য এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার জন্য এবং জনসাধারণের ভিতর আতঙ্ক সৃষ্টি, ধর্মীয় উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যমে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ও নাশকতা ঘটানোর উদ্দেশ্যে ব্যানার টানিয়ে কোমল হৃদয়ের মানুষদের উদ্বুদ্ধ করছে। আমি অফিসার ও ফোর্সদের সহায়তায় আসামীদের হেফাজতে নেই।

মাঝে মাঝেই বন্ধুদের সঙ্গে সাইক্লিংয়ে যেতেন সাদ ইবনে মাহবুব — ফেসবুক থেকে নেওয়া
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, হিজবুত তাহরিরের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের নির্দেশে তারা ব্যানার টানিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে অন্যান্য সদস্যসহ কোমল হৃদয়ের মানুষদের উদ্বুদ্ধ করে। আটক আসামীরাসহ পলাতক অজ্ঞাতনামা আসামীদের সহায়তায় সরকারঘোষিত নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরির সদস্যরা পরস্পর যোগসাজসে সংগঠনের সদস্যপদ ও সমর্থন, অপরাধ সংগঠনের ষড়যন্ত্রসহ প্রচেষ্টা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্ররোচনাসহ সহায়তা করে সন্ত্রাস বিরোধী আইন-২০০৯ এর ৮, ৯, ১০, ১২ ও ১৩ ধারায় অপরাধ করেছে।

মামলার জব্দ তালিকায় রয়েছে একটি পিভিসি ব্যানার, যার গায়ে ‘US Aggression on Venezuela: The Imminent KHILAFAH will Resist the Global Aggression of the USA, Hizb ut Tahrir, Wilayah Bangladesh লেখা রয়েছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার শাকিল আহাম্মদের হেফাজত থেকে ‘গাজা থেকে ভেনিজুয়েলা, খিলাফতই ফয়সালা’ লেখা একটি কাগজের তৈরি প্ল্যাকার্ড ও একটি স্যামসাং এম৫১, সাদ ইবনে মাহবুবের হেফাজত থেকে ‘মার্কিন আগ্রাসন, খিলাফতই সমাধান’ লেখা একটি কাগজের তৈরি প্ল্যাকার্ড ও একটি আইফোন ১১ এবং কাওছার হোসেনের হেফাজত থেকে ‘NO TRUMP NO AMERICA ONLY KHALIFAH IS THE RIGHTOUS LEDERSHIP FOR HUMANITY’ লেখা কাগজের তৈরি একটি প্ল্যাকার্ড ও একটি রেডমি ১২ মোবাইল ফোন জব্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।


সাদ ইবনে মাহবুবের বাবা মাহবুবুল হক অভিযোগ করে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সে (সাদ) ওখানে নামাজ পড়তে গেছিল। মসজিদের পাশে সে ছাত্র পড়ায়। ওখানে হিজবুত তাহরিরের সদস্যরা লিফলেট বিতরণ করছিল। নামাজ পড়ে বের হওয়ার পর হয়ত সে দাঁড়িয়েছিল কী হচ্ছে দেখতে। এ সময় সিভিল ড্রেসে পুলিশ ধরে নিয়ে আসছে।

তিনি বলেন, শুক্রবার সন্ধ্যায় থানায় গিয়ে অনেকক্ষণ পরে ওসির দেখা পাই। আমরা ওসিকে বিষয়টা বলার পর তিনি একটা ছবি দেখালেন। ছবিতে যাকে দেখাচ্ছে, সে পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা। আমরা বললাম যে ছবির ছেলে তো পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা, আর যাকে ধরে এনেছেন সে শার্ট পরা। সে এখনও লকআপেই আছে, তার পোশাক চেঞ্জ করার সুযোগ নাই। এই ছেলে সে ছেলে হয় কিভাবে?

সাদের বাবার অভিযোগ, গ্রেপ্তারের আগে তোলা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত ছেলের ছবিটি দেখিয়ে সাদকে হিজবুত তাহরির প্রমাণ করেছে পুলিশ, যেখানে তাকে আটকের পর থানায় তোলা ছবিতেও শার্ট-প্যান্ট পরা অবস্থায় দেখা গেছে
‘কয়, সে ছেলে যদি না হয়ে থাকে, তাইলে পরে..। আমি উপরের নির্দেশে ধইরা দিছি, আমি আর ছাড়তে পারব না। উপরের নির্দেশে মামলা দিতে হবে। আপনারা কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে নিবেন। আমি বললাম যে জামিন নেওয়া তো অত সহজ না। একটা ছাত্রের জীবন নষ্ট করার উদ্যোগ কি ঠিক হচ্ছে? কয় আমি পারব না’— ওসির সঙ্গে কথোপকথনের বিবরণ দিয়ে বলেন সাদের বাবা।

ছেলে কোনো ধরনের সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নয় জানিয়ে তিনি বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠন দূরে থাক, অন্য কোনো সংগঠনের সঙ্গেও তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই। সে জুলাই আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিল। মীর মুগ্ধ যেদিন মারা গেল, সেদিন তারা উত্তরার বিএনএস সেন্টারের দিকেই ছিল। শুধু সে না, আমার তিন ছেলেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছে।

সাদ ছাড়াও অপর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে পড়াশোনা করছেন বলেও জানিয়েছেন মাহবুবুল হক। তিনি বলেন, আমার তিন ছেলে, দুই মেয়ে। বড় মেয়ে একটা বেসরকারি ডেন্টাল কলেজে পড়ে। সাদ মেজ। অন্য ছেলেদের একজন মাইলস্টোনে এবং আরেকজন রাজউকে পড়ে।

জানতে চাইলে মামলার বাদী এসআই মনিরুজ্জামান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ওখানে হিজবুত তাহরিরের যে সমাবেশ হচ্ছিল, আমরা সেখানে যাওয়ার পরে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে দৌড়ে পালাতে যায়। এ সময় আমরা তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছি। সাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার হাতে বিভিন্ন লেখা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড ছিল।

সাদ ইবনে মাহবুবের বাবার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী রফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, তারা তো আসামীদের পক্ষ নিবেই। আমরা তাকে হাতে-নাতে ধরেছি, আমরা তদন্ত করে পরবর্তী ব্যবস্থা নিব। উনারা অনেকভাবে চেষ্টা করছিল এসে ছুটিয়ে নিয়ে যাবে। হিজবুত তাহরির তো গত ২০ বছর ধরে নিষিদ্ধ। এরা চেষ্টা করছিল বিভিন্ন ট্যাগ লাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু হাতে-নাতে ধরেছি, এটার সুযোগ তো নাই। ওর হাতে লিফলেট ছিল।

তিনি বলেন, উনাদের ডাউট থাকতেই পারে। সেটাও আমরা মাথায় রেখেই কাজ করব। যদি কোন সংশ্লিষ্টতা না থাকে, তাহলে আমরা ওইভাবে তদন্ত করব, অসুবিধা নাই। বিষয়গুলো আমরা তদন্তে আনব। পাঞ্জাবি পরা পোশাক দেখানোর অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো বিভ্রান্তিকর তথ্য।