দেশ জুড়ে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তবে ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত সকল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও যুদ্ধজাহাজকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে ইসরাইলি সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের শঙ্কায় তেল আবিব সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ রোববার সংসদে বলেন, কোনো ভুল হিসাব যেন না করা হয়। ইরানের ওপর আঘাত এলে দখলদার ভূখণ্ড (ইসরাইল) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সকল ঘাঁটি ও জাহাজ আমাদের বৈধ লক্ষ্য হবে। সাবেক রেভ্যুলুশনারি গার্ডস কমান্ডার কালিবাফ এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দিলেন যে, যেকোনো সামরিক হস্তক্ষেপের কঠোর জবাব দেবে তেহরান।
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। প্রথমে তীব্র মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে শুরু হলেও দ্রুত তা ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার বিরোধিতায় পরিণত হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামপ্রতিক দিনগুলোতে একাধিকবার ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ না করতে ইরানি নেতৃত্বকে সতর্ক করেছেন। শনিবার তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দিতে প্রস্তুত। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে ওয়াশিংটনের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানে হামলার নানা দিক নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবহিত করা হয়েছে। যদিও ট্রাম্প নির্দিষ্ট কোনো মতামত দেননি।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, চলমান সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১১৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে অধিকাংশই বিক্ষোভকারী, তবে নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৩৭ সদস্যও নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এদিকে বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত শতাধিক নিরাপত্তা বাহিনী নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন রোববার জানিয়েছে, সামপ্রতিক সহিংসতায় মধ্যাঞ্চলীয় ইসফাহান প্রদেশে ৩০ জন এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় কেরমানশাহে আরও ছয়জন পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। আধা-রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশ জুড়ে চলমান বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত মোট ১০৯ জন নিরাপত্তা কর্মকর্তা প্রাণ হারিয়েছেন।
ইসরাইলের তিনটি নিরাপত্তা সূত্র জানায়, সপ্তাহান্তে উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা বৈঠকের পর দেশটি হাই অ্যালার্টে রয়েছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। ইসরাইলি সরকারের এক মুখপাত্র মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, আর সামরিক বাহিনীও কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
উল্লেখ্য, গত বছরের জুনে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধ হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইরানে বিমান হামলা চালায়। ওই হামলার জবাবে ইরান কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
বিক্ষোভ দমনে কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার থেকে দেশ জুড়ে ইন্টারনেট কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, জাতীয় সংযোগ স্বাভাবিকের মাত্র ১ শতাংশে নেমে এসেছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে শনিবার রাতে তেহরানের পুনাক এলাকায় বিপুল মানুষের জমায়েত দেখা যায়। সেখানে বিক্ষোভকারীরা সেতুর রেলিং ও ধাতব বস্তুতে তাল মিলিয়ে আঘাত করছিলেন। যা প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রয়টার্স ভিডিওটির অবস্থান যাচাই করেছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর গাচসারান ও ইয়াসুজে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজা ও দাফনের দৃশ্য সমপ্রচার করা হয়েছে। তবে মোট কতোজন নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে সরকারিভাবে কিছু জানানো হয়নি। রাষ্ট্রীয় টিভি জানায়, ইসফাহানে ৩০ জন নিরাপত্তা সদস্যকে দাফন করা হবে এবং পশ্চিমাঞ্চলীয় কেরমানশাহে ‘দাঙ্গাবাজদের’ হামলায় ছয়জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া মাশহাদে একটি মসজিদে অগ্নিসংযোগের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাবাজ’ আখ্যা দেয়া হয়েছে। রেভ্যুলুশনারি গার্ডস জানিয়েছে, “সন্ত্রাসীরা” নিরাপত্তা স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ইরানের পুলিশপ্রধান আহমাদ-রেজা রাদান বলেন, ‘দাঙ্গাবাজদের’ মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনী তাদের তৎপরতা আরও জোরদার করেছে।
এর আগেও ইরানের শাসকগোষ্ঠী একাধিকবার বিক্ষোভ দমন করেছে। সর্বশেষ ২০২২ সালে পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক মায়েশা আমিনির হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় দেশ জুড়ে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল।