Image description

বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসন। পাঁচটি বড় নদী ঘেরা একটি সংসদীয় এলাকা। চর, খেয়া আর নৌপথই এখানে যাতায়াতের ভরসা। এমন ভৌগোলিক বাস্তবতায় নির্বাচন মানেই বাড়তি খরচ।

নৌকা ভাড়া থেকে শুরু করে চরাঞ্চলে রাতযাপন, কর্মী পরিবহন, পথসভা ও বড় জমায়েত- সব মিলিয়ে প্রচারণার অঙ্ক দ্রুত ফুলে ওঠে। সেই ব্যয়ের হিসাব ঘিরেই এবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে এ আসনের নির্বাচন। 

আলোচনার কেন্দ্রে এবি পার্টির প্রার্থী মো. আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া, যিনি ব্যারিষ্টার ফুয়াদ নামে পরিচিত। রবিবার (৪ জানুয়ারি) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া ভিডিও বার্তায় তিনি ভোটারদের কাছে আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছেন।

ফুয়াদের বক্তব্য, পাঁচটি বড় নদীঘেরা প্রত‍্যন্ত এই জনপদে মানুষের কাছে পৌঁছানো সহজ নয়। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জুলাই সনদের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যে লড়াই শুরু হয়েছে, তা তিনি ‘জনতার শক্তিতেই’ এগিয়ে নিতে চান। তাঁর ভাষায়, এটি ‘জনতার টাকায় জনমুখী রাজনীতি’।

এই আসনে ফুয়াদকে সমর্থন দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

ফলে দলটি আলাদা কোনো প্রার্থী দেয়নি। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সমর্থনে তাঁর প্রচারের বিস্তার ঘটেছে। তবে বরিশাল-৩ আসনের বাস্তবতা একই রয়ে গেছে। বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল, বিচ্ছিন্ন গ্রাম আর নৌপথনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা নির্বাচনী প্রচারকে সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল করে তোলে।

এই বাস্তবতায় ফুয়াদ প্রচারের বড় ভরকেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

ফেসবুক, ইউটিউব ও টিভি টকশোর ভিডিওতে নিয়মিত উপস্থিত থেকে তিনি ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে সেখানেই সরাসরি আর্থিক সহযোগিতার ডাক দিচ্ছেন। কিন্তু এখানেই সৃষ্টি হচ্ছে দ্বন্দ্ব। 

রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিল করা হলফনামা অনুযায়ী, ফুয়াদের বার্ষিক আয় সাত লাখ ৪১ হাজার ৬০২ টাকা। এর মধ্যে আইনজীবী হিসেবে চেম্বার থেকে আয় চার লাখ ১০ হাজার টাকা। টিভি টকশো, ইউটিউব ও ফেসবুক থেকে আয় দেখানো হয়েছে তিন লাখ ২৬ হাজার টাকা। তাঁর নিজের কাছে নগদ রয়েছে দুই লাখ টাকা। ব্যাংকে তাঁর নামে সাড়ে তিন লাখ টাকা এবং স্ত্রীর নামে জমা আছে ১৮ হাজার টাকা। স্ত্রীর হাতে নগদ আছে আরও ৫০ হাজার টাকা।

ভোটের অঙ্ক ৩১ লাখ
বরিশাল-৩ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ১০ হাজার ৯২ জন। নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী, জনপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা হিসেবে একজন প্রার্থী এখানে সর্বোচ্চ ৩১ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্বাচনী ব্যয় করতে পারবেন। কিন্তু ফুয়াদের ঘোষিত নগদ অর্থ ও ব্যাংক জমা মিলিয়ে মোট অর্থ প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা। স্ত্রীর নামে রয়েছে আরও ৬৮ হাজার টাকা। ঘোষিত আর্থিক সামর্থ্য আর অনুমোদিত সর্বোচ্চ ব্যয়ের সীমার মধ্যে ফারাক স্পষ্ট।

এদিকে, এবি পার্টির ফুয়াদ, গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী ইয়ামিন এইচ এম ফারদিন, জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু এবং এলডিপি জোটের জাতীয় পার্টির প্রার্থী ফকরুল আহসানের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে নির্বাচনী ব্যয়সংক্রান্ত তথ্য যুক্ত করেননি।

অন্যদিকে, কয়েকজন প্রার্থী তাঁদের ব্যয়ের সম্ভব্য হিসাব প্রকাশ করেছেন। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জয়নুল আবেদীন জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ২৫ লাখ টাকা নির্বাচনী ব্যয় করবেন। জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেনের ব্যয় ২০ লাখ টাকা। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, শিক্ষকতা পেশা থেকে অর্জিত অর্থের মধ্য থেকে দুই লাখ টাকা ব্যয় করবেন। পাশাপাশি দলের দুই উপজেলা শাখার কর্মী ও সমর্থকদের কাছ থেকে স্বেচ্ছায় প্রণোদিত দান হিসেবে আরো চার লাখ টাকা সংগ্রহের কথা বলেছেন তিনি।

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর প্রার্থী আজমুল হাসান জিহাদ জানান, স্বাধীন গবেষক হিসেবে উপার্জিত অর্থ থেকে তিনি সাড়ে তিন লাখ টাকা নির্বাচনী কাজে ব্যয় করবেন। এ ছাড়া তাঁর প্রবাসী তিনজন আত্মীয়ের কাছ থেকে পাওয়া পাঁচ লাখ টাকা অনুদান হিসেবেও খরচ করবেন।

প্রশ্নের মুখে ‘জনতার টাকা’
ফুয়াদের হলফনামা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ করবর্ষে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ পাঁচ লাখ ৯১ হাজার ২৮৪ টাকা। আয়কর দিয়েছেন ২০ হাজার ৭৭৩ টাকা। পেশা আইনজীবী, স্ত্রী গৃহিনী। ইলেকট্রনিক পণ্য ও আসবাবপত্র মিলিয়ে পারিবারিক সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে প্রায় সাত লাখ টাকা।

এই আয় ও সম্পদের হিসাবের সঙ্গে বরিশাল-৩ আসনের নির্বাচনী বাস্তবতা মিলিয়ে দেখলে প্রশ্ন উঠছে- প্রচারের বিপুল ব্যয় আসছে কোথা থেকে। স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির বক্তব্য, নদীঘেরা এই আসনে নৌপথে যাতায়াত, চরাঞ্চলে প্রচার এবং কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থাপনায় বড় অঙ্কের খরচ এড়ানো সম্ভব নয়।

প্রার্থী ফুয়াদ নিজেও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, মানুষের কাছে পৌঁছাতে আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে সেই সহযোগিতা মোবাইল ব্যাংকিং এর পাশাপাশি ব্যাংক হিসেবে সংগ্রহ করা হচ্ছে। একইসঙ্গে আয়-ব্যায়ের হিসাবও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংরক্থিত থাকবে। যে কেউ চাইলে সেই হিসাব দেখতে পারবেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের বরিশাল সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী, প্রার্থীদের নির্ধারিত সীমার মধ্যে নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে হয়। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা আর হলফনামার অঙ্কের মাঝের যে ফাঁক, তা নতুন নয়।