সাদেক আলী সরকার নিজের বাড়ি নির্মাণের ইট দিয়ে স্কুলঘর নির্মাণ করেছিলেন। তারপর ৫৫ বছর ধরে তিনি মাটির ঘরেই জীবন কাটিয়ে গেলেন। যে বাড়ির জন্য ইট পুড়িয়েছিলেন, সেই বাড়ি আর করতে পারেননি। শনিবার শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন সেই সাদেক আলী। বিকেলে নিজের প্রতিষ্ঠিত ডাকরা ডিগ্রি কলেজ মাঠে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
ডাকরা ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মো. তজিম উদ্দিন জানান, ’৭২ সালের কথা। তখন সাদেক আলী সরকার ডাকরা দ্বিপার্শ্ব উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি ছিলেন। বিদ্যালয়টি ১৯৬৯ সালে যাত্রা শুরু করলেও ঘরদোর তেমন কিছুই ছিল না। ওই সময় সাদেক আলী বাড়ি তৈরি করার জন্য ইট পুড়িয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠানের এই দৈন্যদশার কথা চিন্তা করে নিজের বাড়ি না করে সব ইট দান করেছিলেন প্রতিষ্ঠানকে। নিজের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করেন বিদ্যালয়ের পাঁচ কক্ষবিশিষ্ট পাকা ভবন। তার পর থেকে লেগে ছিলেন ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই। ১৮ বছর ধরে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এরপর ১৯৯৪ সালে নিজের তিন বিঘা জমি দিয়ে এলাকার আরও কয়েকজনের সহযোগিতা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ডাকরা কলেজ। তিনিই হন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। এটি বর্তমানে ডিগ্রি কলেজ হয়েছে।
সাদেক আলী সরকারের বাড়ি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার ডাকরা গ্রামে। শিক্ষানুরাগী মানুষটির গল্প নিয়ে ২০০৩ সালের ৩ এপ্রিল প্রথম আলোতে ‘নিজের বাড়ি না করে যিনি বানিয়েছেন স্কুল কলেজ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। বার্ধক্যের কারণে অসুস্থ হওয়ার আগপর্যন্ত সাদেক আলী সরকার কলেজের হিতৈষী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ আব্দুর রউফ বলেন, সাদেক আলী সরকার প্রতিদিন সকালে শিক্ষকেরা যেভাবে নির্দিষ্ট সময়ে কলেজে আসেন, তিনিও আসতেন। এসে তিনি শুধুই বসে থাকতেন না। কোনো শিক্ষক ক্লাসে গেলেন না, তা অধ্যক্ষের মতো তদারকি করতেন। ক্লাস না করে শিক্ষার্থীরা বাজারের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখলে তিনি তাদের ধরে কলেজে নিয়ে আসতেন। কলেজের কোনো নির্মাণকাজ শুরু হলে নিজের কাজের মতো তদারকি করতেন।
সাদেক আলী সরকার ৫৫ বছর আগে যে বাড়ি তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। জানাজার পরে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় মাটির বাড়িটি দিব্যি রয়েছে। সঙ্গে বাঁশের চাটাই দিয়ে সামনে আরেকটি ঘর করেছেন। বাথরুম ছাড়া তাঁর বাড়িতে ইটের কোনো কিছু নেই।
সাদেক আলীর ছোট ভাই আমির হামজাকে বাড়িতে পাওয়া যায়। তিনি জানান, তাঁর ভাই বাড়ি বানানোর জন্য ইট পুড়িয়ে সেই ইট দিয়ে স্কুল গড়লেন। পরে আর বাড়ি বানাতে পারলেন না। মাটির বাড়িতেই জীবন কাটাচ্ছেন দেখে তিনি একটা পাকা ঘর তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু ভাই রাজি হননি।
আমির হামজা বলেন, তাঁর ভাই সাদেক আলীর সাত কন্যা ও এক ছেলের জনক ছিলেন। ছেলেকে বিয়ে করানোর পর বাড়তি ঘরের প্রয়োজন হলে বাঁশের চাটাই দিয়ে সামনে আরেকটি ঘর করেন। পাকা ঘর তৈরি করে দিতে চাইলেও তিনি নিতে রাজি হননি। অস্থায়ী মাটির ঘরে থেকেই চলে গেলেন চিরস্থায়ী মাটির ঘরে।