‘দলবাজ, দুর্নীতিবাজ ও ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে অভিযোগ ওঠার পর ছুটিতে পাঠানো বিচারপতিদের তালিকা বেড়েছে। নতুন করে তালিকায় যুক্ত হয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল (এম আর) হাসানের নাম। নতুন প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর হাইকোর্ট বিভাগের যে ৬৬টি বেঞ্চ পুনর্গঠন করা হয়েছে, সেই তালিকায় এ বিচারপতির নাম নেই। গত নভেম্বরে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর নতুন করে তাকে বিচারিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হাইকোর্ট বিভাগের ১২ বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৯ জন বিচারপতি এখন আর দায়িত্বে নেই (তাদের কেউ কেউ সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলে তদন্তের পর বাধ্যতামূলক অবসরে, কেউ কেউ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ, আর কেউ কেউ অবসরে চলে গেছেন)। বাকি তিন বিচারপতি পদে থাকলেও বেঞ্চের দায়িত্বে (বিচারিক কাজে নিয়োজিত) নেই। পাশাপাশি ছুটিতে পাঠানো মোট ১৩ বিচারপতির বাইরেও হাইকোর্ট বিভাগের দুই বিচারপতি স্বেচ্ছায় ছুটিতে রয়েছেন। স্বেচ্ছায় ছুটিতে থাকা দুই বিচারপতি হলেন বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি আশরাফুল কামাল।
দেশের পটপরিবর্তনের পর গত বছরের ১০ আগস্ট প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পদত্যাগ দাবিতে সকাল থেকে হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। পরে সেদিন বিকেলের মধ্যে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির মধ্যে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ ছয়জন পদত্যাগ করেন। প্রধান বিচারপতি ছাড়া পদত্যাগকারী অন্য পাঁচ বিচারপতি হলেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, মো. আবু জাফর সিদ্দিকী, জাহাঙ্গীর হোসেন, মো. শাহিনুর ইসলাম ও কাশেফা হোসেন। বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম তখন একমাত্র বিচারপতি হিসেবে আপিল বিভাগে থেকে যান। অন্যদিকে, সেদিন রাতেই প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ।
এরপর গত বছরের ১৫ অক্টোবর রাতে ‘দলবাজ, দুর্নীতিবাজ ও ফ্যাসিস্টের দোসর’ বিচারকদের পদত্যাগের দাবিতে হাইকোর্ট ঘেরাও করতে ফেসবুকে ঘোষণা দেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম। পরের দিন ১৬ অক্টোবর দুপুরে মিছিল নিয়ে হাইকোর্ট চত্বরে আসেন শিক্ষার্থীরা। তারা হাইকোর্ট বিভাগের ‘দলবাজ ও দুর্নীতিবাজ’ বিচারপতিদের পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ মিছিল করতে থাকেন। এ কর্মসূচি চলার মধ্যেই বেশ কয়েকজন বিচারপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আলোচনার পর ১৬ অক্টোবর বিকেলে ছাত্রদের সামনে এসে বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন রেজিস্ট্রার জেনারেল। বিচারপতি অপসারণের বিষয়ে রেজিস্ট্রার জেনারেল তখন জানিয়েছিলেন, বিচারপতিদের নিয়োগকর্তা রাষ্ট্রপতি। তাদের পদত্যাগ বা অপসারণ; সেই উদ্যোগও রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে হয়ে থাকে। এখানে প্রধান বিচারপতির যেটা করণীয় উনি সেটা করেছেন। আপাতত ১২ জন বিচারপতিকে প্রাথমিকভাবে কোনো বেঞ্চ দেওয়া হচ্ছে না।
এই ১২ বিচারপতির মধ্যে গত ৩১ অক্টোবর সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের অনুসন্ধান পরিচালনার প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আখতারুজ্জামান। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের তদন্তাধীন বিচারপতি মো. আখতারুজ্জামান প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে তার স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। এ ছাড়া বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন গত ৩০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে নিজ স্বাক্ষরযুক্ত পত্রের মাধ্যমে পদত্যাগ করেন। বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলন হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারক হিসেবে আর নিয়োগ পাননি। অপর দুই বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খান ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস এরই মধ্যে অবসর গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পর রাষ্ট্রপতি তিনজন বিচারপতিকে অপসারণ করেন। এর মধ্যে বিচারপতি খিজির হায়াতকে গত ১৮ মার্চ ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানকে গত ২১ মে অপসারণ করা হয়। সর্বশেষ গত ৫ নভেম্বর বিচারপতি খুরশীদ আলম সরকারকে অপসারণ করা হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন সচিব লিয়াকত আলী মোল্লার সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের তদন্তে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার তার পদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে অযোগ্য হয়ে পড়েছেন বলে রাষ্ট্রপতি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের পুনর্বহাল হওয়া অনুচ্ছেদ ৯৬-এর দফা (৬) বিধান অনুযায়ী ৫ নভেম্বর বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারকে ওই পদ হতে অপসারণ করেছেন।
‘ছুটিতে পাঠানো হলো বিচারপতি এম আর হাসানকে’:
গত নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হাসানের বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলে অভিযোগ করা হয়। দুর্নীতি, অসদাচরণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এনে শাহ গ্রুপের চেয়ারম্যান কে এম মজিবুল হক এ আবেদন করেন। আবেদনে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলকে বিষয়টি তদন্তের অনুরোধের পাশাপাশি অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংবিধানের আওতায় এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ চাওয়া হয়েছে।
পরে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী এ তথ্য নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হাসানের বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের কাছে একটি অভিযোগ এসেছে। অভিযোগটি কাউন্সিলে উপস্থাপন করা হয়েছে।’ ওই অভিযোগে বলা হয়, ‘বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান ২০১০ ও ২০১১ সালের দুটি কোম্পানি মামলার কার্যধারায় পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেছেন। এক মামলায় সংশ্লিষ্ট সিনিয়র আইনজীবী উপস্থিত না থাকলেও রায়ে তার নামে যুক্তিতর্ক উল্লেখ করা হয়, যা পরে আপিল বিভাগে বাতিল হয়। অন্য মামলায় আবেদনকারীর স্ত্রীকে পক্ষ না করেই তার ১৩ লাখ শেয়ার বাতিল হয়, যা আবেদনকারীর দৃষ্টিতে ন্যায়বিচারের নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি। বিচারপতি মো. রেজাউল হাসান ও তার নিকটাত্মীয়দের সম্পদের পরিমাণ ঘোষিত আয়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি উল্লেখ করে সেখানে বলা হয়, ‘যা দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে।’
আবেদনকারী কে এম মজিবুল হকের দাবি, এ বিচারপতি ও তার পরিবারের সম্পদের তথ্য, যানবাহন, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, কর নথির তুলনামূলক বিশ্লেষণে আয়ের সঙ্গে সম্পদের অস্বাভাবিক অসামঞ্জস্য প্রকাশ পেয়েছে। অভিযোগে বিচারপতি হাসানের ছেলের বেপরোয়াভাবে বিএমডব্লিউ গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা, এরপর ভিকটিমের পরিবারকে নানাভাবে চাপে রাখা কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কথাও অভিযোগে তুলে ধরা হয়। অভিযোগ জমা পড়ার পরও বেশ কয়েকদিন তিনি বিচারকাজে ছিলেন।
এরই মধ্যে গত ২৭ ডিসেম্বর বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ অবসরে যান। এরপর দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। সুপ্রিম কোর্টের শীতকালীন অবকাশ শেষে তিনি গত ৩ জানুয়ারি ৬৬টি বেঞ্চ পুনর্গঠন করেন। ওই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বিচারপতি এম আর হাসানারে নাম। সুপ্রিম কোর্টের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর নতুন করে বিচারপতি এম আর হাসানকে বেঞ্চ দেওয়া হয়নি। এর আগে ১২ জনকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। তার মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলে তদন্ত চলছে। এ তিনজন হলেন বিচারপতি নাঈমা হায়দার, বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামান। নতুন করে বিচারপতি এম আর হাসানের বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু হয়েছে।