Image description

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ৩০০টি আসনের বিপরীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৫৭৪ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে এসব প্রার্থী ঋণখেলাপি কি না—তা যাচাই করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণতথ্য ব্যুরো (সিআইবি)। যাচাই-বাছাই শেষে অন্তত ৮২ জন প্রার্থীকে ঋণখেলাপি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

এ ছাড়া আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়েছেন ৩১ জন প্রার্থী এবং ২ হাজার ৪৬১ জন প্রার্থীকে খেলাপিমুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, জাতীয় পার্টির একাংশের আলোচিত নেতা মুজিবুল হক চুন্নু কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসন থেকে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও ঋণখেলাপি হওয়ায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মুজিবুর রহমান শামীম, জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম সরোয়ার, বাগেরহাট-২ (বাগেরহাট সদর ও কচুয়া) আসনে লেবার ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-এর প্রার্থী মো. হাসান ইমাম লিটু এবং ঢাকা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আব্দুল হক—তাদের মনোনয়নপত্রও ঋণখেলাপির কারণে বাতিল করা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, ঋণখেলাপিরা ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। তাই মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় প্রার্থীদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ব্যাংক থেকে পাওয়া সিআইবি প্রতিবেদনের তথ্য মিলিয়ে দেখেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। কোনো প্রার্থী ঋণখেলাপি হলে তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়। সে অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি রিপোর্টের ভিত্তিতে এই ৮২ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করবেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

তবে প্রার্থিতা ফিরে পেতে তারা আপিল করতে পারবেন। আজ সোমবার থেকে মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল শুরু, যা চলবে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক অনেক প্রার্থী আগে থেকেই ঋণখেলাপির তালিকায় ছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ঋণ নিয়মিত করেছেন। তবে কিছু প্রার্থী জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেওয়ায় ব্যাংক চাইলেও সেসব ঋণ নিয়মিত করতে পারেনি। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হলেও অনেক প্রার্থী ঋণ নিয়মিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং তাদের সিআইবি প্রতিবেদনে ঋণখেলাপির তথ্য রয়ে গেছে।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের আগেই প্রার্থীদের সব খেলাপি ঋণ পরিশোধ বা নবায়ন করতে হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ নিয়মিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নির্বাচনে অযোগ্য বলে বিবেচিত হন। এ কারণে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারাও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে উপস্থিত থাকেন। একইভাবে আপিল শুনানির সময় নির্বাচন কমিশনেও ব্যাংক কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন।

সংশোধিত আরপিও অনুযায়ী, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও যদি কোনো সদস্যের ঋণখেলাপি হওয়া বা মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে নির্বাচন কমিশন তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন,
‘আমরা প্রার্থীদের ঋণের বর্তমান অবস্থা নির্বাচন কমিশনকে জানাই। যারা আদালতের মাধ্যমে খেলাপিমুক্ত হয়েছেন, তা নির্বাচন কমিশন যাচাই করে দেখবে। ওইসব প্রার্থীর বিষয়ে তারাই সিদ্ধান্ত দেবে।

জানা যায়, এবারের সংসদ নির্বাচনে যারা অংশ নেবেন তাদের খেলাপি ঋণের তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়ার জন্য গত ২৯ ডিসেম্বর এক পরিপত্রে জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি)। এফআইডির ওই পরিপত্র দেশের সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কাছে পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

পরিপত্রে বলা হয়েছে, অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে কোনো ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণ বা তার কোনো কিস্তি খেলাপি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার কিংবা সংসদ সদস্য হিসেবে থাকার অযোগ্য হবেন।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পরিপত্রে আরো বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী যদি ঋণখেলাপি কোনো কোম্পানি, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেন, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সম্মতি ছাড়া সেই পদত্যাগ কার্যকর হবে না। পাশাপাশি যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (আরজেএসসি) থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশোধন করাও বাধ্যতামূলক।

পরিপত্র অনুযায়ী, প্রার্থীদের ঋণখেলাপি সংক্রান্ত তথ্য মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের দিন বা তার আগেই ব্যাংকারদের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে সরবরাহ করতে হবে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হবে প্রার্থীদের ঋণসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা এবং কোনো খেলাপি প্রার্থী আছেন কি না, তা নিশ্চিত করা।