রাজধানীর গণপরিবহন আধুনিকায়নের ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র খুবই হতাশাজনক। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ৩৪০টি সিএনজিচালিত একতলা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস সংগ্রহ প্রকল্পটি শুরু হওয়ার আড়াই বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। কিন্তু ব্যয় হয়েছে মোট বরাদ্দের মাত্র ০.২৪ শতাংশ। এক হাজার ১৩৩ কোটি টাকার প্রকল্পে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে মাত্র দুই কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
প্রশাসনিক জট, দরপত্রপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং বিদেশি ঋণদাতা সংস্থার নানা জটিলতায় প্রকল্পটি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
বিআরটিসির জন্য সিএনজি একতলা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস সংগ্রহ প্রকল্পটি শুরু হয় ২০২৩ সালের জুলাই মাসে। মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী দেড় বছরের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। লক্ষ্য ছিল রাজধানীর নগর পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিক করা, বাস রুট পুনর্বিন্যাস কর্মসূচিকে সহায়তা করা এবং ধাপে ধাপে তেলচালিত পুরনো বাস তুলে নেওয়া। পাশাপাশি রাজধানীর বাইরে আন্ত জেলা রুটেও আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বাস চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, মোট ৩৪০টি বাসের মধ্যে ১৪০টি রাজধানীর বিভিন্ন রুটে এবং বাকি ২০০টি রাজধানীর বাইরে পরিচালিত হওয়ার কথা।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশ, ৮২৯ কোটি টাকা আসার কথা দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহযোগিতা তহবিলের ঋণ থেকে। অবশিষ্ট ৩০৫ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার।
কিন্তু অনুমোদনের পরপরই শুরু হয় সময়ক্ষেপণ। একনেকের অনুমোদনের পর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং কোরীয় পরামর্শক নিয়োগ সম্পন্ন করতেই লেগে যায় প্রায় ১৫ মাস। এরপর দরপত্র প্রস্তুত করে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে তা দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংকের কাছে পাঠানো হয়।
সেখানে দরপত্র নথি নিয়ে একাধিক দফায় মন্তব্য আসে। প্রতিবারই সংশোধন করে ফের নথি পাঠাতে হয়।
বিআরটিসি সূত্রে জানা যায়, দরপত্র নথির ওপর মোট ৯টি মন্তব্য আসে। এসব মন্তব্য নিষ্পত্তি করতে প্রকল্পের সময়সূচি আরো পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংক দরপত্র নথির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। এরপর ১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ পত্রিকায় দরপত্র আহ্বানের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
বিআরটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ মানেই কাজের বড় অংশ শেষ, এমন নয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর দরপত্র উন্মুক্তকরণ, কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন, আর্থিক প্রস্তাব যাচাই, আবারও বিদেশি ঋণদাতার অনুমোদন, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন, কার্যাদেশ জারি, দরদাতার পারফরম্যান্স সিকিউরিটি জমা, চুক্তি স্বাক্ষর, ঋণপত্র খোলা এবং চুক্তি কার্যকর করার মতো দীর্ঘ প্রক্রিয়া এখনো বাকি রয়েছে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর বাস সরবরাহ পেতেও কমপক্ষে ১৫ মাস সময় লাগবে।
সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ প্রকল্পটির মেয়াদ ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই আরো এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের কাছে এ বিষয়ে আলাদা আলাদা প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হলে চলমান প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব হতে পারে।
তবে বিআরটিসির কর্মকর্তাদের মতে, বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, শুধু প্রশাসনিক ও ক্রয় প্রক্রিয়াই নির্ধারিত সময়ের তুলনায় অনেক বেশি সময় নিচ্ছে। তাঁরা বলছেন, দরপত্র প্রকাশের পর থেকে বাস হাতে পাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় বাস্তবে প্রায় তিন বছর সময় লাগতে পারে। সে ক্ষেত্রে মাত্র এক বছর মেয়াদ বাড়ালে প্রকল্প শেষ হওয়া কঠিন।
প্রকল্পের ধীরগতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে চলতি অর্থবছরের বরাদ্দে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রকল্পটির জন্য ৭৮১ কোটি টাকার বরাদ্দ থাকলেও সংশোধিত কর্মসূচিতে তা কমিয়ে মাত্র ছয় কোটি ১৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। অর্থাৎ প্রায় ৯৯ শতাংশ বরাদ্দ কাটছাঁটের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এমন দীর্ঘসূত্রতা শুধু সময় ও অর্থের অপচয় নয়, বরং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও স্পষ্ট করে। ব্যবস্থাপনায় গতি ও সমন্বয় না বাড়লে মেয়াদ বাড়ালেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।