Image description
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা

যুদ্ধ বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক সামরিক অভিযান চালিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কারাকাসে এক ঝটিকা অভিযানের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে বন্দি করার ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, এখন থেকে পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখতে তিনি যে কোনো পর্যায়ে যেতে প্রস্তুত। স্থানীয় সময় শনিবার সকালে মার-এ-লাগো রিসোর্টে এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প জানান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের নেতৃত্বে একটি দল ভেনেজুয়েলার শাসনভার পরিচালনা করবে।

তিনি একে ‘মেক ভেনেজুয়েলা গ্রেট এগেইন’ বলে অভিহিত করেন। তবে ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ তার আগের পররাষ্ট্রনীতির ঠিক বিপরীত। যে ট্রাম্প একসময় ইরাক যুদ্ধের কড়া সমালোচক ছিলেন এবং ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা সরকার পরিবর্তনের বিরোধী ছিলেন, তিনিই এখন একটি ভিনদেশি রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের বরাতে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বিশ্বের অন্য পরাশক্তিগুলোর জন্য একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ডন বেকন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ট্রাম্পের এ কাজকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাশিয়া ইউক্রেনে তাদের বর্বরতাকে বৈধতা দিতে পারে, কিংবা চীন তাইওয়ানে আক্রমণের সাহস পেতে পারে। যদি যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থে অন্য দেশের সরকারপ্রধানকে বন্দি করতে পারে, তবে অন্য দেশগুলোও একই পথ অনুসরণ করবে—এমনটাই এখন বড় দুশ্চিন্তার কারণ।

রয়টার্সের এক বিশ্লেষণেও ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে নতুন প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের অশুভ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পদক্ষেপ বিশ্বশক্তিগুলোকে নতুন বার্তা দিচ্ছে যে, যদি ইউক্রেন বা ভেনেজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে তাইওয়ান বা অন্য কোনো স্থানেও তা সম্ভব।

স্থানীয় সময় শুক্রবার মধ্যরাতে ভেনেজুয়েলায় বিশেষ সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে তারা নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের একটি বন্দিশিবিরে আটক রয়েছেন। চরম সংকটকালীন এ মুহূর্তে রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। যদিও এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলায় একটি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে না আসা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই দেশটির প্রশাসনিক কার্যক্রম দেখাশোনা করবে।

এদিকে, ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এ ছাড়া রাশিয়া, চীনসহ বিশ্বের আরও কিছু দেশ নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন আগ্রাসন চীনকে তাইওয়ান এবং দক্ষিণ চীন সাগরের কিছু অংশের ওপর তার আঞ্চলিক দাবি জোরদার করতে উৎসাহিত করবে। তাদের মতে, এ আগ্রাসন চীনকে একটি অপ্রত্যাশিত সুযোগ করে দিয়েছে। বেইজিং সম্ভবত অদূরভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সমালোচনা জোরদার করতে এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজস্ব অবস্থান জোরদার করতে এটি ব্যবহার করবে।

রক্তাক্ত অভিযান, স্যাটেলাইটে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র: নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মাদুরোকে ধরার এ অভিযানে অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও সেনাসদস্য উভয়ই রয়েছেন। অভিযানটি সফল করতে ১৫০টির বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান ভেনেজুয়েলার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়। স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবিতে কারাকাসের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ‘ফুয়ের্তে তিউনা’য় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে। এ ছাড়া লা কার্লোতা বিমানঘাঁটি, পোর্ত লা গুয়েরা বন্দর, মিরান্ডা রাজ্যের একটি টেলিকম টাওয়ারসহ অন্তত পাঁচটি স্থানে বড় ধরনের হামলার প্রমাণ পাওয়া গেছে। রাজধানী কারাকাসের রাস্তাঘাট বর্তমানে প্রায় জনশূন্য, তবে কিছু এলাকায় মাদুরোর সমর্থকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। কারাকাসের মেয়র কারমেন মেলান্দেজ এ ঘটনাকে ‘অপহরণ’ বলে অভিহিত করেছেন। এ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে ইলন মাস্কের স্টারলিংক ভেনেজুয়েলায় বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

কারাকাস থেকে ব্রুকলিন, মাদুরোর ৩ হাজার কিলোমিটারের বন্দি যাত্রা: স্থানীয় সময় শুক্রবার মধ্যরাতে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক ঝটিকা অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করে মার্কিন বাহিনী। সেখান থেকে তাদের হেলিকপ্টারে করে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যারিবীয় সাগরের একটি অজ্ঞাত স্থানে অবস্থানরত মার্কিন নৌ জাহাজ ‘ইউএসএস আইডব্লিউও জিমা’তে। এর পর আবারও হেলিকপ্টারে তাদের কিউবার গুয়ানতানামো বে মার্কিন নৌঘাঁটিতে নেওয়া হয়। যাত্রার পরবর্তী ধাপে একটি বিমানে করে তাদের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বিমানঘাঁটিতে নামানো হয়। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে ম্যানহাটনের ওয়েস্টসাইড হেলিপোর্ট হয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় মার্কিন মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ডিইএর সদর দপ্তরে। কারাকাস থেকে নিউইয়র্ক পর্যন্ত এই বন্দি অবস্থায় মাদুরোকে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কিলোমিটার বা ২ হাজার ১০০ মাইল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মাদুরোকে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়েছে, যেখানে এর আগে শন ‘ডিডি’ কম্বস বা আর কেলির মতো আলোচিত ব্যক্তিদের রাখা হয়েছিল। সোমবার (আজ) মাদুরোকে নিউইয়র্কের আদালতে হাজির করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মাদুরোকে হাঁটিয়ে বন্দিশিবিরে নেওয়ার ভিডিও প্রকাশ: মাদুরোকে ডিইএ সদর দপ্তরে নেওয়ার সময়ের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে দেখা যায়, কালো রঙের হুডি পরা হাতকড়া পরিহিত মাদুরোকে একজন অপরাধীর মতো করিডোর দিয়ে হাঁটিয়ে নেওয়া হচ্ছে। নীল কার্পেটের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে সেখানে উপস্থিত কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ‘শুভ নববর্ষ’ বলতে শোনা যায়। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল ও কোকেনের প্রবাহ বৃদ্ধির জন্য ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে দায়ী করেছে। যদিও মাদুরো দীর্ঘ সময় ধরে এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এবং একে-তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ও ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ দখলের একটি অজুহাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মাদক বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, বৈশ্বিক মাদক পাচারে ভেনেজুয়েলার ভূমিকা মূলত একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে এবং ফেন্টানিল মূলত মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে।

ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি: প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট এক জরুরি নির্দেশনায় ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দেয়। তবে দেশটির সার্বিক পরিস্থিতি এখনো বেশ জটিল। ডেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে তার ভাই হোর্হে রদ্রিগেজ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডিওসদাদো কাবেইয়ো এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজকে নিয়ে উপস্থিত হয়ে ঘোষণা করেছেন, মাদুরোই এখনো দেশের একমাত্র বৈধ প্রেসিডেন্ট। বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর অনুপস্থিতিতেও তার ঘনিষ্ঠ সামরিক-বেসামরিক চক্রটি এখনো ঐক্যবদ্ধ আছে।

এর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তিনি ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোর সঙ্গে কাজ করবেন না, কারণ তার মতে মাচাদোর প্রতি ভেনেজুয়েলার জনগণের সমর্থন নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটকের এ অভিযানটি ছিল একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজ এবং শেষ পর্যন্ত এর ফলে ভেনেজুয়েলার জনগণ ও আমেরিকা উভয়ই উপকৃত হবে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বন্দি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মুক্তি দাবিতে কারাকাসের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করছেন তার সরকারের সমর্থকরা। কারাকাসের মেয়র কারমেন মেলান্দেজ, যিনি মাদুরো সরকারের অনুগত বলে পরিচিত, তিনিও বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তাদের প্রেসিডেন্ট ও ফার্স্ট লেডিকে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপহরণ’ করে নিয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: ভেনেজুয়েলায় হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে ধরে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি এ ঘটনাকে একটি ‘বিপজ্জনক নজির’ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে, চীন ও রাশিয়া এ ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছে এবং মাদুরো ও তার স্ত্রীর অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেছে। কলম্বিয়া এ বিষয়ে সোমবার (আজ) জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেছে। রাশিয়ার মতে, মাদুরো একজন বৈধভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এবং উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে সংলাপ প্রয়োজন। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্টারমার মাদুরোর পতনে সমবেদনা না দেখালেও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে মন্তব্য এড়িয়ে গেছেন। জাপান গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে সমর্থন দিলেও মালয়েশিয়া কঠোর ভাষায় ভেনেজুয়েলায় এই বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে অতি সম্প্রতি শপথ নেওয়া জোহরান মামদানি এ অভিযানকে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে সরাসরি প্রতিবাদ জানিয়েছেন।