Image description

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর ( ডিআইএ ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিদপ্তর । এমপিওভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্কুল , কলেজ , মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতি বের করাই তাদের কাজ । অথচ সেই অধিদপ্তরেই চর্চা হচ্ছে নানা অনিয়ম , উঠছে ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ । 

ডিআইএর একাধিক শিক্ষা পরিদর্শক ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে গিয়ে নিরীক্ষার নামে ‘ অনৈতিক সুবিধা ’ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে । এর মধ্যে মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম নামের এক সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে ( দুদক ) অভিযোগ করা হয়েছে । পরিদর্শনে গিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মো . মকবুলার রহমান নামের এক শিক্ষা পরিদর্শকের বিরুদ্ধেও । এর বাইরে ডিআইএর আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও অডিট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নিরীক্ষার নামে ‘ ঘুষ ’ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে । 

এ নিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে সতর্কও করেছেন ডিআইএর পরিচালক । এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন , কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে । ডিআইএর প্রধান কাজ স্কুল , কলেজ , মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর বা সংস্থায় পরিদর্শন এবং নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা । পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম , দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা তুলে ধরা হয় । সে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয় । এসবের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় । কিন্তু যাঁদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে তাঁদের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠতে থাকায় ক্ষোভ বিরাজ করছে শিক্ষা ক্যাডারে । 

সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত ১৪ ডিসেম্বর দুদকে করা অভিযোগে বলা হয় , সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী ... শাজাহান খানের ভাগনে । দীর্ঘদিন ধরে তিনি ডিআইএতে কর্মরত থেকে পরিদর্শনের নামে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন । তাঁর পারিবারিক কোনো ব্যবসা - বাণিজ্য না থাকলেও তিনি নামে - বেনামে গড়েছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ । মনিরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগে আরও বলা হয় , অবৈধ আয়ের টাকা হুন্ডির মাধ্যমে তিনি ভাইয়ের কাছে ইতালিতে পাঠান । তারপর সেই টাকা রেমিট্যান্স হিসেবে বৈধভাবে তাঁর ব্যাংক হিসাবে আনেন । এভাবে তিনি গড়ে তুলেছেন অবৈধ সম্পদের পাহাড় ।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা . দীপু মনির ভাইয়ের ‘ ক্যাশিয়ার ’ হিসেবে কাজ করতেন বলে জানা যায় । অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গত ২১ ডিসেম্বর মনিরুল ইসলাম বলেন , যে কেউই যে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারে । দুদক এ - সংক্রান্ত কোনো জবাব চাইলে তা দেওয়া হবে । ডিআইএ সূত্রে জানা যায় , মনিরুল ইসলামকে সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল মজুমদার নিয়ন্ত্রিত মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের তদন্ত দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল । তবে তিনি শাহাজাহান খানের ভাগনে , এ পরিচয় জানাজানি হলে পরে তদন্ত দল থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয় ।

সূত্র আরও জানায় , মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার নয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঘুষ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে । গত ১৯ থেকে ২৯ অক্টোবর এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালিত হয় । আরেক শিক্ষা পরিদর্শক মো . মকবুলার রহমানের বিরুদ্ধেও কুমিল্লা জেলার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার ১০ টি শিক্ষা পরিদর্শনে গিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে । গত ২১ থেকে ২৯ জুলাই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালিত হয় । সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরীক্ষার সময় ভয়ভীতি দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছে । জানতে চাইলে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন মকবুলার রহমান । তিনি বলেন , এ ধরনের কোনো অভিযোগ সত্য নয় ।

মনিরুল ও মকবুলার ছাড়াও ডিআইএর আরও কয়েকজন কর্মকর্তা ও অডিট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নিরীক্ষার নামে ‘ ঘুষ ’ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে । এ নিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে সতর্কও করেছেন ডিআইএর পরিচালক । এদিকে ডিআইএর পাঁচ কর্মকর্তার বদলি নিয়েও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে । কারণ ৬ থেকে ৮ মাস ধরে কর্মরতদের বদলি করা হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন ৭ বছর ধরে সহকারী পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম । ২০১৮ সালে ডিআইএতে যোগ দেন তিনি । এর আগে মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম ৭ বছর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা ( মাউশি ) অধিদপ্তরে কর্মরত ছিলেন । জানা যায় , চলতি মাসের শুরুতে ডিআইএতে কর্মরত পাঁচ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয় । পরে অবশ্য একজনের বদলি স্থগিত করা হয় । বাকি চার কর্মকর্তার সবাই ৬ থেকে ৮ মাস ধরে ডিআইএতে কর্মরত ছিলেন ।

এ বিষয় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন , ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী আমলে পদায়ন পাওয়া কর্মকর্তাদের বদলি করা হলেও ডিআইএতে শুধু মনিরুল ইসলামই বহাল তবিয়তে আছেন । তিনি আরও বলেন , অনৈতিক উপায়ে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হওয়ায় সবাইকে ‘ ম্যানেজ ’ করে চলেন মনিরুল । জানতে চাইলে মনিরুল ইসলাম বলেন, ' হ্যাঁ এটা ঠিক , আমি দীর্ঘদিন ধরে ডিআইএতে কর্মরত । আমি কয়েকবার চেষ্টা করেছি বদলির জন্য ।

এর বাইরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘদিন ধরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে কর্মরত থাকা দুই সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মো . রোকনুজ্জামান ও মো . আজিম কবীরকে ডিআইএতে পদায়ন নিয়েও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে । নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানান , আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে এই দুই কর্মকর্তা ভোল পাল্টে ডিআইএতে পদায়ন পেয়েছেন । এ নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে । উল্লেখ্য , চাকরিবিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের তিন বছর পরপর বদলি করতে হবে । অর্থাৎ একই দপ্তরে তিন বছরের বেশি সময় থাকা যাবে না । বিষয়টি নির্দিষ্ট করে সরকার প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে । এ ছাড়া সরকারি কলেজের শিক্ষক বদলি বা পদায়ন নীতিমালায়ও বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে । একই সঙ্গে এক দপ্তর বা সংস্থা থেকে অন্য দপ্তর বা সংস্থায় সরাসরি বদলি না করার বিষয়টিও উল্লেখ রয়েছে । এই মধ্যবর্তী সময়ে তিন বছরের শিক্ষকতা করারও বাধ্যবাধকতা রয়েছে ।