বাংলাদেশের রাজনীতিতে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ও বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। তবে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৬ জুলাই শেখ হাসিনাকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেফতার করা হলে, তখন খালেদা জিয়া তার মুক্তির জন্য বিবৃতি দেন।
এর দুই মাস পরই, সেপ্টেম্বর মাসে খালেদা জিয়াও একটি দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হন। তখন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লূর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন যে, খালেদা জিয়া ন্যায়বিচার পাবেন। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে তখন জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার দুটি বিশেষ কারাগারে রাখা হয়েছিল। পরে ২০০৮ সালের ১১ জুন শেখ হাসিনা এবং ১১ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া মুক্তি পান। একই বছর ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসে, আর খালেদা জিয়া বিরোধী আসনে বসেন।
কোন পরিস্থিতিতে বিবৃতি দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া
২০০৭ সালের জানুয়ারি সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার আগে বিএনপি-জামায়াতের চার দলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে পরবর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন তা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ সহিংসতায় রূপ নিলে দুই প্রধান দল—আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংস্কার ইস্যুতে মতবিরোধ তীব্র হয়। দুই দলের কিছু সিনিয়র নেতা নিজ নিজ দলের ভেতরে সংস্কারের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেন। তখন আলোচনায় আসে কথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’, যা দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পায়।
শেষ পর্যন্ত ১৬ জুলাই ২০০৭ সোমবার ভোরে শেখ হাসিনাকে ধানমণ্ডির বাসা ‘সুধা সদন’ থেকে গ্রেফতার করে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালত প্রাঙ্গণে শেখ হাসিনা প্রবল ভিড়ে অশোভন আচরণের শিকার হন, যা তুমুল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
এ পরিস্থিতিতে ১৮ জুলাই খালেদা জিয়ার তখনকার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে শেখ হাসিনার মুক্তি দাবি করা হয়।
খালেদা জিয়ার বিবৃতির মূল অংশ:
- ‘শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক গ্রেফতার এবং তাকে আদালতে আনা-নেওয়ার সময় তার মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসনিক ব্যর্থতা আমাকে বেদনাহত করেছে। একটি দলের প্রধান, একজন জাতীয় নেতার কন্যা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, একজন প্রবীণ নারী, সর্বোপরি দেশের একজন সম্মানিত নাগরিক হিসেবে তাকে যে ধরনের অসম্মানজনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে তাতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত।’
- ‘শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে আমাদের সরকার ও দলের সমালোচনার গণ্ডি পেরিয়ে আমার বিরুদ্ধেও অযৌক্তিক ও অসৌজন্যমূলক মন্তব্য করেছেন। তাতে আমি যেমন কষ্ট পেয়েছি, ঠিক একইভাবে দুঃখবোধ করছি তাকে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের শিকার হতে দেখে।’
- ‘এক, অভিযুক্ত মাত্রই অপরাধী নয়। কাজেই তাদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা সুরক্ষা সরকার ও প্রশাসনের কর্তব্য। দুই, সব অভিযুক্ত যেন সন্দেহাতীতভাবে ন্যায়বিচার পায় এবং মানবাধিকার বজায় থাকে, সেই লক্ষ্যে আত্মপক্ষ সমর্থন ও আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও আমি এ বিষয়ে নজর রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।’
- ‘শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার না করে বা জামিন আবেদনে বিরোধিতা না করে মামলা পরিচালনার সুযোগ থাকলে তাকে মুক্ত রাখার আহ্বান জানাচ্ছি। এতে পারস্পারিক অবিশ্বাস, সামাজিক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে আসবে।’
- ‘জরুরি অবস্থা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও, শান্তিপ্রিয় দেশবাসী এর পুনরাবৃত্তি চাইবে না। তাই জাতীয় জীবনের এ সন্ধিক্ষণে টেকসই স্থিতিশীলতা ও পরম কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যেতে জাতীয় ঐক্য ও সমঝোতা প্রয়োজন। সবাইকে প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও সংযম প্রদর্শন করতে হবে।’