বিদায়ী বছরে যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছে দেশের বিচার বিভাগে। গত হয়েছে আলোচিত ও ঘটনাবহুল আরেকটি বছর। চব্বিশের জুলাই গণহত্যা তথা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড। বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্বহাল। জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্ট মিথ্যা মামলায় বেগম খালেদা জিয়া বেকসুর খালাস। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় আগামীর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ অন্য আসামিদের বেকসুর খালাস। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতার মুক্তি। মেজর সিনহা হত্যা মামলায় আসামি প্রদীপের মৃত্যুদণ্ড বহাল। বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার হত্যা মামলার রায় বহাল। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে দুর্নীতিবাজ, দলদাস কয়েকজন আওয়ামী বিচারপতিকে অপসারণ। এমন অনেক ঘটনায় আলোচনার কেন্দ্রে ছিলো বিচারাঙ্গন।
তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল একটি বিচারিক আদালত হলেও এটির মর্যাদা হাইকোর্ট সমকক্ষ। এ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি আপিলের জায়গা হচ্ছে আপিল বিভাগ। ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ তাই সুপ্রিমকোর্টের ‘হাইকোর্ট বিভাগ’র অন্তর্ভুক্ত।
চব্বিশের গণহত্যা, তথা মানবাতিরোধী অপরাধের একটি মামলায় বিদায়ী বছর ১৭ নভেম্বর দেশের ঘাড়ে চেপে বসা দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের জননী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বাংলাদেশে রাষ্ট্র কিংবা সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালনকারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত হয়েছেন এ বছর।
সেই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে হাসিনা সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও। ‘রাজসাক্ষী’ হওয়া সত্ত্বেও পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে পুলিশের তৎকালীন আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আলমামুনকে।
আরেকটি মামলায় উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ করায় শেখ হাসিনাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়। হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে শিশু হত্যার নির্দেশসহ চানখাঁরপুল ও আশুলিয়া গণ হত্যার অপরাধে তাকে দেয়া হয় এ দণ্ড। পরবর্তীতে এ দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টে আপিল করেছে সরকারপক্ষ। দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এটিকে এক ‘যুগান্তকারী রায়’ বলে অভিহিত করেছেন আইনজীবী, রাজনীতিকসহ দেশের সাধারণ মানুষ।
রায় ঘোষণার আগে থেকেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পরিচালনায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। দলটির কোনো সক্রিয় তৎপরতা না থাকলেও এই রায় ঘিরে অনলাইনে ‘শাটডাউন’ এর কর্মসূচির প্রচার চালায় নিষিদ্ধ দলটি। এর মধ্যেও বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন স্থানে হাতবোমা হামলা ও গাড়ি পোড়ানোর ঘটনা ঘটায় হাসিনার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার তারিখ ধার্যের পর থেকে। তবে হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হওয়ায় উল্লাসে ফেটে পড়ে দেশের মানুষ। মিষ্টি বিতরণও হয় রাজধানীসহ সারা দেশে। হাসিনা এখন ভারতে পলাতক।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃস্থাপিত হয়েছে ২০২৫ সালে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে অধস্তন আদালতের বিচারকের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে আসে এ বছর। আপিল বিভাগের রায়ে নিবন্ধন ও প্রতীক দাঁড়িপাল্লা ফিরে পায় জামায়াত। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা বাতিল, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ আসামিদের খালাস, মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা এটিএম আজহারকে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে খালাস, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপসহ আসামিদের সাজা বহাল ছিলো এ বছর। আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় ২০ আসামির সাজার বহালের রায় হয় বিদায়ী বছরে।
এবছরই প্রধান বিচারপতির পদ থেকে অবসরে গেলেন বাংলাদেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। এসব নানাবিধ কারণে যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, সুপ্রিম কোর্ট থাকবে ২০২৫ সালের কথা মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হবে।
২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর বহুল প্রতীক্ষিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ। সেইসঙ্গে ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ঘোষণা করে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল করেন সুপ্রিমকোর্ট।
২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধান সম্বলিত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থি মর্মে ঘোষণা করে এবং বাহাত্তরের সংবিধানের মূল ১১৬ অনুচ্ছেদ বহাল করেন সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ। এ রায়ের কারণে অধস্তন আদালতের দায়িত্ব পালনরত বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) শৃঙ্খলা বিধানের দায়িত্ব পুরোপুরি সুপ্রিম কোর্টের হাতে আসে। বিচারপতি আহমেদ সোহেল নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চের দেয়া এ রায়ের ফলে এখন থেকে বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ, বদলি ও শৃঙ্খলা বিধানের জন্য বঙ্গভবনে সুপ্রিমকোর্টকে আর ধরনা দিতে হবে না।
উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুসারে বিদায়ী বছরে বহুল কাক্সিক্ষত বিচার বিভাগের নিজস্ব সচিবালয়ের যাত্রা শুরু হয় বিদায়ী বছর। গত ১১ ডিসেম্বর বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়ের উদ্বোধন করেন সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। এর আগে, গত ২০ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়।
বিদায়ী বছর ৪ নভেম্বর জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১০ বছরের সাজা থেকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে খালাস দিয়ে আপিল বিভাগের দেয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
রায়ে আদালত বলেছেন, এই (মামলার) আপিলসমূহের বিষয়বস্তু গঠনকারী কার্যধারাগুলো উদ্দেশ্যমূলকভাবে গঠন করায় তা আইনের স্পষ্ট অপব্যবহার বলে প্রতীয়মান হয়েছে। যা দুরভিসন্ধিমূলক মামলার সমতুল্য।
রায়ে আদালত আরও বলেন, এই রায় অন্যান্য দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, যারা এ মামলায় আপিল করেননি।
বিদায়ী বছর ৪ সেপ্টেম্বর আলোচিত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ সব আসামির খালাসের হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। সেইসঙ্গে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা ফ্যাসিস্ট হাসিনা আমলে পুনরায় তদন্ত করে যে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছিলো এবং হাইকোর্ট যে পর্যবেক্ষণে দিয়েছিলেন সেটি বাদ দেন সুপ্রিমকোর্ট।
২০২৫ সালে বিদায়ী বছরের ১৬ মার্চ বহুল আলোচিত বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতের ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৫ আসামির যাবজ্জীবন বহাল রাখেন হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে ৫ জনের যাবজ্জীবনের আদেশও বহাল রাখা হয়।
বিদায়ী বছরের ১১ ডিসেম্বর ও তালাক নিবন্ধন ডিজিটালাইজেশন করার রায় দেন হাইকোর্ট। সব নাগরিক যেন এই ডিজিটালাইজেশনের সুবিধা ভোগ করতে পারে তা নিশ্চিত করতেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুলের দ্বিধা বিভক্ত রায় দেন হাইকোর্ট। বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি ফাতেমা নজীব চুক্তি প্রক্রিয়া অবৈধ ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার রিট খারিজ করে চুক্তি প্রক্রিয়া ‘বৈধ’ ঘোষণা করেন। পরে নিয়মানুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য তৃতীয় বেঞ্চে পাঠানো হয়।
বিদায়ী বছরের ১০ ডিসেম্বর বাগেরহাটের চারটি আসন থেকে একটি কমিয়ে তিনটি আসন করে নির্বাচন কমিশনের গেজেট অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।