Image description
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস আজ গুম কমিশনে এ পর্যন্ত অভিযোগ ১৮০০টি

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) গুম করার পর বেদম নির্যাতন চালিয়েছে। এরপর ভারতের পুলিশের কাছে তুলে দিলে পাসপোর্ট ছাড়াই কলকাতায় নিয়ে জেলে রাখা হয়। সেখানেও চলে দফায় দফায় নির্যাতন। সাড়ে তিন মাস রেখে দেয় কলকাতা কারাগারে। ভারতের আরেকটি জেলখানায় নিয়েও চালানো হতো নির্যাতন। পরে পুশইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কথাগুলো বলছিলেন গুম হওয়া রহমতুল্লাহ। তিনি জানান, ‘২০২৩ সালে র‌্যাবের একটি দল আমাকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর জম টুপি পরিয়ে হাত বেঁধে একটি ছোট রুমে ৯ মাস আটকে রাখে। তখন তারা আমাকে বলে তোকে একদল মেরে ফেলতে চায়। আমরা চাই তুই বেঁচে থাক। পরে আমাকে ভারত পাঠিয়ে দেয়। গতকাল রহমতুল্লাহর সাথে কথা হলে তিনি সেই দিনগুলোর স্মৃতি মনে করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন।

গুমের শিকার আরেক ব্যক্তির স্ত্রী গতকাল জানান, ২০১৯ সালে তার স্বামী ইসমাইল হোসেনকে র‌্যাব গুম করে। এত বছর পরও সে কোথায় আছে কেউ বলতে পারে না। আমি বিভিন্ন দরজায় ঘুরেছি কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে। আমরা জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছি। আমাদের আনন্দ বলতে কিছুই নেই। আমার স্বামীকে গুম করার পর আজ পর্যন্ত কোনো বিচার হয়নি। আমি বেঁচে থাকতে তা দেখে যেতে পারব কি না জানি না। আশা করেছি নতুন সরকারের সময় বিচার পাবো। কিন্তু এখন দেখছি জুলাই আন্দোলনের আসামিরাও জামিনে বের হয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া আমার স্বামীকে যারা গুম করেছে তারা সুন্দরভাবে জীবন পার করছে। তাই মনে হচ্ছে এই বিচার কোনো দিন হবে না।

আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। যারা গুম হয়েছেন এবং এখনো ফিরে আসেননি তাদের জন্য এক কালো অধ্যায়ের দিন। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গুমের ঘটনার বিচারের দাবিতে দিনটি জোরালোভাবে পালন করা হয়। নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষদের স্মরণ এবং গুমের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতেই দিবসটি পালনের ঘোষণা দেয় জাতিসঙ্ঘ।

গত দেড় দশকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েক হাজার মানুষ গুমের ঘটনা ঘটে। গুম কমিশন গঠনের এক বছরে এক হাজার ৮০০টি অভিযোগ পড়েছে। মানবাধিকার কর্মী ও গুম কমিশনের সদস্যরা বলছেন, আগামীর বাংলাদেশে যেন গুম শব্দটি না থাকে, সে জন্য আমাদের যা যা করণীয় তা করতে হবে। গুম মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক ভয়াবহ রূপ। তাই এর প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গুম তদন্ত কমিশনে ব্যাপক সংখ্যক অভিযোগ দাখিল হয়। কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ‘তিন স্তরের পিরামিডে’র মাধ্যমে গুম বাস্তবায়ন হতো, যার শীর্ষে ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা। বর্তমানে গুমের নতুন ঘটনা না ঘটলেও বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে। যদি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে গুম সংস্কৃতি আবারো ফিরে আসতে পারে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে ৭০০ এর বেশি মানুষ গুম হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৫০ জনের বেশি মানুষের খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যাওয়া, সঠিক কথা বলা, অধিকার আদায়ের কথা বলাসহ সরকারবিরোধী যেকোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা উঠলেই গুমের ঘটনা ঘটে। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুমের অভিযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাপক সমালোচনায় পড়ে।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকার জানিয়েছে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সাবেক সরকার কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে গুমকে ব্যবহার করেছে। গোপন বন্দিশালার মাধ্যমে বিরোধী রাজনীতিক ও সরকারবিরোধীদের আটক করে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা করা হয়েছে।

বিগত সরকারের আমলে গুমের শিকার হওয়া মাইকেল চাকমা বলেন, গুম কমিশন গঠনের এক বছর পার হলেও যারা গুম হয়েছে তাদের সন্ধান দিতে পারেনি এই সরকার। গুমের বিচার কোন আইনে, শাস্তি, সুরক্ষা কিভাবে হবে তা চূড়ান্ত করা হয়নি। আমরা ভেবেছিলাম এই সরকারের আমলে গুমের বিচার হবে, তবে যে প্রক্রিয়ায় সরকার আগাচ্ছে, তাতে গুমের সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হবে কি না তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। সরকার যে উদ্যোগগুলো নিয়েছে তা বাস্তবায়ন হোক, ভবিষ্যতে যারা আসবে তারা যেন এই কমিশনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। ভবিষ্যতে যেন কোনো সরকার গুম খুনের চিন্তাও যেন করতে না পারে, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে।

গতকাল শুক্রবার সকালে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মানবাধিকার কর্মী ও গুম কমিশনের সদস্য মো: নূর খান লিটন বলেন, আগামীর বাংলাদেশে যেন গুম শব্দটি না থাকে, সে জন্য আমাদের যা যা করণীয় তা করতে হবে। আমরা সবাই মিলে ফ্যাসিজম তাড়িয়েছি, কিন্তু আমাদের নিজেদের মধ্যে যে ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিস্ট মনোভাব রয়েছে সেটিও দূর করতে হবে। আমাদের যে কাজগুলো ফ্যাসিজম ফিরে আসার পথ খুলে দেয়, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। গুম প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দল, সুশীলসমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

সিস্টেম পরিবর্তন না করে ব্যক্তি বিশেষকে টার্গেট করে এই গুমের সংস্কৃতি দূর করা সম্ভব নয় বলে জানান গুম কমিশনের সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস। তিনি বলেন, আমাদেরকে সশস্ত্র বাহিনীগুলোর ক্যারেক্টার পরিবর্তন করতে হবে। বাহিনীগুলোকে পর্যাপ্ত ম্যানপাওয়ার দিতে হবে। কিভাবে ননলিথাল ওয়েতে টর্চার না করে তথ্য বের করতে হয়, সেই ট্রেনিংয়েরও ব্যবস্থা করতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত পলিটিক্যাল পার্টিগুলো এই বাহিনীগুলোকে নিজেদের পলিটিক্যাল পান্ডা হিসেবে ব্যবহার করবে, ততদিন পর্যন্ত গুম খুন দূর হবে না। এজন্য ভবিষ্যৎ নেতাদের কাছ থেকে আমাদের এসব ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে হবে।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, দল মত নির্বিশেষে সবাই গুম খুনের শিকার। আইনের খসড়ায় অনেক প্রশ্ন রয়েছে। বিগত সময়ের সরকারি আমলারা এখনো পরিবর্তন হয়নি। আগামীতে আবারো কোনো দলীয় সরকার প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কিছু করতে চান, তখন সেটি আটকাবে কে? আমরা আর সেদিনে যেতে চাই না। ন্যায়বিচার প্রয়োজন। বিচারের দায়িত্ব ভুল ব্যক্তির কাছে গেলে হবে না।

জাতিসঙ্ঘের আবাসিক অফিসের জ্যেষ্ঠ মানবাধিকার উপদেষ্টা হুমা খান বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার এখনো ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি হস্তান্তর ও মৃত্যু সনদের মতো মৌলিক বিষয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেকের নামে এখনো মিথ্যা মামলা চলছে, যা দ্রুত নিষ্পত্তি করা দরকার। প্রস্তাবিত নতুন আইনে গুমের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে মিল নেই এবং শুধু বিভাগীয় শাস্তির কথা বলা হয়েছে, যা যথেষ্ট নয়। আইনটি যেন ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে, রাষ্ট্রকে রক্ষার জন্য নয় তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।

এ দিকে গুম কমিশন বলছে, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোর পেছনে ব্যক্তিগত অসদাচরণের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির একটি ‘পদ্ধতিগত সমস্যা’ কাজ করেছে। এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে এই ধরনের অপরাধগুলোকে নীরবে প্রশ্রয় দেওয়া হতো। যেসব ব্যক্তি এসব অপরাধ করতেন, তাদের প্রকৃত অর্থে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হতো না।

গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যেখানে এটিকে চলমান অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন হয়। এদিন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, খসড়া অধ্যাদেশে গুমকে সংজ্ঞায়নসহ চলমান অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। গোপন আটক কেন্দ্র স্থাপন বা ব্যবহারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে গুমসংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত করতে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। খসড়া অধ্যাদেশে গুম প্রতিরোধ, প্রতিকার ও সুরক্ষায় ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং অভিযোগ গঠনের ১২০ দিনের মধ্যে বিচারের বাধ্যবাধকতা, ভুক্তভোগী, তথ্যপ্রচারকারী ও সাক্ষীর সুরক্ষা, ভুক্তভোগীর ক্ষতিপূরণ ও আইনগত সহায়তা নিশ্চিতের বিধান সন্নিবেশ করা হয়েছে বলে জানান প্রেস সচিব।

গুম প্রতিরোধে রাজনৈতিক ভাবনা : বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, আমরা যদি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাই, সেক্ষেত্রে আমাদের তিনটা উদ্দেশ্য থাকবে। মানবাধিকার, আইনের অনুশাসন এবং বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, নতুন বাংলাদেশে এই গুম খুনের সংস্কৃতিকে কোনো অবস্থাতেই সহ্য করা হবে না। এই ধরনের সংস্কৃতি যেন আর ফিরে না আসে, তার জন্য যত ধরনের আইনি, রাজনৈতিক এবং নৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন তা আমাদের করতে হবে। জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদিব বলেন, গুম কমিশন তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, কিন্তু সেখানে ডিজিএফআই, এনএসআইয়ের কোনো বক্তব্য পাইনি। যেসব কর্মকর্তা ও সদস্যরা গত ১৫ বছর গুম ও খুনের সাথে জড়িত ছিল, তাদের নাম তালিকা করে প্রকাশ করতে হবে এবং বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

এইচআরএসএসের ৭ দাবি : মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি গুম প্রতিরোধে সাত দফা দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো- ১. বাংলাদেশকে অবশ্যই আন্তর্জাতিক কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব অল পারসন্স ফ্রম এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ২. যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন তাদের সম্পর্কে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের পরিবারকে তথ্য দিতে হবে। প্রতিটি গুমের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। চলমান মামলা ও অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে আলামত সংরক্ষণ, ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ৩. গুমের ঘটনা তদন্তের জন্য গঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশনকে আরো শক্তিশালী, কার্যকর ও স্থায়ী করতে হবে। ৪. গুমের শিকার ভিকটিম ও তাদের পরিবারের জন্য আইনি, আর্থিক ও মানসিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। যারা দীর্ঘদিন গুমের শিকার তাদের পরিবারকে ভিকটিমের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও সম্পদ ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংসদীয় তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং বাহিনীর সব সদস্যকে নিয়মিত মানবাধিকার বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। ৬. দেশের দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নেতাকর্মীকে নিয়মিত মানবাধিকার বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান এবং দলের নীতিমালা ও ইশতিহারে মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ৭. জনসচেতনতার জন্য পাঠ্যপুস্তক ও গণমাধ্যমে মানবাধিকার, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম বিষয়ে গুরুত্বসহ উল্লেখ করতে হবে।

অধিকারের র‌্যাব বিলুপ্তিসহ ১০ দফা সুপারিশ : গতকাল বিকেলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে এক সভায় গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে র‌্যাব বিলুপ্তিসহ ১০টি সুপারিশ তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্থা অধিকার। সুপারিশগুলো হলো-১. সব গুমের ঘটনায় স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত; ২. নিখোঁজদের সন্ধানে জাতীয় কৌশল ও নীতিমালা প্রণয়ন; ৩. ফিরে আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার; ৪. ঈবৎঃরভরপধঃব ড়ভ অনংবহপব প্রদান ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতকরণ; ৫. সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন; ৬. সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ বাতিল বা সংশোধন; ৭. র‌্যাব বিলুপ্তি; ৮. গুমের প্রমাণ নষ্টকারীদের বিচারের আওতায় আনা; ৯. দ্রুত ও ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিতকরণ; ১০. আইসিপিপিইডি বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মান অনুযায়ী ফরেনসিক, আইনগত ও তদন্তে সক্ষমতা উন্নত করতে বাংলাদেশ সরকারের কারিগরি ব্যবস্থা উন্নত করা।

অধিকারের সিনিয়র রিসার্চার তাসকিম ফাহমিনা বলেন, গুম একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনার সরকার রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে গুমকে ব্যবহার করেছে। আলোচিত আয়নাগুলোর মধ্যে ছিল ডিজিএফআইয়ের জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার এবং র‌্যাবের বন্দিশালা। যারা হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করতেন কিংবা ভারতের স্বার্থবিরোধী অবস্থান নিতেন তাদেরই গুম করে নির্যাতন করা হতো। অনেক গুমের শিকার ব্যক্তি এখনো ফিরে আসেনি। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে অনেকেই বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নতুন করে গুমের ঘটনা না ঘটলেও গুমের ঘটনাগুলো বিচার প্রক্রিয়া যেন ধীরভাবে চলছে। যদি জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করা না হয় এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আবার গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ চালু হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাক। তাই রাষ্ট্র সংস্কারের যে কার্যক্রম চলছে, যা জুলাই সনদ’ নামে পরিচিত, তা বাস্তবায়নের জন্য দল-মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছে অধিকার। তিনি বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ণ করতে হবে। সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ বাতিল বা সংশোধন করতে হবে। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনায় জড়িত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব) বিলুপ্ত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এ এম তাসমিরুল ইসলাম বলেন, বিগত দিনে সাধারণ কোনো বিষয়ে মানুষকে গুম করা হয়েছে। আর বছরের পর বছর কেউ গুমের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়নি। তাই আমাদের এখন সঠিক জায়গায় কথা বলতে না পারলে গুমের দেয়াল ভাঙা সম্ভব হবে না। প্রতিটি জেলার গুমের জন্য আলাদা ট্রাইব্যুলাল গঠনের সিদ্ধান্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে গুমবিষয়ক আইনে বলা হয়েছে ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে হবে। অন্য দিকে বলা হয়েছে, যদি গুম সাত বছরের বেশি হয়ে যায় তাহলে সেটি হত্যা হিসাবে বিবেচনা করা হবে। এতে করে বিচারকাজ বিলম্ব হবে বলে মনে করছি। আমাদের আশাহত হওয়া যাবে না। এই বিচার আদায় করার জন্য লড়াই করে যেতে হবে।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস বলেন, গত এক বছরে আমাদের কাছে এক হাজার ৮০০টি গুম বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসবের মধ্যে ২৫০টি কেস নিয়ে কাজ করে বুঝতে পেরেছি সবগুলো গুমের ঘটনা একই। যেখানে গুম হওয়া মানুষের বিভীষিকার বিষয় উঠে এসেছে। তবে অবাক লাগে এমন কিছু মানুষ আছে যারা এসব বিষয়কে বিশ্বাস করতে চাচ্ছে না। অন্য দিকে অনলাইনে থাকা আয়নাঘরের ছবিগুলোকে একটি দল কৌশলে সড়িয়ে ফেলছে। গুমের পর যদি কাউকে মেরে ফেলতে হলে সাত খুনের মতো নাটক সাজিয়ে মারা হতো। অন্য দিকে কাউকে ছাড়তে হলে জঙ্গির নাটক করে গ্রেফতার দেখিয়ে ছেড়ে দিত। গুমের পেছনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত রয়েছে। তবে এ দেশের সিস্টেম তাদেরকে খুনি বানিয়েছে। তাই আগে সেই সিস্টেমকে পাল্টাতে হবে।

পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, আমরা ১৮ বছর আগেও ভাবিনি গুম নিয়ে কথা বলতে হবে। দ্রুত বিচার করার জন্য র‌্যাব তৈরি করা হয়েছিল। আর সেটি এখন অনেকের ভয়ের কারণ হয়ে গেছে। বিগত সময়ে যে সরকারের বিরুদ্ধে গেছে তাকেই গুম করা হয়েছে। তখন নিজেদের কথা চিন্তা করে গণমাধ্যমও কথা বলতে চিন্তা করত। সঠিক বিচার না হওয়ার কারণে সরকারের সাথে সাধারণ মানুষের একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে। ফলে অনেকেই বিচারের আশা ছেড়ে দিচ্ছে। তবে হাল ছেড়ে দেবেন না। কারণ পরিবর্তন নিজেদেরই আনতে হবে। গুম কমিশনকে কিছুটা সময় দেন তাহলে সঠিক বিষয় উঠে আসবে। অনেকে গুম কমিশনের কাছে সাক্ষী দিতেও ভয় পায়। গুমবিষয়ক আইনে গুম পরিবারদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে।