
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে বিভক্ত অবস্থায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে বাম ধারার ছাত্র সংগঠনগুলো; এই সংগঠনগুলো থেকে প্যানেল গঠনের পাশাপাশি স্বতন্ত্র হিসেবে ভোটের মাঠে আছেন কেউ কেউ।
অন্তত তিনটি প্যানেল থেকে ভোটের মাঠে নামা বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, পৃথকভাবে ভোট নামার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেদের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি।
নিজেদের মধ্যে বিভক্তির এই রেষ ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে কি না, তা নিয়ে নেতাদের রয়েছে ভিন্নমত। কারও মনে হচ্ছে, ভোটে অবশ্যই কিছু প্রভাব ফেলবে। ‘বিন্দুমাত্র’ প্রভাব পড়বে না বলে মত কারও কারও।
এক বছর মেয়াদী ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৯ সালের মার্চ মাসে। ছয় বছর আগের সে নির্বাচনে বাম ধারার ছাত্র সংগঠনগুলো যেমন বিভক্ত ছিল, এবারও তাই।
তখন বাম ছাত্র সংগঠনগুলোর দুই মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্রঐক্যের ১১টি সংগঠন মিলে একটি প্যানেল দিয়েছিল। আলাদা প্যানেলে নির্বাচন করেছিল জাসদ ছাত্রলীগ ও বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী। এ দুটি সংগঠন এবার ভোটের মাঠে নেই।
বিভক্তি কেন, কী প্রভাব
বামদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠের নামতে সমঝোতার চেষ্টার বিষয়ে সাত বাম ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ প্যানেলের এজিএস প্রার্থী জাবির আহমেদ জুবেল বলেন, অনেকে রাজনৈতিক স্বার্থে এক হতে চায়নি।
“আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলাম এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ও অ্যাক্টিভিস্টদের, কিন্তু অনেকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে এক হতে চায় নাই। সেখানে আমরা যারা, সর্ববৃহৎ প্রগতিশীল শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছি।”
তাদের এ বিভাজন ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে কিনা, এমন প্রশ্নে বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর কেন্দ্রীয় এই সাধারণ সম্পাদক বলছেন, এ বিভক্তি তাদের কোনো ভোটে ‘বিন্দুমাত্র’ প্রভাব ফেলবে না।
তিন বাম ছাত্র সংগঠনের ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী নাইম হাসান হৃদয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা শুরু থেকেই এক হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমাদের মতামত এক না হওয়ায় হয়ত এক হতে পারিনি।
“আমরা এক হতে পারলে হয়ত আমাদের জাতীয় রাজনীতিতেও একটা ভিন্ন বার্তা যেত যে, সব প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন এক হয়ে এসেছে। কিন্তু তারা নিজেদের সবচেয়ে বেশি যোগ্য মনে করছে। সেখানে আমরা কী করবো?”
তাদের এ অনৈক্য ভোটের মাঠে কী প্রভাব ফেলবে, এমন প্রশ্নে নাইম বলেন, “এটা তো অবশ্যই, কিছুটা হলেও তো ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে। আমরা দীর্ঘ এক সপ্তাহ আলাপ-আলোচনা করেছি। সমঝোতায় আসতে পারিনি। সেখানে তো আর কিছু করার নেই।”
ছাত্র ফেডারেশন সমর্থিত ‘ইউনিটি টু রিবিল্ড’ প্যানেলের এজিএস প্রার্থী আরমানুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, “আমরা শুরুতেই উমামাকে সাথে নিয়ে এক হবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমরা ২০১৯ সালে স্বতন্ত্র নির্বাচন করেছি, এবারও স্বতন্ত্রভাবে লড়বো।
এ অনৈক্যের প্রভাব ভোটের মাঠে কতটা পড়তে পারে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটা তো সত্য যে আমাদের বিভক্তি ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে। আমরা মনে করি, শিক্ষার্থীরা ভোটের মাঠে ছাত্র সংগঠন এর চেয়ে দীর্ঘদিন কারা ছিল, কারা তাদের পক্ষে কাজ করবে সেটাকে অগ্রাধিকার দিবে।”
জুলাই অভ্যুত্থানের পরপর ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়েছেন সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সদস্যসচিব উমামা ফাতেমা। অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের একজন ছিলেন তিনি।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নতুনভাবে গড়ার পর প্ল্যাটফর্মটির মুখপাত্র হন উমামা। আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে গত ২৭ জুন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গও ছাড়েন তিনি।
বাম সংগঠনের সঙ্গে না গিয়ে স্বতন্ত্র প্যানেলে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উমামা ফাতেমা বলেন, “আমাকে বামদের সাথে মেলাচ্ছেন কেন? বাম ইস্যুতো অনেক আগে চলে গেছে, এটা নিয়ে নতুন করে চুলকানি কেন?
“আমরা মধ্যমপন্থি রাজনীতি করেছি, ছাত্র ফেডারেশন কখনও বাম রাজনীতি করেনি, তারা মধ্যমপন্থার রাজনীতি করে। আর আমি ছাত্র ফেডারেশন অনেক আগে ছেড়ে এসেছি।”
উমামা ছাত্র ফেডারেশন ছেড়ে আসার কথা বললেও ছাত্র ফেডারেশনের দেওয়া ‘ইউনিটি টু রিবিল্ড’ প্যানেলের ফেইসবুক পাতায় তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের জবাব দিতে দেখা গেছে।
প্রতিরোধ পর্ষদ
বাম ধারার সাত ছাত্র সংগঠনের প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ ভিপি পদে প্রার্থী করেছে শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিকে। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে শামসুন্নাহার হল সংসদের ভিপি হয়েছিলেন তিনি।
এই প্যানেলে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের একাংশ, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র কাউন্সিল, ছাত্র যুব আন্দোলন, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ ও গণতান্ত্রিক ছাত্র মঞ্চ রয়েছে।
এই প্যানেলের জিএস প্রার্থী মেঘমল্লার বসু ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি। এই প্যানেল থেকে এজিএস পদে প্রার্থী হয়েছেন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জাবির আহমেদ জুবেল।
আর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলন সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন হওয়া মোজাম্মেল হক সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের একাংশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক।
‘প্রতিরোধ পর্ষদে’ কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া পদে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি নুজিয়া হাসিন রাশা, আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক পদে ছাত্রফ্রন্টের আকাশ আলী, ক্যারিয়ার উন্নয়ন সম্পাদক পদে ছাত্র ইউনিয়নের লিটন ত্রিপুরা, পরিবহন সম্পাদক পদে ছাত্র ইউনিয়নের নিনাদ খান এবং আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে ছাত্র যুব আন্দোলনের নাইম উদ্দিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর ফারিয়া মতিন এই প্যানেল থেকে সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর মালিহা তাবাসসুম ক্রীড়া সম্পাদক ও বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর আবু মুজাহিদ আকাশ সমাজসেবা সম্পাদক পদে প্রার্থী হয়েছেন। স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক পদের শেখ তাসনুভা সৃষ্টি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদের প্রার্থী ফাতিহা ইশরাক কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন।
জুলাই আন্দোলনে আহত সানজিদা ইসলাম তন্বিকে সমর্থন দিয়ে এই প্যানেলের গবেষণা ও প্রকাশনা আলমগীর হোসেন মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। এখন তিনি নির্বাচন করবেন সদস্য পদে।
‘অপরাজেয় ৭১, অদম্য ২৪’
ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের একাংশ এবং বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল-বাংলাদেশ জাসদ) নিয়ে ‘অপরাজেয় ৭১-অদম্য ২৪’ প্যানেল ১৩ জন প্রার্থী দিতে পেরেছে।
এই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী নাইম হাসান হৃদয় বিসিএল-জাসদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতি। ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক এনামুল হাসান অনয় এই প্যানেলের জিএস এবং ছাত্রফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব অদিতি ইসলাম এজিএস প্রার্থী।
‘অপরাজেয় ৭১, অদম্য ২৪’ প্যানেলের মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয় সম্পাদক পদে ফাহমিদা আলম, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাকিব মাহমুদ, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক পদে আবদুল্লাহ ইবনে হাসান (জামিল), ছাত্র পরিবহন বিষয়ক সম্পাদক পদে মাসফিকুজ্জামান তাইন, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক পদে মিনহাজুল ইসলাম ফারহান এবং সদস্য পদে হাসিন, তর্পিতা ইসলাম অব্ধি, জুনাইদ হোসেন, আদনান মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমানকে প্রার্থী করা হয়েছে।
গবেষণা ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক পদে জুলাই আন্দোলনে আহত সানজিদা আহমেদ তন্বি এবং কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া বিষয়ক সম্পাদক পদে সুর্মী চাকমাকে সমর্থন দেওয়ার কথা বলেছে এই প্যানেল।
‘ইউনিটি টু রিবিল্ড’
ছাত্র ফেডারেশনের দেওয়া ‘ইউনিটি টু রিবিল্ড’ প্যানেল ভিপি এবং জিএস পদে কোনো প্রার্থী রাখেনি। তাদের এজিএস প্রার্থী আরমানুল হক সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক।
সমাজ-সেবা সম্পাদক পদে প্রার্থী সীমা আক্তার ছাত্র ফেডারেশনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। এই পদে তিনি একমাত্র নারী প্রার্থী।
সংগঠনের ঢাবি শাখার সদস্য সচিব সাকিবুর রহমান রনি ডাকসুতে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক পদে লড়ছেন। এই প্যানেল থেকে আখিরুল ইসলাম এবং নুসরাত জাহান সাউদা সদস্য পদপ্রার্থী।