Image description

পন্টেজ চার্জের (রক্ষণাবেক্ষণের মাশুল) ভিত্তিতে ট্রেনে ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে। এসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সম্প্রতি রেল ভবনে পাঠানো হয়েছে। এটি এখন যাচাই-বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। নাম প্রকাশ না করে রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সর্বশেষ ৯ বছর আগে ট্রেনে ভাড়া বাড়ানো হয়।

এরপর গত সরকার একাধিকবার ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিলেও জনরোষের আশঙ্কায় তা থেকে সরে আসে। এবার রেলওয়ে কৌশল অবলম্বন করে সরাসরি টিকিটের দাম না বাড়িয়ে পন্টেজ চার্জ বা মাশুল আরোপের মাধ্যমে ট্রেনে ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে করে ট্রেন ভ্রমণকারীদের ওপর চাপ বাড়বে।

পন্টেজ চার্জ হচ্ছে রেলপথের মধ্যে কোনো সেতু বা সমজাতীয় অবকাঠামো পড়লে ভাড়ার সঙ্গে নির্ধারণ করা বাড়তি মাশুল।

সে ক্ষেত্রে ১০০ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুকে দূরত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হবে আড়াই কিলোমিটার। এতে করে রেলপথের দূরত্ব (কাগজে-কলমে) বেড়ে যাবে। আর সেই অনুপাতে মাশুল বসবে। প্রকৌশল বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলে আটটি রুটে এ রকম সেতু রয়েছে ২৮টি।
 
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বর্তমান ভাড়ার দূরত্ব ৩৪৬ কিলোমিটার। পন্টেজ চার্জ নির্ধারণের পর এই দূরত্ব হবে ৩৮১ কিলোমিটার।

এ বিষয়ে জানতে গতকাল বৃহস্পতিবার রেলওয়ের মহাপরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন), পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক, প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তাসহ ঊর্ধ্বতন আরো কয়েকজন কর্মকর্তাকে ফোন করা হয়। দুপুরের পর থেকে বিকেল পর্যন্ত বেশ কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কেউ ফোন ধরেননি।

কনজিউমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বৃহস্পতিবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ট্রেনে নতুন করে ভাড়া বাড়ানোর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

সরাসরি টিকিটে কিংবা পন্টেজ চার্জ আরোপের মাধ্যমে হলেও ভাড়া বাড়লে প্রকৃতপক্ষে মানুষের কষ্ট বাড়বে।

এক প্রশ্নের জবাবে এস এম নাজের হোসাইন বলেন, রেলওয়েতে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নেই। কেনাকাটা, টিকিট বিক্রি, ভূমিসহ সব কিছুতেই অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা রয়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ সরকারি কোষাগারে না গিয়ে ব্যক্তির পকেটে ঢুকে বাইরে চলে যাচ্ছে। 

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, পন্টেজ চার্জে ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব কার্যকর হলে পূর্বাঞ্চলের সাত-আটটি রুটে ট্রেনভাড়া বাড়বে। ঢাকা-চট্টগ্রামের বিরতিহীন ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনারবাংলা এক্সপ্রেসের স্নিগ্ধা আসনে বর্তমানে ভাড়া ভ্যাটসহ ৮৫৫ টাকা (যাত্রীপ্রতি)। পন্টেজ চার্জ আরোপের পর তা দাঁড়াবে ৯৪৫ টাকায়। অর্থাৎ আগের তুলনায় ৯০ টাকা বেশি গুনতে হবে যাত্রীদের। এভাবে ট্রেন ও আসনভেদে ভাড়া বাড়তে পারে ১৫ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত।

জানা যায়, রেলওয়েতে লোকসান সামাল দিতে আয় বৃদ্ধি ও ব্যয় হ্রাস নিয়ে সম্প্রতি রেলওয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব টিকিটের ভাড়া না বাড়িয়ে আয় বৃদ্ধির পরামর্শ দেন। তিনি রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের ১০০ মিটারের বেশি লম্বা সেতুতে পন্টেজ চার্জ সমন্বয়ের জন্য নির্দেশনা দেন। ওই সভায় ১৩টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে এক নম্বরে রাখা হয় পন্টেজ চার্জ আরোপের বিষয়টি।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলের আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের নিয়মানুযায়ী সেতুতে এক্সট্রা ডিসট্যান্স অব পন্টেজ চার্জ (রক্ষণাবেক্ষণ মাশুল) আরোপের নিয়ম রয়েছে। তবে রেলওয়ে শুধু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, যমুনা সেতু, ভৈরব ও ব্রহ্মপুত্র সেতু থেকে সরল দূরত্বের অতিরিক্ত পন্টেজ চার্জ আদায় করত ভাড়ার সঙ্গে। সর্বশেষ পদ্মা সেতুতে ট্রেন সার্ভিস চালুর সময় পন্টেজ চার্জ ছাড়াও ভায়াডাক্টের পন্টেজ চার্জ আরোপ করা হয়। এই সেতুর ৬.১৫ কিলোমিটার পন্টেজ দূরত্ব হিসাবে ১৫৪ কিলোমিটার এবং গেণ্ডারিয়া থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার ফ্লাইওভার পন্টেজ দূরত্ব হিসাবে ১১৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়। দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ চালুর সময় ছয়টি সেতুতে একই চার্জ যুক্ত করে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বাণিজ্যিক দূরত্ব নির্ধারণ করেছিল রেলওয়ে। ১০০ কিলোমিটার এই রেলপথে থাকা ছয়টি ১০০ মিটারের বড় সেতুর জন্য পন্টেজ চার্জ যুক্ত করে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে রেলওয়েতে এক টাকা আয়ের বিপরীতে আড়াই টাকারও বেশি ব্যয় হয়। গত বছরের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে এক টাকা আয়ের বিপরীতে ব্যয় দুই টাকার নিচে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে রেলের ভূমির ইজারা মূল্যবৃদ্ধি, ভূমি উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক ব্যবহার, অযাচিত ব্যয় কমানোর দিকে নজর দেওয়া হয়েছে। তবে প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে।