Image description
♦ বড় অংশ যায় হায়দরাবাদ গুজরাট মুম্বাই বেঙ্গালুরু ♦ বাধ্য করা হয় দেহব্যবসা ড্যান্স বার, ম্যাসাজ পারলারের কাজে

বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে নারী পাচার কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। সীমান্ত পার করে নারীদের পাঠানো হচ্ছে ভারতের হায়দরাবাদ, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, রাইপুর, সুরাট ইত্যাদি গন্তব্যে। নতুন গন্তব্যের মধ্যে আছে ঝাড়খণ্ড, বিহারও। দর্জির দোকান, বিউটি পারলার, ইস্পাত কারখানা, গৃহপরিচারিকার কাজসহ বিভিন্ন জায়গায় বেশি বেতনে চাকরির টোপ দিয়ে মেয়েদের ভারতে নিয়ে জোর করে দেহব্যবসায় বাধ্য করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হায়দরাবাদ, গুজরাটসহ যে স্থানগুলোয় নারীরা পাচার হচ্ছে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কম। মানব পাচার রোধে সেখানে পুলিশি অভিযানও কম হয়। এ ছাড়া এসব স্থানে পতিতালয়গুলোয় সরকারি অনুমোদন লাগে না। সেখানে আবাসিক এলাকার বাড়িগুলো একটু দূরে দূরে অবস্থিত। ফলে অনেক বাড়িতেও অবৈধ কার্যক্রম হয়।

ভারতে মানব পাচারকারী চক্রের চাহিদা সাধারণত বাংলাদেশের কম বয়সি মেয়ে ও নারী। পতিতালয়, কম দামি হোটেলে যৌনকাজ, ড্যান্স বার, ম্যাসাজ পারলার এবং গৃহপরিচারিকা হিসেবে এদের ব্যবহার করা হয়। ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) জরিপ বলছে, নিরাপত্তা বেষ্টনী দুর্বল হওয়ায় পাচারের শিকার বেশির ভাগ ব্যক্তিকে যশোর ও সাতক্ষীরা থেকে সীমান্তবর্তী ঘোজাডাঙ্গা ও হাকিমপুর দিয়ে পাচার করা হয়। এ ছাড়া স্থলপথে সহজ রুটের জন্য বেনাপোল বর্ডার ক্রসিংও মানব পাচারে ব্যবহার হয়। দেশের অন্য জেলার মধ্যে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং রাজশাহী থেকেও নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে।

মানব পাচার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘রাইটস যশোর’-এর নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, আগে থেকেই হায়দরাবাদে নারী ও শিশু পাচার ঘটছিল। এর সঙ্গে গুজরাটও আছে। পাচারকারীরা প্রলোভনে ফেলে অসহায়-দরিদ্র মেয়ে ও নারীদের বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে। আগে পাচার নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো মাসে একবার বৈঠক করলেও এখন বছরেও তা হচ্ছে না। এতে এ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা যাচ্ছে না। এ ছাড়া পাচারের ঘটনায় সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরিত্র আগের মতোই আছে। পাচারকারীরা ভিকটিমদের হয়রানি করছে। এ ক্ষেত্রে অনেক পুলিশ পাচারকারীদের পক্ষ নিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পাচার নিয়ে কাজ করে এমন এনজিওগুলোকে ভারত সরকার তথ্য দিচ্ছে না। আগে এনজিও বা সেফ হোমগুলো যেমন বাংলাদেশের পাচার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করত, এখন তা করছে না। এতে পাচারের শিকার মেয়েদের দেশে আসার প্রক্রিয়ার গতি কিছুটা কমে গেছে। হায়দরাবাদে দেহব্যবসাসংক্রান্ত এক মামলার তদন্তে সম্প্রতি জানা যায়, ভালো চাকরির লোভ দিয়ে বাংলাদেশ থেকে মেয়েদের ভারতে পাচার করা হতো। পাচারের জন্য এজেন্টদের মাথাপিছু দেওয়া হতো ৪-৫ হাজার টাকা। এ কাজে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু দালালকে ব্যবহার করে হায়দরাবাদের মানব পাচারকারী চক্র। এ চক্রটি মূলত বাংলাদেশিরাই চালাতেন বলে পুলিশি তদন্তে উঠে আসে। পাচারের জন্য পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত ব্যবহার করত এ চক্র। ভারতের আইন প্রয়োগকারী এবং অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এবং দেশটির জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) এ মামলার তদন্তে নামে। মামলায় যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশি। এ বাংলাদেশিরা ভুয়া নথিতে ভারতে থাকছিলেন বলে অভিযোগ। বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হওয়ার পরও বাংলাদেশ থেকে মেয়েদের ভারতে পাচারকারী চক্রটি সক্রিয় ছিল। ইডির তদন্তে জানা যায়, এ চক্রের সঙ্গে বেশ কিছু এজেন্টও জড়িত ছিল। আর্থিক লেনদেনের জন্য তারা বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট এবং ‘অনলাইন ওয়ালেট’ ব্যবহার করতেন। বাংলাদেশি মেয়েদের পাচারের জন্য ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সক্রিয় এ দালালদের মাথাপিছু ৪-৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হতো। এ টাকা পাচারের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন জনের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হতো। কখনো কখনো নগদেও লেনদেন করা হতো। টাকা লেনদেনের ক্ষেত্রে তদন্তকারীদের বা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সন্দেহ এড়াতে ছোট ছোট অঙ্কে টাকা ভাগ করে তা পাঠানো হতো। এ টাকা পাঠানো হতো বাংলাদেশেও।