Image description

রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর সড়ক, ফুটপাত, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশনসহ জনবহুল স্থানে ভিক্ষুুকদের উপস্থিতি এখন চোখে পড়ার মতো। অথচ সরকারি তথ্য বলছে, ভিক্ষুক পুনর্বাসনে আশ্রয়কেন্দ্র, প্রশিক্ষণকেন্দ্রেও কর্মসংস্থানের উদ্যোগ চালু আছে।

প্রশ্ন উঠেছে, এত উদ্যোগের পরও ভিক্ষুকরা কেন এখনো সড়কেই ভিড় করছে, কেন স্বাবলম্বী হচ্ছে না?

ঢাকাসহ সারা দেশে ভিক্ষুক পুনর্বাসনের দায়িত্বে রয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। তাদের ভাষ্য, আশ্রয়কেন্দ্রগুলো বহু পুরনো ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় পর্যাপ্ত মানুষকে জায়গা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এর সঙ্গে রয়েছে জনবল সংকট, ভিক্ষাবৃত্তিকেন্দ্রিক চক্রের প্রভাব, অপ্রতুল বাজেট, সচেতনতার ঘাটতি ও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা। এসব কারণে দেশে কার্যকরভাবে ভিক্ষুকমুক্ত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না।

সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে কয়েক হাজার ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের ঘোষণা দেওয়া হয়।

এদিকে ভিক্ষাবৃত্তি নিবৃত্তিতে কয়েক মাস ধরে সরকারের কোনো অভিযান নেই।

এতে ভিক্ষুুকরা এখন সবখানে ছড়িয়ে পড়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে যারা ছিল, নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে তারাও বের হয়ে ফের ভিক্ষায় নেমেছে।

বর্তমানে দেশে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে ছয়টি। এগুলো রয়েছে ময়মনসিংহের ত্রিশালের ধলায়, গাজীপুরের পুবাইল ও কাশিমপুর, নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল, মানিকগঞ্জ  ও ঢাকার মিরপুরে।

তবে ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ২০১৭ সাল থেকে মানিকগঞ্জের কেন্দ্রটি আর ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

ঢাকার মিরপুরে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, এই আশ্রয়কেন্দ্রে একজন ভিক্ষুকও নেই। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলামিন জামালী বলেন, যাদের মেয়াদ শেষ হয়েছে, তারা চলে গেছে। এ কারণে নতুন ভিক্ষুক নেই।

গাজীপুরের দুটি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রেরও একই অবস্থা।

কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, কয়েক মাস কোনো অভিযান হয়নি, তাই ভিক্ষুুকও নেই। যাদের ২০-২৫ দিনের আটকাদেশ দেওয়া হয়, তাদের স্বজনরা এসে নিয়ে যায়। আর যারা তিন মাসের বেশি আটকাদেশ পায়, তাদের বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একাধিক আশ্রয়কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের মতে, ভিক্ষুকরা এসব আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে চায় না, প্রশিক্ষণও নিতে চায় না।

নারায়ণগঞ্জের সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী পরিচালক মীর মো. আবদুল হান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, দু-একজন ভিক্ষুক থাকতে পারে। অভিযান না হওয়ায় ভিক্ষুুক নেই।

সম্প্রতি সরেজমিনে রাজধানীর পল্টন ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান সড়কসহ অলিগলি, ফুটপাত, বাস, হোটেল-রেস্তোরাঁ, মসজিদের সামনে ঘুরঘুর করছে ভিক্ষুক। কেউ খাবারের জন্য, কেউ চিকিৎসার জন্য, কেউবা মেয়ের বিয়ের কথা বলে টাকা চাইছে।

কারওয়ান বাজারের এনটিভি এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ও বসে থাকা ক্রেতাদের কাছে একটু পর পর গিয়ে সাহায্য চাইছে ভিক্ষুকরা। একজনকে কিছু দিলে আর রক্ষা নেই। আরো কয়েকজন এসে ভিড় জমাচ্ছে, যা বাড়তি বিড়ম্বনা তৈরি করছে।

ভিক্ষুুকদের উৎপাতে বিরক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আদনান মনির কালের কণ্ঠকে বলেন, দুপুরের খাবার খেয়ে এই গলিতে একটু চা খেতে আসি। কিন্তু ভিক্ষুকদের উপদ্রবে তা মাটি হয়ে যায়। একজনকে ১০ টাকা দিলে আরো পাঁচজন এসে দাঁড়ায়।

নাসরিন আক্তার নামের এক ভিক্ষুক কালের কণ্ঠকে বলেন, আমার বুড়া মা ঘরে পইড়া আছে। ভিক্ষা কইরা নিজেরই হয় না, আর তাঁর খাওন জুটামু কী!

মো. কাশেম নামের আরেক ভিক্ষুক জানান, তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জ। আগে এলাকায় দিনমজুরের কাজ করতেন। এখন বয়স বেড়ে যাওয়ায় কেউ কাজে নেয় না। দুই মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর তারাও খোঁজ নেয় না। তাই তিনি ও তাঁর স্ত্রী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভিক্ষা করছেন।

ঢাকা শহরে বহু প্রতিবন্ধী ভিক্ষুক দেখা যায়, যাঁদের কেউ কেউ সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ভাতাও পান। সচিবালয়ের সামনে ভিক্ষারত রাজু নামের এক প্রতিবন্ধী বলেন, তিন মাসে আড়াই হাজার টেকা ভাতা পাই। এতে বউ-পোলাপানের খরচ চলে না। তাই বাধ্য হইয়া ভিক্ষা করি।

ঢাকা শহরে ভিক্ষাবৃত্তি রোধের জন্য প্রাথমিকভাবে সরকার শহরের কিছু এলাকা ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করেছিল। এর মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দরের প্রবেশ পথের পূর্ব পাশের চৌরাস্তা, বিমানবন্দরের পুলিশ ফাঁড়ি ও এর আশপাশ এলাকা, হোটেল র্যাডিসন সংলগ্ন এলাকা, ভিআইপি রোড, বেইলি রোড, সোনারগাঁও হোটেল, রূপসী বাংলা হোটেল সংলগ্ন এলাকা, রবীন্দ্র সরণি ও কূটনৈতিক জোন। কিন্তু এখন এসব স্থানে ভিক্ষুুক দেখা যাচ্ছে।

দেশে ভিক্ষুুকের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান নেই। সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক হিসাব অনুযায়ী, দেশে ভিক্ষুুকের সংখ্যা সাড়ে সাত লাখের মতো। এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক জরিপ হয়নি।

ভিক্ষুক নির্মূলের জন্য সরকার ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান নীতিমালা-২০১৮ প্রণয়ন করে। বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটি তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, বিভাগীয় ও জাতীয় স্তরে কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়ের জন্য বিভিন্ন কমিটিও রয়েছে।

আবার সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, ভিক্ষুুক পুনর্বাসনে বাজেট অপর্যাপ্ত। তা আবার নিয়মিত পাওয়া যায় না। বছরে ৬৪ জেলার জন্য মাত্র ১১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়। চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ এখনো পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেলে উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হবে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু হলেও কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১২ কোটি টাকা।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভিক্ষুুক, চা শ্রমিক ও হিজড়া) মো. শাহজাহান বলেন, ভিক্ষুুক আটকের জন্য সর্বশেষ গত জুন মাসে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। তাদের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল। আবার আগামী মাসে অভিযান শুরু হবে।