Image description
♦ ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশি কাগজ ও মুদ্রণশিল্প ♦ বইয়ের মান নিয়েও থাকবে প্রশ্ন

২০২৬ শিক্ষাবর্ষে নতুন পাঠ্যবই ছাপা নিয়ে ভিন্ন পথে এগোচ্ছে সরকার। গত কয়েক বছর শুধু দেশি প্রেস মালিকরা বই ছাপার কাজ করলেও এবার মাধ্যমিকের তিন শ্রেণির (ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম) বই ছাপানোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর ফলে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজের জন্য দরপত্রে অংশ নিতে পারবে। আন্তর্জাতিক দরপত্র মাধ্যমে বিদেশে বই ছাপা হলে বিদেশে চলে যাবে দেশের ৬০০ কোটি টাকা। উল্লেখ্য, বিদেশে পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ প্রথম শুরু হয় আওয়ামী লীগ আমলে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান করা হলে সিংহভাগ কাজ চলে যাবে বিদেশিদের হাতে। এতে করে এদেশের কাগজ শিল্প ও ছাপাখানার মালিকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া এর মাধ্যমে দেশের টাকা বাইরে চলে যাবে। বইয়ের মান নিয়েও থাকবে প্রশ্ন। তাই দেশি শিল্প বাঁচাতে স্থানীয় দরপত্রের মাধ্যমে বই ছাপানোর দাবি জানিয়েছেন মুদ্রণ শিল্প সমিতির নেতারা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ২৭তম সভা শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে আগামী শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই দরপত্রের মাধ্যমে মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের জন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০০৮ এর বিধি ৮৩ (১) (ক) প্রয়োগ করে ক্রয় প্রক্রিয়ার সময় হ্রাসকরণের নীতিগত অনুমোদনের প্রস্তাব করা হয়। উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি এ সংক্রান্ত প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদনের সুপারিশ করে। তথ্যমতে, প্রাথমিকের ৯ কোটি বই ছাপার কেনাকাটার প্রস্তাব অনুমোদন করা হলেও এ বৈঠকে আটকে দেওয়া হয়েছে মাধ্যমিকের ২১ কোটি বই কেনাকাটার প্রস্তাব। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির জন্য ১১ কোটি ৮৯ লাখ ৩২ হাজার ৮০২ কপি বই ছাপানোর জন্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় উত্থাপন হয়, যার মোট ব্যয় ধরা হয় ৬০৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এ প্রস্তাব অনুমোদন দেয়নি কমিটি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ৮৩(১) (ক) অনুযায়ী আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির ক্ষেত্রে দরপত্র প্রস্তুত ও দাখিলের জন্য কমপক্ষে ৪২ দিন সময় দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে জরুরি প্রয়োজন বা দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে এ সময়সীমা কমানোর সুযোগ থাকে। সেই বিধিতে সংশোধিত প্রস্তাব পাস করেছে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত কমিটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক দরপত্রের জন্যই সরকার বিধিতে এই পরিবর্তন এনেছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি বই ছাপার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এনসিটিবি সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) ড. রিয়াদ চৌধুরী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তবে এনসিটিবি কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এনসিটিবির কেউ থাকেন না। তাই আন্তর্জাতিক দরপত্র নিয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্যও তাদের কাছে নেই। সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে জানালে মন্তব্য করা যাবে।

এদিকে বই ছাপানোর কাজে দেশি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা থাকার পরও সরকারের আন্তর্জাতিক দরপত্রে যাওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন কাগজশিল্প সংশ্লিষ্ট মালিক-শ্রমিক ও প্রেস মালিকরা। তারা বলছেন, সরকারের এমন সিদ্ধান্তে দেশের কয়েক লাখ মানুষ কর্মসংস্থান হারানোর পাশাপাশি এ শিল্পে ধস নামবে। তারা বলছেন, বই ছাপার কাগজ, কালি, গ্লু, মেশিনারি, প্যাকেজিং ও সরবরাহে জড়িত লাখো শ্রমিক সরকারের এ সিদ্ধান্তে বেকার হয়ে পড়বেন। এ ছাড়া অনেক কারখানা বছরে শুধু সরকারের এসব বই ছাপার অপেক্ষায় থাকেন। এ কাজ বিদেশিদের হাতে গেলে দেশের অনেক শ্রমিক বেকার হওয়ার পাশাপাশি অনেক ছাপাখানা দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা আছে। এমন পরিস্থিতিতে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন মুদ্রণ শিল্প সমিতির নেতারা। আন্তর্জাতিক দরপত্র ঠেকাতে তারা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে যোগাযোগ করছেন বলে জানা গেছে। মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যে বিধি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে চায় সরকার সে বিধি অনুযায়ী বিদেশি ছাপাখানাগুলোর ভ্যাট-ট্যাক্স এদেশের সরকার বহন করে থাকে। আর দেশি ছাপাখানা কাজ পেলে আমরা সরকারকে ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করে থাকি। এর ফলে দেশের ছাপাখানাগুলো বিদেশি ছাপাখানার চেয়ে কম দরে বই ছাপতে পারবে না। সরকার যে বিধি অবলম্বন করছে সে হিসেবে বই ছাপার সব কাজ বিদেশিদের হাতে চলে যাবে। এর ফলে আমাদের দেশের কাগজ শিল্প ও ছাপাখানা বড় ধাক্কা খাবে। অনেক ছাপাখানা বন্ধ হয়ে যাবে। সরকারকে বই ছাপার ক্ষেত্রে দেশি স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার অনুরোধ জানান মুদ্রণ শিল্প সমিতির নেতারা।