Image description
♦ নিরাপদ ট্রানজিট বাংলাদেশ ♦ কোকেন মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা ♦ ১১ বছরে ৫০ কোটি টাকার কোকেন জব্দ

ভয়ংকর মাদক কোকেন পাচারে জড়িত রাঘববোয়ালরা। তবে তাদের নাম থেকে যাচ্ছে আড়ালেই। আন্তর্জাতিক মাফিয়ারা বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করলেও ধরা পড়া চালানের গন্তব্য থেকে যাচ্ছে অজানা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ১১ বছরে ৭৫০ কোটি টাকার প্রায় ৫০ কেজি কোকেন উদ্ধার হলেও অন্তত ১০ গুণ মাদক পাচার হয়েছে এই রুট ব্যবহার করে। আইনি দুর্বলতার কারণে কোকেন মামলাগুলোর বিচার অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ৬ জুন চট্টগ্রাম বন্দরে সূর্যমুখী তেলের চালানে কোকেন জব্দ হয়। পুলিশ ও শুল্ক গোয়েন্দা তদন্তে একটি ড্রামের নমুনায় কোকেন শনাক্ত করা হয়। তেলের চালানের ১০৭টি ড্রামের মধ্যে দুটি ড্রামের (৯৬ ও ৫৯ নম্বর) নমুনায় কোকেন শনাক্ত হয়। দেশের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান নেপথ্য থেকে ওই কোকেন চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে এসেছিল, যা একাধিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসে। যদিও কোকেন জব্দের ঘটনায় চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. কামরুজ্জামান ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে আটজনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দেন। আদালত তা গ্রহণ না করে র‌্যাবকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিলে দুজন আসামির নাম যুক্ত করা ছাড়া (নূর মোহাম্মদ ও তার ভাই মোস্তাক আহমেদ) র‌্যাবের তদন্তেও চালানটির গন্তব্য বের করা সম্ভব হয়নি। র‌্যাব ২০১৭ সালের ৩ এপ্রিল অভিযোগপত্র জমা দেয়। তবে হাই কোর্ট ওই বছরেরই ৮ অক্টোবর মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করেন।

২০১৩ সালের জুন মাসে পেরুর নাগরিক জন পাভলো রাফায়েল ৩ কেজি কোকেনসহ লা ভিন্সি হোটেল থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ওই ঘটনার তদন্তে উঠে আসে তিনি বারিধারার ‘ক্রস ওসান প্রা. লি.’ এর আমন্ত্রণে বাংলাদেশে আসেন। ওই ঘটনায় ওই কোম্পানির মালিক মোস্তফা আশরাফ ও মোস্তফা কামাল, সাদিয়া আহমেদ এবং দুই কর্মচারী আশরাফ নাসিম ও তানিয়া আসামি হন। মোস্তফা আশরাফ গ্রেপ্তার হলেও কিছুদিন পর জামিন নিয়ে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বিদেশে পাড়ি দেন।

আন্তর্জাতিক চক্র ও বাংলাদেশ : ডিএনসি বলছে, বাংলাদেশ ভৌগোলিক কারণে আন্তর্জাতিক কোকেন চক্রের জন্য সহজ ট্রানজিট রুট। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কোকেন আসে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশে। এরপর ভারত, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় চলে যায়। গত ১১ বছরে জব্দ করা প্রায় ৫০ কেজি কোকেনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। সর্বশেষ গত সোমবার মধ্যরাতে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে সাড়ে ৮ কেজির বেশি কোকেনসহ গ্রেপ্তার হওয়া ক্যারেন পেতুলা স্টাফেন ব্রাজিল থেকে কোকেন সংগ্রহ করেন। এরপর সেখান থেকে তিনি নিউইয়র্কে আসেন। সেখান থেকে কাতার ও দোহা হয়ে ঢাকায় আসেন।

যদিও আন্তর্জাতিক চক্রের বিষয়ে ডিএনসি খোঁজখবর নিয়ে জানতে পেরেছে, বাংলাদেশে কোকেন পাচারের প্রধান আন্তর্জাতিক চক্রের প্রধান হলেন ডন ফ্রাংকি। তিনি এ দেশের কিছু পোশাক ব্যবসার আড়ালে কোকেনের কারবার করে আসছিলেন। টানা প্রায় সাত বছর তিনি বাংলাদেশকে কোকেনের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করেছেন। একপর্যায়ে দেশীয় মাদক গডফাদারদের সহযোগিতায় তিনি দেশ ছাড়লেও নাইজেরিয়ায় বসে মাদক কারবার সমন্বয় করছেন বলে জানা গেছে।

ডিএনসির অনুসন্ধান বলছে, বাংলাদেশ ভৌগোলিক কারণেই মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ হয়ে ভারত, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে কোকেন পাচার হচ্ছে। বিশেষ করে এশিয়ার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান), গোল্ডেন ওয়েজ (ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ ও নেপাল এবং ভুটানোর কিছু অংশ) নামে পরিচিত মাদক চোরাচালানের তিনটি প্রধান অঞ্চলের কেন্দ্রে বাংলাদেশের অবস্থান। আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিরা বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃত বাহকরা মূল চক্রের তথ্য দিতে অক্ষম। ফলে রাঘববোয়ালদের নাম ও অবস্থান অজানা। তদন্ত চললেও আন্তর্জাতিক চক্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া সম্ভব হয়নি।

ডিএনসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক চক্র কোটি কোটি টাকার কোকেন পাচারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি জব্দ চালান, যদিও বড় খবর হয়, তবু মূল চক্রের দখল এখনো আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

দেশে কোকেনের চাহিদা নেই, তবু ট্রানজিট চলছে : ডিএনসির অতিরিক্ত মহাপরিচালক গোলাম আজম বলেন, ‘বাংলাদেশে কোকেনের বাজার নেই। তার পরও আন্তর্জাতিক চক্র দেশকে ব্যবহার করছে।’ দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কোকেনের প্রচলিত রুটে তল্লাশির কারণে চক্র নতুন পথ খুঁজছে। বিমান ও স্থলপথে কোকেন পাচার অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, দেশে নতুন ছয় ধরনের মাদক প্রবেশ করছে। এগুলো হলো- খাত, আইস, পিল, ক্রিস্টাল, এমডিএমএ ও অ্যামফিটামিন। এসব মাদক ভুয়া ঘোষণায় বিদেশ থেকে আনা হচ্ছে, যা তরুণ সমাজের জন্য বড় হুমকি।

এজাহারে দুর্বলতা : গত ২৬ আগস্ট মধ্যরাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৮.৬৬ কেজি কোকেন জব্দ হয়। গ্রেপ্তার আসামি গায়ানার নাগরিক এম এস ক্যারেন পেতুলা স্টাফেন পাঁচ দিনের রিমান্ডে থাকলেও এখনো পর্যন্ত তার কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য বের করতে সক্ষম হননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। বিমানবন্দর থানায় দায়ের হওয়া মামলার বাদী সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আনিসুল হক। মামলার এজাহার বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জব্দ তালিকায় বাজেয়াপ্তযোগ্য বস্তু আটক, ব্যবস্থাপনা ও নিষ্পত্তিকরণ বিধিমালা অনুসরণ করা হয়নি। সময়ের ব্যাপক গরমিল, জব্দকারী কর্মকর্তার নাম, পদবি ও স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক হলেও এ ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। আসামির ছবি, ভিডিও এবং ইনভাইটেশন লেটার ও অন অ্যারাইভাল ভিসা জব্দ করা হয়নি। আসামির মোবাইল ফোন ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আসামির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশি ও বিদেশি অপরাধীদের চিহ্নিত করা হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আলতাফ হোসাইন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মামলার এজাহারে দুর্বলতা থাকলে মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত আসামি পার পেয়ে যায়। যা ন্যায়বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুতর ব্যত্যয়। গত সোমবার ৮.৬৬ কেজি কোকেন জব্দের ঘটনায় এজাহারে অনেক ভুল ধরা পড়েছে। এগুলো টার্গেট করেই করা হয়েছে কি না- তা অবিলম্বে গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিচারিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করার স্বার্থে ওই ত্রুটিসমূহ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট আদালতকে অবহিত করা উচিত।