Image description

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে জাতীয় স্মৃতিসৌধে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের স্মরণ করেছে জাতি। ভোর থেকেই দলে দলে ফুল, ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে শ্রদ্ধা জানাতে স্মৃতিসৌধে আসেন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও নানা শ্রেণি-পেশার  মানুষ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বেদি। এ সময় অনেককে লাল-সবুজের পোশাক পরে আসতে দেখা গেছে। স্বাধীনতা দিবসে শ্রদ্ধা জানাতে আসা অধিকাংশই জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্যে জোর দিয়েছেন। বলেছেন, আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও আমরা যেন জাতীয় স্বার্থে ২০২৪-এর মতো ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি সেটাই প্রত্যাশা। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের প্রয়োজনে ডাক পড়লে সবাই আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে এক কাতারে দাঁড়াবো। গতকাল ভোর ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে জাতীয় স্মৃতিসৌধের বেদিতে প্রথমে প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সকাল ৬টা ১১ মিনিটে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর শহীদদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। এ সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত একটি চৌকস দল তাকে রাষ্ট্রীয় অভিবাদন জানায়। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। এরপর শ্রদ্ধা জানান বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা। শ্রদ্ধা জানান উপদেষ্টামণ্ডলী ও বিদেশি কূটনীতিকরাও। 

সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিগণ। শ্রদ্ধা জানাতে আসেন সরকারের উপদেষ্টারাও। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জাতীয় স্বার্থে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা ঐকমত্য পোষণ করবো। কিন্তু একেকজন মানুষের চিন্তাভাবনা এবং দৃষ্টিভঙ্গি একেক রকম। সেসব দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়গুলো কমিয়ে আনতে কিছুটা সময় তো লাগবেই। একটা সরকারের জন্য গতানুগতিক কিছু চ্যালেঞ্জ তো থাকেই। তবে এখন একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বিভিন্ন সংস্কার বিষয়ে ঐকমত্য গড়া। সেটা অবশ্যই একটা প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে যেতে হবে। এটাকে চ্যালেঞ্জ বলেন আর না বলেন, একটা প্রক্রিয়া তো বটেই। আমাদের জন্য ওটাতে সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াকে একটা বড় বিষয় বলে আমি মনে করি। আরেকটা হচ্ছে- নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে করে দেয়া, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা। রাজনৈতিক দলগুলো সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকেই প্রাধান্য দেবে বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমাদের অনেকের চেয়ে তারা তো আরও অনেক বেশি অভিজ্ঞ। ফলে আমি মনে করি জনগণকে আস্থায় যদি আনতে হয়, তাহলে যে সংস্কারগুলোর দাবি জনগণের ক্ষেত্রে ওঠে, সেগুলোর বিষয়ে ঐকমত্যে না পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই।

 সব সময় জনগণের মতামতের সঙ্গেই আছি। আমরা তাদের জন্যই কাজ করছি। এ সময় স্বাধীন ভূখণ্ডে এ দেশের মানুষ আর পরাধীন বোধ করবে না বলে মন্তব্য করেছেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ’৭১-এ দেশকে জন্ম দিয়েছেন, আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা। কিন্তু বিগত ১৬ বছরে স্বাধীনতার যে কনসেপ্ট সেটাকে নষ্ট করে দিয়ে গেছে। আমরা মনে করি, দেশের প্রত্যেকটা নাগরিক যতক্ষণ না মনে করবে সে স্বাধীন, তার বাকস্বাধীনতা আছে, তার ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভূখণ্ড স্বাধীন হয়ে কোনো লাভ নেই। আমরা মনে করি, ’২৪ সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করেছে। এই স্বাধীনতা সামনের দিনগুলোতেও থাকবে। আর কখনোই একটি স্বাধীন ভূখণ্ডে এ দেশের মানুষ আর পরাধীনতা বোধ করবে না। সকাল ৮টার দিকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান বিএনপি’র নেতারা। এ সময় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলে বাংলাদেশে কিছু নেই’ মন্তব্য করে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, যারা আজকের স্বাধীনতা দিবসকে খাটো করতে চান, একাত্তরের স্বাধীনতায় তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। সুতরাং এই দিনটাকে তারা খাটো করতে চান। আমি বলবো, তারা যেন এখানেই বিরত থাকেন। এই স্বাধীনতা দিবসকে যেন সম্মান জানান এবং সম্মান করেন। 

জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন করে স্বৈরাচারকে তাড়িয়ে স্বাধীনতার নতুন স্বাদ পেয়েছি। অনেকে বলেন- দ্বিতীয় স্বাধীনতা। আসলে আজকের স্বাধীনতা দিবস প্রমাণ করে, দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলে বাংলাদেশে কিছু নেই। তিনি বলেন, প্রত্যেকটা দলের নিজস্ব আদর্শিক জায়গা ও মতাদর্শ আছে। সবাই যার যার মতাদর্শ থেকে কথা বলে। এটাকে আমি অনৈক্য বলবো না। তবে দলগুলোর মধ্যে স্বার্থের সংঘাত আছে। যদি কখনো এমন সময় আসে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন। তখন কিন্তু আমরা সবাই এক হয়ে যাবো। এখানে কোনো ভুল নাই। এখন দলীয় আদর্শিক স্বার্থে হয়তো আলাদা কথা বলছি। কিন্তু যখন জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন হবে, তখন বাংলাদেশের জনগণ এক হয়ে যাবে। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। এ সময় এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্য সচিব আখতার হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা মনে করি, ’৭১ এবং ’২৪ আলাদা কিছু নয়, বরং ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়েই ’৭১-এর যে স্পিরিট সেটা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। সেটা ৫৪ বছরে অর্জিত হতে পারেনি বিধায় একটা ফ্যাসিজম ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশে চেপে বসেছিল। ফলে ’৭১-এ যে সাম্যের কথা বলা হয়েছিল ’২৪-এ কিন্তু আমরা সেই বৈষম্যহীন সমাজের কথাই বলছি। ফলে যারা এটাকে পরস্পরবিরোধী বা মুখোমুখি করে দাঁড় করাচ্ছে, তাদের উদ্দেশ্য অসৎ এবং আমরা মনে করি ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানকে, ছাত্র-জনতার বিজয়কে প্রকৃতভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। তিনি বলেন, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, পুরনো সংবিধান আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। 

আমরা মনে করি ’২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং আমাদের যে ’৭১-এর সংগ্রাম, ’৪৭-এর আজাদীর লড়াই-সব কিছুর ভেতর দিয়েই আমরা যে স্বাধীন সার্বভৌম মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন রাষ্ট্র পেতে চেয়েছিলাম তার একটি সুযোগ এবং সম্ভাবনা কেবল আমাদের গণ-অভ্যুত্থানের পরেই তৈরি হয়েছে। আমরা কেবল ক্ষমতার লোভে, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যই যাতে সেই সকল সম্ভাবনাকে নষ্ট না করে দেই। সংস্কার ও বিচার ছাড়া নির্বাচন দিলে মেনে নেয়া হবে না জানিয়ে এনসিপি’র আহ্বায়ক বলেন, বর্তমানে আমাদের জাতীয় নাগরিক পার্টির যে দাবি বিচার ও সংস্কার এবং গণপরিষদ নির্বাচন। আমরা মনে করি সেই পথে গেলেই জাতির একটি উত্তরণ ঘটবে গণতন্ত্রের পথে। সংস্কার এবং বিচারবিহীন যদি নির্বাচন দেয়া হয় এবং কোনো একটি দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্যই নির্বাচন চাপিয়ে দেয়া হয় সংস্কার ছাড়া তাহলে তা অবশ্যই মেনে নেয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, এদেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য, ন্যায়বিচারের জন্য। এরই ধারাবাহিকতা ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান। আমরা মনে করি যে, আমাদের একটি স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে এবং বারবার এটা বেহাত হয়েছে এবং বারবার রক্ত দিতে হয়েছে জনগণকে। আমাদের যাতে সামনের দিনগুলোতে আর রক্ত না দিতে হয় জনগণের এই প্রত্যাশা আমাদের আজকের দিনে। আমাদের যে গণতন্ত্র, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করেছি যুগ যুগ ধরে এবং ২০২৪ সালেও আমাদের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন করতে হয়েছে।