Image description

২০০২ সালের একটি অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত মো. আলমাছ বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন। অথচ তার পরিবর্তে নামের মিলের কারণে অন্য এক ব্যক্তি মো. আলমাস এক বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, নামের সাদৃশ্য, বাবার নামের আংশিক মিল এবং ঠিকানায় ভুলের কারণে এই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত তদন্তে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এ-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মহিউদ্দিন হানিফ। ঘটনাটি শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে আগামী রোববার আদেশ দেওয়ার কথা রয়েছে।

 

প্রতিবেদনের সার্বিক আলোচনা ও বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরেজমিন অনুসন্ধান, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং সংশ্লিষ্ট মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পেছনে মূলত তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, দুই ব্যক্তির ঠিকানার মধ্যে বিভ্রান্তি; দ্বিতীয়ত, তাদের বাবার নামের আংশিক মিল এবং তৃতীয়ত, মূল মামলার নথিতে প্রকৃত আসামির ঠিকানা ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হওয়া।

 
 

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাসের পরিবার ২০০৭ সালের আগে দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা গ্রামে বসবাস করত। অন্যদিকে, ২০০২ সালের অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত প্রকৃত আসামি মো. আলমাছের গ্রামের নাম পূর্ব ধোয়াইর। দুটি গ্রাম একই ডাকঘরের অধীন হওয়ায় ঠিকানা শনাক্তের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। এর সঙ্গে দুই ব্যক্তির বাবার নামের আংশিক মিলও পরিচয় নির্ধারণে জটিলতা বাড়ায়।

 

প্রকৃত আসামির বাবার নাম মো. খলিলুর রহমান, মো. খলিল আহম্মেদ বা মো. আবুল খায়ের (খলিল) হিসেবে বিভিন্ন নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির বাবার নাম শেখ খলিল।

তৃতীয় কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০২ সালের অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছের ঠিকানা পূর্ব ধোয়াইরের পরিবর্তে ভুলক্রমে দক্ষিণ বাহ্রা লেখা হয়েছিল। পরবর্তী নথিপত্রেও সেই ভুল সংশোধন করা হয়নি। এমনকি মামলার রায়ের পর জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানায়ও প্রকৃত আসামির ঠিকানার পরিবর্তে দক্ষিণ বাহ্রা উল্লেখ করা হয়।

আলমাসের করা রিট আবেদন ও এর সঙ্গে সংযুক্ত নথিপত্র অনুযায়ী, ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল মো. আলমাছ (২৪) ও মো. নাজমুল আলম মামুনের (২২) বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় অস্ত্র আইনে মামলা করে পুলিশ। ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ ওই মামলার রায় দেন।

রায়ে মো. আলমাছকে (পিতা মো. খলিল আহমেদ, গ্রাম দক্ষিণ বাহ্রা, দোহার, ঢাকা) ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার বর্তমান ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল আহমেদনগর, পাইকপাড়া, মিরপুর। মামলার অপর আসামি নাজমুল আলম মামুন খালাস পান।

রায় ঘোষণার সময় মো. আলমাছ পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়। ২০২৪ সালের ২০ মার্চ জারি করা পরোয়ানার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ৫ নভেম্বর মো. আলমাসকে সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। সেই থেকে তিনি কারাবন্দী।

হাইকোর্টের নির্দেশে ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয় থেকে এক স্মারকের মাধ্যমে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমানকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার পরিচালিত অনুসন্ধানে দুই ব্যক্তির পরিচয়, পারিবারিক তথ্য, ঠিকানা ও জীবনযাপনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও নথিপত্র পর্যালোচনায় প্রকৃত আসামি মো. আলমাছ এবং গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাসের পিতৃপরিচয়ের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। প্রকৃত আসামির বাবার নাম খলিলুর রহমান বা মো. আবুল খায়ের (খলিল)। আর গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির বাবার নাম শেখ খলিল। তাদের পিতামহের নামও আলাদা। প্রকৃত আসামির পিতামহ শেখ শহর আলী এবং গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির পিতামহ শেখ নওয়াব আলী।

এমনকি দুই পরিবারের ভাই-বোনের তালিকাতেও কোনো মিল নেই। প্রকৃত মো. আলমাছ তিন বোনের একমাত্র ভাই। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাসের দুই ভাই ও দুই বোন রয়েছেন। অর্থাৎ, একই রকম নামের আড়ালে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পারিবারিক পরিচয় রয়েছে।

ঠিকানার গরমিলের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল মামলায় সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছের ঠিকানা ছিল পূর্ব ধোয়াইর, দোহার, ঢাকা। কিন্তু মামলার নথিতে ভুলক্রমে দক্ষিণ বাহ্রা লেখা হয়। গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাসের পরিবারও ২০০৭ সালের আগে বাহ্রা গ্রামে বসবাস করত। বর্তমানে তাদের গ্রামের নাম সুন্দরীপাড়া। দুটি গ্রাম একই ডাকঘরের অধীন হওয়ায় ঠিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তবে প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামির গ্রামের নাম সব সময়ই পূর্ব ধোয়াইর ছিল।

বয়স ও পেশাগত পরিচয়েও বড় অমিল

তদন্ত প্রতিবেদনে দুই ব্যক্তির বয়সের পার্থক্যও তুলে ধরা হয়েছে। ২০০২ সালে সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছের বয়স ছিল ২৪ বছর। সে হিসাবে ২০২৬ সালে তার বয়স হওয়ার কথা প্রায় ৪৮ বছর। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাসের জন্মতারিখ ১৯৮৫ সালের ১০ ডিসেম্বর। সে হিসাবে তার বর্তমান বয়স ৪১ বছর এবং ২০০২ সালে বয়স ছিল প্রায় ১৭ বছর। অর্থাৎ, দুজনের বয়সের ব্যবধান প্রায় সাত বছর।

জীবনযাপন ও পেশাগত পরিচয়েও দুই ব্যক্তির মধ্যে অমিল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল মামলার আসামি মো. আলমাছ মিরপুরের পাইকপাড়ায় বসবাস করতেন। তার কোনো পেশা ছিল বলে মিরপুর থানার মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। অন্যদিকে, গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাস বাহ্রা ও পরবর্তী সময়ে সুন্দরীপাড়ায় কৃষিকাজ এবং বৈদ্যুতিক কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রায় নয় বছর আগে পুলিশ একবার গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাসের বাড়িতে গিয়েছিল। তখনও স্থানীয় চেয়ারম্যান ও সদস্যরা পুলিশকে জানিয়েছিলেন, তিনি প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। প্রকৃত আসামি মো. আলমাছের গ্রামের বাড়ি পূর্ব ধোয়াইর। অর্থাৎ, ভুল ব্যক্তিকে আসামি হিসেবে শনাক্ত করার বিষয়টি সাম্প্রতিক কোনো দাবি নয়; স্থানীয় পর্যায়েও বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত ছিল।

সব মিলিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নামের সাদৃশ্য, বাবার নামের আংশিক মিল এবং মূল মামলার নথিতে ঠিকানা ভুলভাবে লিপিবদ্ধ হওয়ার কারণে মো. আলমাসকে প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। অথচ পারিবারিক পরিচয়, বয়স, পেশা ও গ্রামের ঠিকানা- সব ক্ষেত্রেই দুই ব্যক্তির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।