আমেরিকার গ্রামের রাজনীতিতে বদলের ইঙ্গিত এসেছিল এক বছর আগেই। আইওয়ার ওয়ারেন কাউন্টিতে ডেমোক্র্যাটদের সভায় এত মানুষ এসেছিলেন যে খাবার ফুরিয়ে যায়। তড়িঘড়ি অতিরিক্ত পিৎজা আনাতে হয়েছিল স্থানীয় নেতাকে। তখন কে জানত, সেই ভিড়ই একদিন ট্রাম্পের রাজনৈতিক দুর্গে ফাটলের পূর্বাভাস হয়ে উঠবে! মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই গ্রামীণ আমেরিকাতেই চমক দেখিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) রয়টার্সে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইওয়া, কানসাস, টেক্সাস ও উইসকনসিনের মতো রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে গুরুত্বপূর্ণ আসন জিতেছেন ডেমোক্র্যাটরা। কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণও পেয়েছেন তারা। অথচ গত আড়াই দশক ধরে গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে রিপাবলিকানদের প্রভাব বেড়েছিল। এবার সেই প্রবণতায় ধাক্কা লেগেছে।
কেন এই পরিবর্তন? উত্তর লুকিয়ে অর্থনীতি আর প্রচারের কৌশলে। ট্রাম্পের আমদানি শুল্কে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকেরা। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বেড়েছে জ্বালানির দাম। জীবনযাত্রার ব্যয় ও অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর অভিযানেও ক্ষুব্ধ বহু ভোটার। কানসাস ও টেক্সাসে হিস্পানীয় ভোটারদের সমর্থন ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ পয়েন্ট ডেমোক্র্যাটদের দিকে সরে এসেছে।
তবে শুধু অসন্তোষ নয়। দীর্ঘ প্রস্তুতিও বদলেছে নির্বাচনী হিসাব। আইওয়ার ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ক্রিস্টিনা বোহানান টানা ১১ মাস প্রতি মঙ্গলবার ছোট শহরে গিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। বাড়ি বাড়ি পৌঁছেছেন। জিতেছেন প্রতিনিধি পরিষদের আসন। উইসকনসিনের রেবেকা কুকের প্রচারদল কড়া নেড়েছে ৫৪ হাজার বাড়ির দরজায়। তাঁর কথায়, ‘এখন আর কোনও জনপদই এত ছোট নয় যে সেখানে যাওয়া যাবে না।’
আইওয়ায় ২০১৮ সালের পর প্রথমবার বিভিন্ন প্রার্থীর প্রচার সমন্বিত করা হয়। এতে অর্থ ও কর্মীর ব্যবহার আরও কার্যকর হয়। অনেক বাসিন্দা জানিয়েছেন, এর আগে কোনও নির্বাচনী প্রচারদল তাঁদের বাড়িতে আসেনি।
কানসাসে প্রস্তুতি চলেছে চার বছর। স্থানীয় দলীয় শাখা ৫৭ থেকে বাড়িয়ে ৬৮ করা হয়। ফলও এসেছে। প্রায় এক শতাব্দী পর সেখানে ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন অ্যাডাম হ্যামিল্টন। সেওয়ার্ড কাউন্টিতে ২০২৪ সালে ট্রাম্প এগিয়েছিলেন ৩৯ শতাংশ পয়েন্টে। এবার হ্যামিল্টন জিতেছেন ১৩ পয়েন্টে।
রয়টার্সের জরিপ অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় ট্রাম্পের কাজের প্রতি অনুমোদন ৬০ শতাংশ থেকে নেমে অক্টোবরে হয়েছে ৪৫ শতাংশ। দেড় হাজারের বেশি গ্রামীণ কাউন্টিতে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সামগ্রিক ভোটের অংশ ২০২৪ সালে ট্রাম্পের প্রাপ্তির তুলনায় আট শতাংশ পয়েন্ট কম।
তবে সব গ্রাম হাতছাড়া হয়নি রিপাবলিকানদের। আর্কানসাস, ওকলাহোমা ও নেব্রাস্কায় তাঁরা জয় ধরে রেখেছেন। বিশ্লেষকদের সতর্কতা, এই ফল ডেমোক্র্যাটদের প্রতি স্থায়ী আস্থা নয়, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অসন্তোষের প্রকাশও হতে পারে।
গ্রামের মানুষের দরজায় কড়া নেড়ে ভোটের মানচিত্র বদলেছেন ডেমোক্র্যাটরা। কিন্তু সেই দরজা কি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তাঁদের জন্য খোলা থাকবে? নাকি এবারের বদলের হাওয়া কেবলই ক্ষণস্থায়ী? আমেরিকার রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সেটিই।